ঢাকা, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

আয় বাড়লেও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ধস

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৫৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৬ বার


আয় বাড়লেও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ধস

গত বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় প্রবাসী আয় বাড়লেও জনশক্তি রপ্তানি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গতবারের চেয়ে এই আগস্টে বিদেশে কাজ নিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে ৮৪ হাজার ৪৫১ জন।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, বাজারের সক্ষমতা কমে আসা ও মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত যুদ্ধের প্রভাবে শ্রমবাজারে এই মন্দা তৈরি হয়েছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে বৈধ ও ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রবাসী আয়ের এই পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২.৫০ শতাংশ বেশি।

এর আগে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার।

 

ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের আনুষ্ঠানিক দর ঠিক থাকা এবং হুন্ডি নিরুৎসাহিত করতে সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে প্রবাসী আয়ে এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

 

তবে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হলেও বড় ধরনের ধস নেমেছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগস্ট মাসে কাজ নিয়ে বিদেশ যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। চলতি ২০২৬ সালের আগস্টে কাজের সন্ধানে বিদেশে গেছেন ৬২ হাজার ৯২৯ জন কর্মী। অথচ গত ২০২৫ সালের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০ জন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আগস্ট মাসে বিদেশ যাওয়া প্রবাসী কর্মী কমেছে ৮৪ হাজার ৪৫১ জন।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত সংস্থা বা এজেন্সিগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বেশ কিছু দেশে নতুন ভিসা ইস্যু স্থগিত বা সীমিত করায় জনশক্তি পাঠানোর এই স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে সৌদি আরবে গেছেন ২৯ হাজার ১৩৫ জন। এ ছাড়া কাতারে গেছেন ৬ হাজার ৯৪৮ জন, সিঙ্গাপুরে ৬ হাজার ৯৪৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪ হাজার ২২৭ জন, মালদ্বীপে ৪ হাজার ১৬১ জন, কুয়েতে ৩ হাজার ৬৬৯ জন এবং জর্ডানে গেছেন এক হাজার ৩৪৬ জন।

অথচ গত ২০২৫ সালের আগস্টের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একক দেশ হিসেবে সৌদি আরবেই গিয়েছিলেন ১ লাখ ৫৯৬ জন। এ ছাড়া কুয়েতে গিয়েছিলেন ১২ হাজার ১৯২ জন, কাতারে ১১ হাজার ৬৫৯ জন, সিঙ্গাপুরে ৬ হাজার ৮৬৪ জন, মালদ্বীপে ৫ হাজার ৫৩৮ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক হাজার ৯৮৭ জন এবং ইতালিতে গেছেন এক হাজার ৬৪৪ জন কর্মী।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীর শ্রমভিত্তিক কাজের ওপর নির্ভর করায় বৈশ্বিক সংকটে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যবর্তী সংঘাত এবং তা আশপাশের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার কারণে পুরো অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আপাতত প্রবাসী আয় বাড়লেও জনশক্তি রপ্তানির এই মন্দা শেষ পর্যন্ত প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর না হয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও নতুন নতুন দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামনের দিনগুলোতে প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সৌদি আরবের শ্রমবাজারে ধারণক্ষমতার (ক্যাপাসিটি) চেয়ে অতিরিক্ত কর্মী পাঠানো এবং এই একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, বর্তমানে সৌদি আরবে বহু বাংলাদেশি কর্মী কাজ না পেয়ে বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কোনো একটি বিশেষ খাতের জন্য শুধু একটি একক বাজারের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করা ঠিক না।

বায়রা মহাসচিবের বলেন, কেবল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়নি, বরং সৌদি বাজারের নিজস্ব ধারণক্ষমতার সংকট এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত নীতির পরিবর্তনের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে নারী কর্মীসহ প্রকল্পভিত্তিক বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে কর্মী পাঠানোর গতি অনেক কমে গেছে।

আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, পূর্বের তুলনায় সৌদি আরবে প্রকল্পভিত্তিক কাজের চাহিদা কমে এসেছে, সেই সঙ্গে চলতি প্রকল্পগুলোর মেয়াদও শেষের দিকে। যুদ্ধপরিস্থিতিসহ নানা কারণে নতুন করে প্রকল্প শুরু হচ্ছে না। অন্যদিকে অন্যান্য দেশ থেকেও সৌদি আরব এখন কর্মী নিয়োগ বাড়াচ্ছে।

তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’ বা ‘ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ ভিসার সংকট নিয়ে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বা অফিশিয়াল ‘ফ্রি ভিসা’ বলতে কিছু নেই। স্বজনদের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক ভিসায় গিয়ে আগে মুক্তভাবে কাজ করার যে সুযোগ ছিল, কঠোর তদারকির কারণে এখন আর সেই সুযোগ নেই। এতে করে ফ্রি ভিসা, ওমরাহ ভিসা বা ৩ মাসের স্বল্পমেয়াদি ভিসায় গিয়ে থেকে যাওয়ার (ওভারস্টে) প্রবণতার ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি আকামাবিহীন বা কাজবিহীন হয়ে পড়েছেন।

বর্তমানে সৌদি সরকার ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধভাবে থেকে যাওয়া বন্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। অতিরিক্ত কর্মী প্রবাসে পাঠানোর ফলে তৈরি হওয়া ওভারফ্লো এবং সেখানে অবস্থানরত কর্মীদের বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এ সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন বায়রা মহাসচিব।


   আরও সংবাদ