স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জুন, ২০২৬ ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার
নকআউট নিশ্চিত ছিল আগেই। তবু গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে ফ্রান্স দেখাল নিজেদের শক্তি।
উসমান দেম্বেলের ঝলমলে হ্যাটট্রিকের সঙ্গে দেজিরে দুয়ের শেষ মুহূর্তের গোলে নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘আই’ চ্যাম্পিয়ন হলো দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। নরওয়ের হয়ে থেলো আসগার্ড এক গোল শোধ করেছিলেন, কিন্তু দেম্বেলের প্রথমার্ধের ঝড়ের সামনে সেটি যথেষ্ট হয়নি।
ফক্সবরোর বোস্টন স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল ফ্রান্সের তীব্র গতি। মাত্র ২৫ সেকেন্ডের মাথায় ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে শট নেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।
তার প্রচেষ্টা ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এরপর নরওয়ে পাল্টা আক্রমণে পেনাল্টির দাবি তুললেও রেফারি সাড়া দেননি।
চতুর্থ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে মানু কোনের জোরালো শট ঠেকান নরওয়ে গোলরক্ষক এগিল সেলভিক। প্রথম ছয় মিনিটেই চারটি সুযোগ তৈরি করে ফ্রান্স। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, দেজিরে দুএ ও মাইকেল ওলিসের মুভমেন্টে বারবার জায়গা হারাচ্ছিল নরওয়ের রক্ষণ।
সপ্তম মিনিটে সেই চাপের ফল পায় ফ্রান্স। এমবাপ্পের পাস ধরে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢোকেন দেম্বেলে। বাঁ পায়ে শট নেওয়ার ভান করে বল কাট করেন ডান পায়ে। এরপর নিচু শটে সেলভিককে পরাস্ত করেন তিনি। এগিয়ে যায় ফ্রান্স।
নবম মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে ওলিসেকে টেনে ফেলে হলুদ কার্ড দেখেন প্যাট্রিক বার্গ। এটি ছিল এবারের বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রথম হলুদ কার্ড। ১০ মিনিটে ওলিসের সামনে সুযোগ এলেও তার শট ব্লক হয়ে যায়।
১২ মিনিটে ম্যাচে ফেরার বড় সুযোগ পেয়েছিল নরওয়ে। আওর্সনেসের ক্রস বক্সে পেয়ে যান স্ট্রান্ড লারসেন। কিন্তু ভালো অবস্থান থেকেও তিনি বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে পাঠান। সুযোগ নষ্টের মাশুল দিতে হয় নরওয়েকে।
২০ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন দেম্বেলে। এবার বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ে দুর্দান্ত কার্লিং শটে বল পাঠান নিচের কোণে। সেলভিকের কিছুই করার ছিল না।
তবে গোল হজমের পরপরই জবাব দেয় নরওয়ে। কিক-অফ থেকে দ্রুত আক্রমণে উঠে বক্সের ভেতর থেলো আসগার্ডকে খুঁজে নেয় তারা। জায়গা পেয়ে নিখুঁত শটে মাইক মেনিয়াঁকে পরাস্ত করেন নরওয়ে মিডফিল্ডার। ২১ মিনিটে ব্যবধান কমে হয় ২-১।
এরপরও ম্যাচের গতি কমেনি। দুই দলই দ্রুত আক্রমণে উঠছিল। ২৬ মিনিটে পানীয় বিরতিতে খেলা থামে। বিরতির পর ২৮ মিনিটে শেলদেরুপ বাঁ দিক দিয়ে বাইলাইনে গিয়ে বল কাটব্যাক করেন, তবে মেনিয়াঁ সেটি সামলে নেন।
৩২ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। ডান দিক থেকে বল পেয়ে বক্সের ভেতর দেম্বেলে আবারও নরওয়ের রক্ষণকে ধোঁকা দেন। একবার নয়, দুবার বাঁ পায়ে শট নেওয়ার ভান করেন তিনি। এরপর দ্রুত জায়গা বানিয়ে বাঁ পায়ে কার্লিং শটে বল জালে পাঠান। মাত্র ৩২ মিনিটে পূর্ণ হয় তার হ্যাটট্রিক।
এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক। চলতি আসরে লিওনেল মেসি ও জোনাথন ডেভিডের পর তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেন দেম্বেলে।
