ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ জুন, ২০২৬ ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১২ বার
দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা, মালিকানা ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে জোরজবরদস্তি করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির শেয়ার দখল করেছিল।
আর বর্তমান সরকার নতুন চেয়ারম্যান বসিয়ে সেই এস আলম গ্রুপের ফিরে আসার পথই প্রশস্ত করছে। ব্যাংকটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে বসে যাবে বলে সতর্ক করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা।
অন্যদিকে, সরকারি দলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপি সরকারের হাতে শতভাগ নিরাপদ।
পাশাপাশি, ব্যাংকটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যর্থ করে দেশে আর্থিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছে বলেও দাবি করেছে সরকার। একই সঙ্গে ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ও নির্বাচনী অর্থায়নে ব্যবহারের কড়া সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এই উত্তপ্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সকল প্রকার অন্যায়, অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থে’—এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানান জামায়াতের পাঁচজন সংসদ সদস্য। আলোচনায় অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মার্জিয়া মমতাজ ও নুরুন্নিসা সিদ্দিকা।
‘ফ্যাসিস্টদের কায়দায় আবারও ব্যাংক দখলের চেষ্টা’
নোটিশ উত্থাপন করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের অব্যাহত অপপ্রচার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক হয়রানি সত্ত্বেও ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংক ৪৪৭ কোটিরও বেশি টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল। সে সময় খেলাপি বিনিয়োগের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী সরকার নজিরবিহীন উপায়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ দখল করে এবং ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলশ্রুতিতে ২০২৪ সালে ব্যাংকের মুনাফা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং খেলাপি বিনিয়োগ প্রায় ৫১ শতাংশে পৌঁছে যায়।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা ১০৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩৭ কোটিতে উন্নীত হয়। ঠিক এমন সময় আবারও পুরোনো ব্যাংক দখলকারী চক্রের দৃষ্টি ব্যাংকটির দিকে পড়েছে। নতুন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে বিতর্কিত ও দুর্নীতির অভিযোগে চিহ্নিত ব্যক্তিকে বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংকটিকে ‘জামায়াতের প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই ‘জামায়াতপন্থী’ ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা রেখেই লাখো গ্রাহক বিপুল পরিমাণ আমানত রেখেছিলেন। আজ আবারও সেই পুরোনো কৌশলে ব্যাংক দখলের চেষ্টা চলছে। এর প্রমাণ হলো—আস্থার সংকটে এক দিনেই গ্রাহকরা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আমানত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ব্যাংকটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে বসে যাবে। তাই প্রকৃত মালিকদের কাছে শেয়ার ফিরিয়ে দিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
‘ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ’
বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জামায়াতে ইসলামীকে উদ্বেগের পরিবর্তে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিপদে ফেলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চলছে। বিশ্বে এমন কোনো নজির নেই যে শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকরা টাকা তুলে নিয়ে যান। একটি মহল ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করে প্রমাণ করতে চাইছে যে দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা নেই। এর পেছনে বিশেষ শক্তির হাত রয়েছে।
ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানো ও মুনাফার দাবির কড়া সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বিগত দুই বছরের যে মুনাফার কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ (কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানো)। ওই দুই বছরে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ক্যারি ফরওয়ার্ড করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৫১ শতাংশ। ফলে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটি প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় যখন ব্যাংকটি টেকওভার করা হয়েছিল, তখন তো গ্রাহকরা টাকা তোলেননি। তাহলে এখন কেন তুলবেন? বর্তমান সরকার ব্যাংকটিকে বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রশংসা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, গভর্নর সাহসিকতার সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাকে ‘ঋণগ্রস্ত’ বলে হেয় করার চেষ্টা চলছে, যা অনুচিত। বিএনপি সবসময় আর্থিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করে। আমাদের বিগত সরকারের সময়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে ভালো ছিল। ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ।
‘ইসলামী ব্যাংক মানেই ইসলাম নয়’
বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ব্যাংকটির অতীত রাজনৈতিক ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বলছে ব্যাংকের মালিক তারা নয়, আবার বলছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের দোহাই দেওয়া ঠিক নয়।
তিনি বলেন, যারা পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহক সেজে রাস্তায় আন্দোলন করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় দেখতে হবে। এই ব্যাংকের ‘আরডিএস’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ভোটের আগে নারীদের ১০ হাজার টাকা করে ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এটি মাফ হয়ে যাবে। ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ আগস্টের পর নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো হদিস নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। মালামাল বিক্রি করে তারা টাকা ফেরত দেয়নি। দুষ্টু লোকরা বলে—সেই টাকা কোনো এক দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে এবং তা দিয়ে একটি টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেই টিভি চ্যানেল কোন পক্ষে খেলছে, তা আমরা জানি। এসব সিএসআর তহবিলের ব্যয়, নিয়োগ ও অর্থ স্থানান্তরের কঠোর তদন্ত করা হবে।
সারা দেশে অস্থিরতার শঙ্কা বিরোধীদলীয় উপনেতার
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ইসলামী ব্যাংকের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না হলে গ্রাহকরা আন্দোলন করবেন। সারা দেশে বড় ধরনের অস্থিরতা (আনরেস্ট) হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এই আলোচনার সময় স্পিকারের নিরপেক্ষতা এবং সময় বণ্টন নিয়েও স্পিকারের সঙ্গে বিরোধীদলীয় উপনেতার তীব্র বাদানুবাদ হয়।
‘ডলার সংকটের মূলে এস আলম’
ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ২৪টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টি গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। বড় ঋণখেলাপিদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এস আলম। ইসলামী ব্যাংক এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার ফলেই হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে এবং ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা থেকে ১২৬ টাকায় উঠে গেছে। আমাদের আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মার্জিয়া মমতাজ অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পরিবারের সঙ্গে ব্যাংকটির এমডির স্ত্রীর বিরোধ ছিল। সে কারণেই এমডিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি এবং ব্যাংকের জন্য অবমাননাকর।