ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৬ বার
একটা মুদি দোকান কিংবা ফুটপাতের ওপর একটা টুকরিতে; রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান কিংবা ভ্যানের ওপরও কাঁচা তরি-তরকারি থেকে শুরু করে জামা-জুতা; গৃহস্থালির নিত্য ব্যবহার্য বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করে সংসার চলে দেশের বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতার।
এ ধরনের খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা কত, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।
তবে বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয়, কোটির বেশি মানুষ এ ধরনের খুচরা বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত। এই খাতকে অর্থনীতির পরিভাষায় ‘অনানুষ্ঠানিক খাত’ বলা হয়।
বাংলা কিউআর কোড চালুর পর থেকে এ খাতকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনার বিষয়ে বড় ধরনের একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে এজন্য একটি সমন্বিত ও সুগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, খুচরা বিক্রেতারা অল্প পুঁজি খাটিয়ে প্রতিদিনের বিক্রির টাকা থেকে পুনরায় বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা চলমান রাখেন। এদের অনেকেরই ট্রেড লাইসেন্স নেই।
যাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে তারাও অনেক ক্ষেত্রে তা নবায়ন করেন না। অনেকে ভ্যাটের আওতায় আসার উপযোগী হয়ে উঠলেও কর কাঠামোর জটিল মনে করে এর সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। ফলে তাদের ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতায়ও আনা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এসব কারণে তৃণমূল অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও মূলধারার অর্থনীতি বা অনানুষ্ঠানিক খাতে তাদের যুক্ত করা সম্ভব হয় না। এই খাতের সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায় না।
তবে কার্যকর কৌশল, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং উপযুক্ত নীতি সহায়তার মাধ্যমে এই সকল খুচরা বিক্রেতাদের একটি কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। সমন্বিত এই উদ্যোগ দেশের রাজস্ব ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তারা।
৩০-৫০ লাখ টাকার টার্নওভারের দোকান প্রায় ৭৫ হাজার
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, বছরে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা টার্নওভার (বার্ষিক বিক্রি) থাকা দোকানের সংখ্যাই প্রায় ৭৫ হাজার।
তবে বছরে ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা টার্নওভার রয়েছে—এমন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে তা কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে খুচরা বেচাকেনার ওপর নির্ভর করে অনেকেরই বেশ ভালোভাবে সংসার চলছে। মিরপুরের সেনাপাড়ার মুদি দোকানদার নূর ইসলাম প্রতি মাসে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন। সেই হিসেবে বছরে তার টার্নওভার দাঁড়ায় ৪২ লাখ টাকায়। দিনে গড়ে বিক্রির পরিমাণ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। তার দোকানে সব সময় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার পণ্য থাকে। নূর ইসলাম মোবাইল ফোনে পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পণ্যের যোগান রাখেন, যাতে কখনো কখনো বেশি বিক্রি হয় এবং মুনাফাও বেশি করা যায়। দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে তার নিট মুনাফা থাকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা।
রাজধানীর ভাটারা এলাকার ফল ব্যবসায়ী আনিসুল ইসলাম ৫৬ হাজার টাকার ফল কিনে এনে দুইদিনে ৬৬ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। দুই দিনে তার মুনাফা হয় ১০ হাজার টাকা। ফল ক্রয়সহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তার মূল পুঁজি মাত্র ৭০ হাজার টাকা। প্রতিবার ফল বিক্রি শেষে মূল টাকা দিয়ে আবারও পাইকারি বাজার থেকে ফল কিনে আনেন তিনি। এভাবে মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিক্রির বিপরীতে সব খরচ বাদ দিয়ে তার মোট মুনাফা থাকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
আনিসুল জানান, সময়মতো পণ্য আনা, যত্ন সহকারে প্রদর্শন করা এবং বিক্রিতে পুরো শ্রম ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হয়। একটু ভুল বা অলসতা হলে পুরো পুঁজি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া বৃষ্টি বা অন্যান্য অনেক কারণেই বেচাকেনা কমে যায়, কোনো কোনো দিন বেচাকেনা করা একদমই সম্ভব হয় না।
৩০-৪০ হাজার পুঁজিতে মাসিক মুনাফা ৪০-৭০ হাজার টাকা
রাজধানীর ফুটপাতগুলোতে অস্থায়ীভাবে দোকান করে অনেকেই মাসে ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা মুনাফা করছেন। তাদের অনেকেরই পুঁজি মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তারা চাহিদামতো পোশাক কিনে এনে বিক্রি করেন এবং সেই টাকায় আবারও নতুন পণ্য আনেন। তবে এসব ব্যবসায়ীকে পদে পদে চাঁদাবাজি, চড়া সুদে অনানুষ্ঠানিক ঋণ গ্রহণ এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়।
