ঢাকা, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিশ্বজুড়ে ছড়াতে পারে আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রজাতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৬ বার


বিশ্বজুড়ে ছড়াতে পারে আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রজাতি

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আর এতে আটকে পড়া হাজারো জাহাজে জন্ম নিয়েছে এক আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রজাতি।

এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে, ডেকে আনতে পারে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়।

 

সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত সমুদ্রে যাওয়ার একমাত্র পথ হলো এই হরমুজ প্রণালী।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে রয়েছে এবং আরও কয়েকশ জাহাজ পার্শ্ববর্তী ওমান উপসাগরে অবস্থান করছে।

 

টাইম অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নতুন এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, এসব জাহাজের গায়ে জন্ম নেওয়া সামুদ্রিক জীব বাণিজ্য পুনরায় শুরু হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জৈব আগ্রাসনের ‘সুপার-স্প্রেডার’ হওয়ার আশঙ্কা
বায়েলাজিক্যাল ইনভেশনস (Biological Invasions) সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (UMCES)-এর নেতৃত্বে ২৪ জন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিজ্ঞানীর একটি দল, যেখানে যুক্ত ছিল উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন (WHOI)।

 

‘Closure of the Strait of Hormuz May Trigger a Bioinvasion Super-Spreader Event’ শিরোনামের গবেষণায় বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় পারস্য/আরব উপসাগরে মাসের পর মাস আটকে থাকা হাজারো বাণিজ্যিক জাহাজ অনিচ্ছাকৃতভাবে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক আগ্রাসী প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের ঘটনার সূচনা করতে পারে।

গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় নোঙর করে থাকার ফলে জাহাজের গায়ে শৈবাল, বার্নাকল, ঝিনুক, বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীসহ অসংখ্য সামুদ্রিক জীবের ঘন স্তর তৈরি হয়। পরে জাহাজগুলো আবার চলাচল শুরু করলে এসব জীব বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছে যেতে পারে।

কী এই ‘বায়োফাউলিং’?
সামুদ্রিক পরিবহন শিল্পে এ ঘটনাকে বলা হয় বায়োফাউলিং (Biofouling)। এটি হলো জাহাজের তলদেশ, প্রপেলারসহ পানির নিচে থাকা অংশে সামুদ্রিক জীবের জমে ওঠা। প্রথমে অণুজীব ও পিচ্ছিল স্তর তৈরি হয়। এরপর সেখানে শৈবাল, বার্নাকল, ছোট সামুদ্রিক ক্রাস্টেশিয়ান এবং খোলসযুক্ত প্রাণীর বসতি গড়ে ওঠে।

গবেষকরা জানান, ১,৫০০টিরও বেশি জাহাজের এই নজিরবিহীন দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক আগ্রাসী প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার জন্য এক ধরনের ‘সুপার-স্প্রেডার’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

WHOI-এর জীববিজ্ঞানী ক্যারোলিন টেপোল্ট, যিনি সামুদ্রিক আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন, বলেন- “সামুদ্রিক আগ্রাসী প্রজাতি বিশ্বের উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একবার কোনো অঞ্চলে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে এগুলো নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। বৈশ্বিক নৌপরিবহনে এই বিঘ্নের নানা প্রভাব রয়েছে, তবে নীরবে এটি উষ্ণ পানির প্রজাতিগুলোকে নতুন নতুন বন্দরে ছড়িয়ে দেওয়ার আদর্শ পরিবেশও তৈরি করেছে।”

বড় ধরনের পরিবেশগত হুমকি
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO)-এর পরামর্শ অনুযায়ী, কোনো জাহাজ ৩০ দিনের বেশি সময় অলস অবস্থায় থাকলে পুনরায় যাত্রার আগে বায়োফাউলিং নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু এসব জাহাজ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে আটকে রয়েছে, যা সামুদ্রিক জীবের দ্রুত বৃদ্ধি ও প্রজননের মৌসুম।

IMO-উদ্ধৃত গবেষণায় বলা হয়েছে, জাহাজের গায়ে সামান্য পিচ্ছিল স্তর জমলেও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আর হালকা মাত্রার বার্নাকল জমলে জ্বালানি ব্যবহার ও নির্গমন ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।

IMO-এর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব নৌপরিবহন শিল্পে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ১০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু বায়োফাউলিংজনিত অতিরিক্ত পানির প্রতিরোধ অতিক্রম করতে।

গবেষকরা আরও বলেন, আধুনিক নৌপরিবহন দীর্ঘদিন ধরেই সামুদ্রিক আগ্রাসী প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এত বিপুল সংখ্যক জাহাজের এত দীর্ঘ সময় একসঙ্গে আটকে থাকার ঘটনা আগে কখনও দেখা যায়নি। ফলে এটি বিশ্বব্যাপী জৈব নিরাপত্তার জন্য এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক কয়েক দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছড়িয়ে পড়া আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রজাতি আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরে স্থানীয় প্রজাতিকে প্রতিস্থাপন করেছে এবং বিভিন্ন বন্দরের অবকাঠামোরও ক্ষতি করেছে।

এশিয়ান গ্রিন মাশেলের উদাহরণ
আগ্রাসী প্রজাতির অন্যতম উদাহরণ হলো এশিয়ান গ্রিন মাশেল। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের এ ঝিনুক উপসাগরীয় এলাকাতেও ব্যাপকভাবে দেখা যায়। ইতোমধ্যে এটি ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় ঝিনুক প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হয়েছে।

এছাড়া বায়োফাউলিংয়ের কারণে জাহাজের গতিশীলতা কমে যায়। পানির প্রতিরোধ বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ চালাতে বেশি শক্তি লাগে এবং অতিরিক্ত দূষণকারী জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়।

সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান
গবেষকরা জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপকদের বায়োফাউলিং ব্যবস্থাপনা জোরদার, উচ্চ ঝুঁকির বন্দরে নজরদারি বাড়ানো, জাহাজের চলাচল পূর্বাভাস উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বিত দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

তাদের মতে, যাত্রা শুরুর আগে পানির মধ্যেই জাহাজের গায়ে জমে থাকা জীব পরিষ্কার বা ‘ইন-ওয়াটার ক্লিনিং’ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে আগ্রাসী প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরে ডুবুরি নামিয়ে জাহাজের তলদেশ ও প্রপেলার পরিষ্কার করা হচ্ছে, যাতে বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু করা যায়। একটি জাহাজ পরিষ্কার করার খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ৮,০০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে জানা গেছে, কারণ দ্রুত উপসাগর ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাহাজ পরিচালনাকারীরা।

অ্যালিয়ানজের মেরিন আন্ডাররাইটিং বিভাগের প্রধান জাস্টাস হাইনরিখ বলেন, “এই ঘটনা সমুদ্রপথের সংকীর্ণ করিডরগুলোর ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যবসায়ী মহলের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আগে এগুলো ছিল সম্ভাব্য দুর্যোগের তাত্ত্বিক চিত্র। কিন্তু এখন আমরা বাস্তব দুর্যোগ দেখেছি। ফলে তাত্ত্বিক ঝুঁকি এখন বাস্তব ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।”

গবেষকদের মতে, বিশ্ব যখন মূলত যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ব্যস্ত, তখন এই সংঘাতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার হতে পারে এক অদৃশ্য পরিবেশগত সংকট, যা জাহাজের গায়ে লেগে থাকা সামুদ্রিক জীবের মাধ্যমে মহাসাগর পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।


   আরও সংবাদ