৪২ মিনিটে প্রায় চতুর্থ গোল পেয়ে যাচ্ছিল ফ্রান্স। নরওয়ের ছোট ব্যাক পাস থেকে বল কুড়িয়ে নেন দুয়ে। গোলরক্ষককে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি, তবে সেলভিক এগিয়ে এসে দলকে বাঁচান। এরপর নরওয়ের কর্নার থেকে চোখের পলকে পাল্টা আক্রমণে ওঠে ফ্রান্স, যদিও দেম্বেলের পাস এমবাপ্পের কাছে পৌঁছানোর আগেই ক্লিয়ার করে দেয় নরওয়ে।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের শুরুতেই বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়ে বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে পাঠান ওলিসে। যোগ করা সময়ে নরওয়ে অনেকটা টিকে থাকার লড়াইয়ে ছিল। কয়েকবার ফ্রান্স ব্যবধান আরও বাড়ানোর কাছাকাছি গেলেও বিরতিতে স্কোর থাকে ৩-১।
দ্বিতীয়ার্ধে দুই পরিবর্তন আনে নরওয়ে। বিয়র্কান ও থরস্টভেডটের বদলে নামেন পেডারসেন ও থর্সবি। শুরুতেই তারা ম্যাচে ফেরার বড় সুযোগ পায়। ৪৭ মিনিটে থিও হার্নান্দেজের ফাউলে বক্সে পড়ে যান অস্কার বব। রেফারি পেনাল্টি দেন নরওয়েকে।
৪৯ মিনিটে পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন স্ট্রান্ড লারসেন। দৌড়ে একটু থেমে শট নিলেও সেটি ছিল দুর্বল। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে সহজেই বল ঠেকিয়ে দেন মেনিয়াঁ। নরওয়ের ম্যাচে ফেরার বড় সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।
এরপরও দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ে ছিল তুলনামূলক আগ্রাসী। বিরতির পর তাদের খেলায় গতি ও উদ্যম দেখা যায়। ৫০ মিনিটে স্ট্রান্ড লারসেন বক্সে বল পেলেও ভিড়ের মধ্যে শট নিতে পারেননি। উল্টো নরওয়ে অনেক ওপরে উঠে আসায় পাল্টা আক্রমণে এমবাপ্পেকে পেয়ে যায় ফ্রান্স। তবে সেলভিক সামনে এসে বিপদ সামলান।
৫৩ মিনিটে কর্নার পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি নরওয়ে। ৫৬ মিনিটে গোলের খুব কাছে গিয়েছিলেন এমবাপ্পে। বক্সের বাইরে থেকে শরীর খুলে ডান পায়ে দারুণ কার্লিং শট নেন ফ্রান্স অধিনায়ক। বল অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ম্যাচে দুটি অ্যাসিস্ট থাকলেও গোলের খোঁজে ছিলেন তিনি।
৬০ মিনিটে ফ্রান্সের সামনে আসে আরেকটি সুযোগ। ওলিসের নেওয়া দারুণ ফ্রি-কিকে ম্যাক্সেন্স লাক্রোয়া পা বাড়ালেও বল ঠিকভাবে লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। ৬৩ মিনিটে নরওয়ের হয়ে বব আবারও বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ে শট নিলেও সেটি ব্লক হয়ে যায়।
৬৫ মিনিটে নিজের কাজ শেষ করে মাঠ ছাড়েন দেম্বেলে। দর্শকদের করতালির মধ্যে তাকে তুলে নেন ফ্রান্স কোচিং স্টাফ। একই সময়ে ওলিসেও মাঠ ছাড়েন। তাদের বদলে নামেন রায়ান শেরকি ও ব্র্যাডলি বারকোলা। নরওয়ের হয়ে ফালশেনেরের বদলে নামেন লাঙ্গাস।
৭১ মিনিটে বব বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ে শট নেন। মেনিয়াঁ ভালো সেভ করে ফ্রান্সকে বাঁচান। ৭৪ মিনিটে আসগার্ডকে কড়া ট্যাকল করে হলুদ কার্ড দেখেন অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি। এরপর উপামেকানোর বদলে ইব্রাহিমা কোনাতেকে নামায় ফ্রান্স।
৭৯ মিনিটে কিছু সময় বল দখলে রেখে চাপ তৈরি করে নরওয়ে। দূর থেকে শট নেন বার্গ, কিন্তু সেটি ব্লক হয়ে যায়। ফ্রান্স তখন অনেকটাই শক্তি বাঁচিয়ে ম্যাচ শেষ করার দিকে মনোযোগ দেয়।
৮৩ মিনিটে আরও দুই পরিবর্তন আনে নরওয়ে। শেলদেরুপ ও ববের বদলে নামেন নুসা ও হাউগে। ৮৬ মিনিটে এমবাপ্পে ও জুলস কুন্দের বদলে নামেন মালো গুস্তো ও জ্যঁ-ফিলিপ মাতেতা। ম্যাচের শেষ ভাগে ফ্রান্সের লক্ষ্য ছিল সহজভাবে জয় নিশ্চিত করা।
শেষ মুহূর্তে ব্যবধান আরও বাড়ায় ফ্রান্স। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে এগিয়ে বল পান ব্র্যাডলি বারকোলা। ডান পায়ে কাট করে বক্সে ক্রস দেন তিনি। সেখানে থাকা দুয়ে হেডে বল পাঠান নিচের কোণে। দ্বিতীয়ার্ধে খুব বেশি চাপ না বাড়িয়েও চতুর্থ গোল পেয়ে যায় ফ্রান্স।
এই জয়ে তিন ম্যাচে শতভাগ রেকর্ড ধরে রেখে গ্রুপ ‘আই’ চ্যাম্পিয়ন হলো ফ্রান্স। নরওয়ে হারলেও দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্বে উঠছে।