ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিদ্যুৎ-জ্বালানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চায় সরকার

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ১৪:০৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫ বার


বিদ্যুৎ-জ্বালানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চায় সরকার

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভূমিকা ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে সীমিত করতে চাই আমরা। এর মাধ্যমে সরকার বিতরণ ও সেবামূলক কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে চায়।

 

তিনি বলেন, জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, সরকারের আর্থিক দায় কমবে এবং সেবার মান উন্নত হবে।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

বুধবার (২২ জুলাই) রাতে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা জানান।

 

 

 

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, সরকারি অর্থে আর সবকিছু করার প্রয়োজন নেই।

যেখানে সম্ভব, বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দিন। দেশ তো সবার।

 

বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, আমার অধীন যেসব বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানি রয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে আমি সেগুলোর বেসরকারীকরণ দেখতে চাই। আমি চাই, দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিতরণ ব্যবস্থার দায়িত্ব নিক। ভারতের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। কলকাতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে। মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানির মতো কম্পানিগুলো এই দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। তাহলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কেন পারবেন না?

তিনি আরও বলেন, সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকারের খুচরা পর্যায়ের ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, বাল্ক পর্যায়ে বিক্রি করতে পারে। কিন্তু খুচরা বিতরণ ব্যবস্থাটি দক্ষ বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত, এটাই আমার ব্যক্তিগত মত।

 

 

ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে যেকোনো গঠনমূলক প্রস্তাব লিখিতভাবে সরকারের কাছে জমা দেওয়ার আহবান জানাই। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, সরকার সম্প্রতি একটি নতুন সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) নীতি ঘোষণা করেছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার পাকিস্তানের মতো ভর্তুকিনির্ভর সৌরবিদ্যুৎ বিতরণ করবে না। বরং কর-সুবিধা, উপযুক্ত ট্যারিফকাঠামো এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে।

রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে ক্লাস্টারভিত্তিক মডেল চালু কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট এলাকার ছাদে একজন বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। গ্রাহক মাসিক বিলের মাধ্যমে এর মূল্য পরিশোধ করবে। এতে সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন হবে না এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত এই কার্যক্রম শুরু করা হবে। সরকারের বর্তমান মেয়াদের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করা হয়নি। গত ১৭ বছরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় বাংলাদেশ এখন প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দিয়ে গ্যাস খালাস করা হয়। এর মধ্যে একটি বিকল হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে এবং শিল্প-কারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ভোলায় গ্যাসভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও গ্যাস পাইপলাইন না থাকায় সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। পাইপলাইন নির্মাণ অর্থনৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক হবে, গ্যাসের মজুদ কত দিন থাকবে এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে কি না, এসব বিষয় মূল্যায়ন করছে সরকার। ফলে কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, অতীতে দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির কারণে সরকার আইনগতভাবে এসব অর্থ পরিশোধে বাধ্য। অনেক বিনিয়োগকারী সেই গ্যারান্টির ভিত্তিতে অর্থায়ন নিয়েছেন। ফলে সরকার চাইলেও সহজে এই দায় থেকে বের হতে পারছে না। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল রয়েছে। সরকার উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনলেও কম দামে বিক্রি করছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবেলায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।

জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে এলএনজি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। কাতার ও আবুধাবির কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ আরও বাড়ছে।

এলপিজি খাত প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার সরাসরি এ খাত পরিচালনা না করলেও নিয়মিত তদারকি করছে, যাতে গৃহস্থালি পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। কারণ এলপিজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাও রাষ্ট্রকেই করতে হয়। ফ্যামিলি কার্ডধারীদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় গ্রাহক নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার কিনবে এবং ভর্তুকির অর্থ সরাসরি তার হিসাবে জমা হবে। ভারতের অনুরূপ মডেল অনুসরণ করে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।

অনুষ্ঠানে দেশের জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

এতে সম্মানিত অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ,

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।

পলিসি কনক্লেভে আরও বক্তব্য দেন, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এম রিজওয়ান খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম, ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেডের (আইডিকল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরসেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অন্তর্বর্তীকালীন) মো. এনামুল হক, ওমেরা রিনিউএবল এনার্জি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম প্রমুখ।


   আরও সংবাদ