ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৫ বার
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকটের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক ১ হাজার ৭৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, কর্মসূচিটি দুই পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলবে ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-র একজন কর্মকর্তা বাসস’কে জানান, দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা কমানো এবং গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কমাতে কাজ করছেন তারা।
পরিকল্পনা কমিশনের আরেক কর্মকর্তা জানান, মোট ১৫০টির মধ্যে ১০৪টি নতুন কূপ খনন করা হবে। বাকি ৪৬টি কূপে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চালানো হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৭৭টি কূপকে প্রকল্প বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি প্রকল্পের আওতায় ৭৭টি কূপ এবং সংশ্লিষ্ট গ্যাস কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত চারটি ওয়ার্কওভার কূপ রয়েছে।
কর্মকর্তা বলেন, ‘এ পর্যন্ত অনুমোদিত ৫১টি কূপের মধ্যে ৩২টির কাজ শেষ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ১১টি কূপের কাজ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে এবং বাকি আটটির কাজ এখনো শুরু হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ১০টি প্রকল্পের আওতায় আরও ২৬টি কূপের অনুমোদন চাওয়া হবে। অবশিষ্ট ৭৩টি কূপকে পর্যায়ক্রমে প্রকল্প বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের আওতায় আনা হবে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বাসসকে বলেন, গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশের নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ জোরদার করতে সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন কূপগুলো থেকে পাওয়া গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। এতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আরও গ্যাসকূপ খননে সরকার কাজ করছে।’
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া ৩২টি কূপ থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১৩৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের মাধ্যমে ১১টি কূপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ৫৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে দৈনিক ৪১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে থাকা ১১টি কূপের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর আওতায় রয়েছে সুন্দরলপুর সাউথ-১, ভোলা নর্থ-৩, ভোলা নর্থ-৪, শাহবাজপুর নর্থ ইস্ট-১, শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)-এর আওতায় রয়েছে তিতাস-২৯, বাখরাবাদ-৭ ও তিতাস-৩১ ডিপ। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)-এর আওতায় রয়েছে রশিদপুর-১৩।
অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ১০টি প্রকল্পের মধ্যে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপ খনন প্রকল্প রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত টার্নকি ঠিকাদারের সাহায্যে কূপ দুটি খনন করা হবে।
গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি:
অনুমোদিত লোডের ভিত্তিতে বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতে এ চাহিদা দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে, দৈনিক গ্যাস সরবরাহের গড় পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিটের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে সরবরাহ করা আমদানিকৃত পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজি থেকে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়, যা মোট সরবরাহের ৪১ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো দৈনিক ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুট বা মোট সরবরাহের ৩৩ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করে। আর দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর অবদান দৈনিক ৭২৬ মিলিয়ন ঘনফুট বা ২৬ শতাংশ।
দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিজিএফসিএল দৈনিক ৪৮০ মিলিয়ন ঘনফুট, এসজিএফএল ১৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাপেক্স ১০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেভরন দৈনিক ৮৬১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ক্রিসএনার্জি বাংলাদেশ ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করে।
এ পর্যন্ত দেশে ২৬২টি গ্যাসকূপ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১১৯টি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপের মধ্যে দেশীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনায় রয়েছে ৭৬টি এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর পরিচালনায় রয়েছে ৪৩টি।
কোম্পানিভিত্তিক কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা:
প্রথম পর্যায়ে বাপেক্সের লক্ষ্যমাত্রা ২১টি কূপ খনন, যার মধ্যে নয়টির কাজ শেষ হয়েছে। বিজিএফসিএল-এর ১৩টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সাতটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসজিএফএল-এর লক্ষ্যমাত্রা ১৬টি কূপ, যার মধ্যে ১৩টির কাজ শেষ হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ১০০টি কূপের কাজ করা হবে। এর মধ্যে ৬৯টি নতুন কূপ খনন এবং ৩১টি কূপে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চালানো হবে। এ পর্যায়ে বাপেক্স ৬৮টি কূপের কাজ করবে। এর মধ্যে ৫২টি নতুন কূপ খনন এবং ১৬টি কূপে ওয়ার্কওভার করা হবে। বিজিএফসিএল ২১টি কূপের কাজ করবে, যার মধ্যে নয়টি নতুন কূপ খনন ও ১২টি ওয়ার্কওভার রয়েছে। এসজিএফএল ১১টি কূপের কাজ করবে। এর মধ্যে আটটি নতুন কূপ খনন এবং তিনটি ওয়ার্কওভার করা হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫২টি নতুন কূপ খননের জন্য বাপেক্স ১৪টি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে এবং সাতটি প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় এখনো কোনো কূপ খনন সম্পন্ন হয়নি।
বিজিএফসিএল নয়টি নতুন কূপ খননের জন্য চারটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; কোনোটি এখনো অনুমোদন পায়নি। এসজিএফএল আটটি নতুন কূপ খননের জন্য পাঁচটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও কোনো প্রকল্প এখনো অনুমোদন পায়নি।
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির পর্যালোচনা:
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) কয়েকটি কূপ খনন ও জরিপ প্রকল্প নিয়ে সভা করেছে।
বাপেক্সের তিনটি কূপ খনন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সেমুতাং-৭ মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ; বেগমগঞ্জ-৭ মূল্যায়ন কূপ; এবং চরলক্ষ্যা-১ অনুসন্ধান কূপ। বাপেক্সের নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১০ কোটি টাকা।
বাপেক্সের আরেকটি প্রকল্পে তিনটি কূপ খননের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুন্দলপুর-৫ মূল্যায়ন ও অনুসন্ধান কূপ এবং সুবর্ণচর-১ ও নোয়াখালী-১ অনুসন্ধান কূপ। কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪০৬ কোটি টাকা।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের তিনটি কূপ খনন প্রকল্পে রয়েছে বিয়ানীবাজার-৩ মূল্যায়ন ও অনুসন্ধান কূপ; এবং কৈলাসটিলা-১০ ও বাতিছিয়া-১ অনুসন্ধান কূপ। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৮৩১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বাপেক্সের জকিগঞ্জে দুটি কূপ খনন প্রকল্পে রয়েছে জকিগঞ্জ-২ মূল্যায়ন কূপ এবং জকিগঞ্জ-৩ অনুসন্ধান কূপ। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এ ছাড়া বাপেক্স ১৯৭ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে চরফ্যাশন এলাকায় ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে।
সরকারের আশা করছে, পর্যায়ক্রমে কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের পাশাপাশি অনুসন্ধান ও ভূকম্পন জরিপ জোরদার করা হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।