ঢাকা, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ঋণ নয় মালিকানানির্ভর শিল্পায়ন চায় সরকার

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৯ মার্চ, ২০২৬ ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার


ঋণ নয় মালিকানানির্ভর শিল্পায়ন চায় সরকার

ঋণনির্ভরতা কমিয়ে মালিকানানির্ভর শিল্পায়নে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, সরকার উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ কমিয়ে শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহে উৎসাহিত করবে। কে ব্যাংক ঋণ পাবে আর কে পুঁজিবাজারে যাবে এটি ঠিক করতে হবে। এজন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে রূপান্তর ও সংস্কারের পদক্ষেপ থাকবে।

 

রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে পুঁজিবাজার বিষয়ক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

পুঁজিবাজারের রিপোর্টারদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) এই সেমিনারের আয়োজন করে। ‘শেয়ারবাজারে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পুঁজিবাজারকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাত থেকে বের করে ‘সর্বজনের মালিকানা ও অংশগ্রহণের’ জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।

এর অংশ হিসেবে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে তারা সহজে দেশের বাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে।

 

তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ইসলামিক ফাইন্যান্স মার্কেট সম্প্রসারণ করার সুযোগ আছে। বাজারের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ‘ব্লকচেইন’ ব্যবহার করা হবে।

 

মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অডিট ব্যবস্থা, সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। যারা ভালো করবে তাদের জন্য পুরস্কার এবং যারা অনিয়ম করবে তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। অডিটরদের প্রতিবেদন দেখেই বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেন। অডিটররা প্রত্যয়ন করে কোম্পানি ভালো আছে। কিন্তু পরে তাদের সম্পদ বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যায় কিছুই নেই।

এজন্য অডিটররা যেন সঠিক ‘প্রত্যয়নপত্র’ দেয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

উপদেষ্টা বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), বিএসইসিসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অডিটরদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। তার মতে, আগে দেশে যে অর্থনৈতিক মডেলটি ছিল, তা টেকসই ছিল না। কারণ এটি ছিল ‘ভোগনির্ভর’।

তিনি বলেন, টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন ‘বিনিয়োগনির্ভর’ মডেল। বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে শুধু ঋণনির্ভর অর্থনীতি কখনো টেকসই হয় না। বর্তমান যে পরিস্থিতি চলছে, তা থেকে উত্তরণ জরুরি। এজন্য জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এই সরকার অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন করতে চায়। এজন্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুঁজিবাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

পুঁজিবাজার নিয়ে তিনটি লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, প্রথমত কাঠামোগত সংস্কার, ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার এবং বাজারের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। পুঁজিবাজারে সাধারণ মানুষের অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে বর্তমানে বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং পুঁজিবাজারের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। যাতে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরে আসে এবং একটি কল্যাণধর্মী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ বিগত আঠারো মাসের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে বলেন, আমরা মোট ১২৬টি তদন্ত করেছি। এর মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছি। যার মধ্যে আদায় হয়েছে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

আদায় কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জরিমানা পরিশোধে নয় মাস সময় পাওয়া যায়। অনেকে আদালতে যাওয়ায় কিছু আইনি বিষয় সামনে চলে এসেছে। এছাড়াও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এনফোর্সমেন্টে তিনশোরও বেশি কেস নিষ্পত্তি করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো দুদকে ১৬টি মানি লন্ডারিং–সম্পর্কিত কেস পাঠানো হয়েছে, যেগুলো আমরা মনে করছি যে শুধু জরিমানা যথেষ্ট নয়। ইতোমধ্যে দুদকে বেশ কিছু মামলাও হয়েছে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। অথচ ব্যাংকের ভুয়া স্টেটমেন্টে অর্থ আছে দেখানো হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের পাঠানো এসব ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট বন্ধ করতে ব্যাক অফিস (আনএডিটেড) সফটওয়্যার স্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ডিএসইর ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউসে এই সফটওয়্যার স্থাপন করা হয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, আমাদের আইন আছে অনেক কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এটাই আমাদের বড় সমস্যা।

আমরা কেন বাজারকে শক্তিশালী করতে পারলাম না— এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের সিস্টেমে সমস্যা রয়েছে। পুঁজিবাজারে ধস হয় তখনও বাজারে কর প্রণোদনাগুলো ছিল। সুতরাং কর সুবিধা দিলেই বাজার ভালো হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অতীতে অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যারা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামীতে লভ্যাংশ দিতে পারবে না এমন কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া যাবে না। আমরা আগে এই জায়গাটিতে ফেল করেছি। একই সঙ্গে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আগামীতে কোনো কোম্পানি যাতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাজারে না আসতে পারে।

তিনি প্রণোদনা দাবির কথা তুলে বলেন, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান সাড়ে ৭ শতাংশ। এটা অনেক, এটা বর্তমান বাজারের জন্য যথেষ্ট।

মূল প্রবন্ধে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) এর সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় তিনটি বড় সমস্যা দৃশ্যমান— পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট, ব্যাংকিং খাতে চাপ এবং কর আহরণ কম হওয়া। তবে এগুলো আলাদা সমস্যা নয়; বরং সঞ্চয় ও মূলধন বণ্টনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ করার কথা বলেন।

তিনি বলেন, দেশে ভালো কোম্পানি থাকলেও পুঁজিবাজারে আসছে না কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানি সঠিকভাবে ভ্যাট দিলেও অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো গোজামিল দিয়ে পার পাচ্ছে। এতে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থায় সাধারণত ব্যাংকগুলো স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন করে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ আসে পুঁজিবাজার থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোকে একই সঙ্গে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায়ের মেয়াদের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে, যা আর্থিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এর ফলে সম্পদ-দায় অসামঞ্জস্য, ঋণ কেন্দ্রীভবন এবং পুনঃঅর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশের পুঁজিবাজার সঠিকভাবে চললে ব্যাংকের ওপর এই চাপ কমবে।

ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে গোড়ার সমস্যা হচ্ছে গত পনেরো বছরে সরকার পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দেয়নি। তবে আশার কথা হলো বর্তমান সরকার গুরুত্ব দিয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। এতদিন এই জায়গাটিতে ঘাটতি ছিল। সিএসইর চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বলেন, অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের পুঁজিবাজার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য তিনটি বিষয় প্রয়োজন। একটি স্থিতিশীল, স্বাস্থ্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও আইনের শাসন দরকার।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, পুঁজিবাজারের সর্বস্তরে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা খুবই দরকার। যাতে আমরা স্টেটমেন্ট বা ডকুমেন্টগুলো ডিজিটালি সাবমিট করতে পারি। তিনি বলেন, অতিরিক্ত লিস্টিং ফি আইপিও আসার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা। অনেকে মনে করেন ৩০ লাখ টাকা খরচ করে যদি বাজারে আসার অনুমতি না পাই তবে এই অর্থ বৃথা।

সেমিনারে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার বলেন, গত দুই বছর ধরে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসেনি। এখন আইপিওর মৌসুম। ইনসেনটিভ দিয়ে হলেও ভালো কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনা দরকার।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের সঙ্গে তথ্যের গণতন্ত্রীকরণ দরকার মন্তব্য করে সংগঠনটির সভাপতি মনির হোসেন বলেন, সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য হলো মূল চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা হচ্ছে আস্থা ফিরিয়ে আনা ও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি করা। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে কমিটমেন্ট থাকতে হয়। আমরা এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করছি।

সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) এর সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিএমজেএফের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব।


   আরও সংবাদ