ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার
দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে বুধবার (৭ অক্টোবর) চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
এর আগে মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ।
এয়ারবাসের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কেনা হবে।
‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শিরোনামে রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনুষ্ঠানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও এয়ারবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমেয়ার উপস্থিত থাকবেন।
দূরপাল্লা ও আঞ্চলিক রুটে নতুন উড়োজাহাজ
এয়ারবাসের সঙ্গে হতে যাওয়া চুক্তিতে চারটি এ৩৫০-৯০০ হবে প্রশস্ত কাঠামোর (ওয়াইড-বডি) উড়োজাহাজ। এগুলো মূলত দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ছয়টি এ৩২১নিও সরু কাঠামোর (ন্যারো-বডি) উড়োজাহাজ আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে বিমানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান ও সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তবে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে মোট কত অর্থ ব্যয় হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব উড়োজাহাজের সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩৩ সালে। পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে বোয়িংয়ের সঙ্গে ২৫ উড়োজাহাজের চুক্তি
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির আগে চলতি বছর দুই দফায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান।
গত ৩০ এপ্রিল প্রথম দফায় প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এর মধ্যে আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ও চারটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ রয়েছে।
এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করা হয়। দ্বিতীয় দফার চুক্তিতে রয়েছে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ও ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩১ সালে। সব উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হতে প্রায় ১১ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি উড়োজাহাজ সরবরাহের সময় তার মূল্য পরিশোধ করা হবে।
কেন এত উড়োজাহাজ প্রয়োজন?
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং ও পাঁচটি ড্যাশ-৮। তবে বহরের বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। দুটি উড়োজাহাজ প্রায় অচল হওয়ার অবস্থায় রয়েছে এবং বাকি উড়োজাহাজগুলোরও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বহর থেকে বাদ পড়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।
ফলে ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা ও রুট সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমানের বহর ধরে রাখা এবং বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান।
অর্থাৎ একদিকে পুরোনো উড়োজাহাজ ধীরে ধীরে বহর থেকে বাদ পড়বে, অন্যদিকে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হবে- এই রূপান্তরের সময়টিই বিমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯ থেকে ৫০ ছাড়াবে বহর
এয়ারবাসের ১০টি ও বোয়িংয়ের চুক্তি করা ২৫টি উড়োজাহাজ শেষ পর্যন্ত বিমানের বহরে যুক্ত হলে নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫টি। বর্তমানের ১৯টি উড়োজাহাজ হিসাব করলে বিমানের বহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫০ ছাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জানা যায়, নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজের মধ্যে ১৯টি হবে প্রশস্ত কাঠামোর ও ১৬টি সরু কাঠামোর। এর মাধ্যমে একদিকে দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে তুলনামূলক ছোট উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা সহজ হবে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানান, মানের জন্য নতুন উড়োজাহাজ কেনার এই পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ। তবে শুধু উড়োজাহাজ যুক্ত করলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। নতুন উড়োজাহাজের যথাযথ ব্যবহার, লাভজনক রুট নির্বাচন, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হলে নতুন ধরনের উড়োজাহাজ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এয়ারবাসের সঙ্গে আজকের চুক্তি বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর পুনর্গঠন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বোয়িংয়ের ২৫টি এবং এয়ারবাসের ১০টি, মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ বাস্তবে বহরে যুক্ত হলে বিমান বাংলাদেশ সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক পরিসর বর্তমান অবস্থার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই বিশাল বহর সম্প্রসারণ কতটা কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে নতুন উড়োজাহাজগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায় এবং সেগুলো দিয়ে কতটা লাভজনকভাবে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হয় তার ওপর।