মিরপুর-১০ এর ফুটপাতে জামা-কাপড় বিক্রি করেন মিজানুর রহমান। দোকানে সব সময় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার পণ্য থাকে, প্রতিদিন বিক্রি ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। মাসে এ বিক্রি দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।
ওই খুচরা বিক্রেতা জানান, একজন কর্মচারীর বেতন (১৫ হাজার টাকা), পুলিশ ও স্থানীয় মাস্তানদের গোপনে চাঁদা দিতে হয়। ‘লাইনম্যান’ ও নাইটগার্ডের খরচ দিয়ে মাসে তার ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা মুনাফা থাকে। শীতের মৌসুম এবং দুই ঈদ মিলিয়ে বছরের চার মাস এই বিক্রি ও আয় দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়ে।
ওই এলাকার হকার নূর আলমের পুঁজি ৩০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে তারও মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা মুনাফা হয়।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, এ ধরনের ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি। তবে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতাও আছে। এসব কারণে অনেক খুচরা বিক্রেতা ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন না। অনেকের টাকা খোয়া যায়, অনেকে জুয়া বা নেশায় পড়ে পুঁজি নষ্ট করে ফেলেন। অনেক সময় দোকান বা পণ্য চুরিও হয়। অনেকের রোগ-শোকের কারণে পুঁজি ভেঙে ফেলতে হয়। অনেকে ব্যবসা বড় করতে গিয়ে লোকসানের শিকার হন। কেউ কেউ বাড়তি টাকার জন্য এনজিও বা মহাজনী সুদের চক্রে জড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে যান।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নানামুখী ঝক্কি-ঝামেলা, চাঁদাবাজ ও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে টিকে থাকেন। সরকারের পক্ষ থেকে তারা সরকারি কোনো সুবিধা পান না, তাই রাজস্ব দেওয়ার তাগিদও বোধ করেন না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকার অনেক সুবিধা দেয় এবং তাদের কাছ থেকে করও আদায় করে।’
শহরের অলিগলি থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এ ধরনের অসংখ্য খুচরা বিক্রেতার দেখা পাওয়া যায়। এসব খুচরা বিক্রেতারা যদি প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও নীতি সহায়তা পান এবং চাঁদাবাজমুক্ত পরিবেশে ব্যবসা করার সুযোগ পান, তাহলে দেশের সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) শক্তিশালী হবে। একইসঙ্গে সরকারের রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন তিনি।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
কর ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্নেহাশীষ বড়ুয়া বাংলানিউজকে বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কাজ করতে হবে। এগুলো হলো, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, বিনামূল্যে কিউআর কোড লেনদেন, সহজ ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স চালু, ক্যাশ-ফ্লো বেসড ঋণের প্রচলন এবং হলিডে মার্কেট ও ভেন্ডিং জোন চালু করা।
জানা গেছে, বিগত কিছু অর্থবছরে অনানুষ্ঠানিক খাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। এমনকি চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১৬ ধরনের খুচরা ব্যবসায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত তা থেমে যায়। তাছাড়া বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর কাঠামোকে জটিল মনে করে এর থেকে দূরে থাকতে চান খুচরা বিক্রেতারা। কারণে এখানে স্বল্প শিক্ষিতদের অংশগ্রহণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জটিলতা কমিয়ে কর ও ভ্যাট প্রক্রিয়া সহজ ও যৌক্তিক করা গেলে এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে।
অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা লাখো খুচরা বিক্রেতাকে করজালে আনতে স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, প্রথাগত ১৫ শতাংশ ভ্যাট (মুসক) আরোপ ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। ফলে তাদের জন্য বিশেষ টার্নওভার কর কিংবা ১ থেকে ২ শতাংশের ফ্ল্যাট মুসক হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে তাদের অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে করের আওতায় আসতে চাইবেন।
মুদি পণ্য, পোশাক কিংবা ফলের মতো খাত ধরে আগে থেকেই নিট মুনাফার হার নির্ধারণ করে দিলে ভোক্তাও উপকৃত হবেন, আবার কর কর্মকর্তাদের অহেতুক হয়রানিও বন্ধ হবে বলে মনে করেন তিনি।
চলতি জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে একটি মাত্র পেমেন্ট কিউআর কোডের ধারণা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করেছে। এই কিউআর কোড জনপ্রিয় করতে খোদ গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান শহরের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বাংলা কিউআরের লেনদেন সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করছেন।
এই বাংলা কিউআরকে কাজে লাগিয়ে খুচরা পর্যায়ের বেচাকেনার এই অনানুষ্ঠানিক খাতকে সুগঠিত করতে এই সেবাকে ফি বা চার্জমুক্ত করে সরকারকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন খাত সংশ্লিষ্টরা।