আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:২৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৭ বার
বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধের আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশভেদে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হচ্ছে।
অস্থায়ী বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রকাশনা ফেডারেল রেজিস্টার-এ প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন শুল্কের বিস্তারিত জানানো হয়।
এতে বলা হয়েছে, নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যকে প্রভাবিত করবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের পণ্যে আগে থেকে নির্ধারিত শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ অথবা সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। এ ছাড়া চীনসহ বাকি ৩৮টি দেশের পণ্য সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় জরুরি আইনের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা ১০ থেকে ৫০ শতাংশ ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিল, যার মেয়াদ শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হচ্ছে। একই সময় থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।
তবে বর্তমানে পরিবহন প্রক্রিয়ায় থাকা বা ট্রানজিটে থাকা পণ্য আগামী ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারায় নেওয়া সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
নতুন শুল্ক আরোপ করা হলেও কিছু পণ্যকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, সার এবং নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২৩২ ধারার আওতাভুক্ত গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণকারী পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কয়েকটি দেশ। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ আইদে বলেছেন, তাদের দেশে বাধ্যতামূলক শ্রম ঠেকাতে কঠোর আইন রয়েছে। তাই এই শুল্ক আরোপের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলও সিদ্ধান্তটিকে অন্যায্য উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের মুখে পড়া কানাডা তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক বলেছেন, পারস্পরিক স্বার্থে আগামী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাবে কানাডা।
এদিকে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট গভর্নর মাউরা হিলি সতর্ক করে বলেছেন, নতুন এই শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়বে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ এবং এ-সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। এখন দেশটির বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই মানদণ্ড অনুসরণ করার সময় এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এটি শুধু অস্থায়ী শুল্কের বিকল্প নয়; বরং বৈশ্বিক সরবরাহ প্রণালী থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে নেওয়া একটি পদক্ষেপ। তাঁর দাবি, মানবাধিকার সুরক্ষা ও বৈশ্বিক শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতেই উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের আহ্বানে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যবিষয়ক আইনজীবী রায়ান মাজেরাস বলেন, ৩০১ ধারার আওতায় একবার শুল্ক আরোপ করা হলে তা প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের সুযোগ থাকে। তাঁর মতে, ১০ শতাংশ শুল্ককে ভিত্তি হিসেবে ধরে রাখার এটি একটি শক্তিশালী কৌশল এবং আদালতেও এটি টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাধ্যতামূলক শ্রমের অভিযোগকে সামনে আনা হলেও এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশলও কাজ করছে। বিশেষ করে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলিমদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার অভিযোগ বহুদিন ধরে করে আসছে ওয়াশিংটন, যদিও বেইজিং তা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে চীনা পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে, নতুন এই পদক্ষেপ তারই অংশ। এর আগে শিল্পপণ্য ছাড়া চীনের অনেক পণ্যের ওপর শুল্কের হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
সূত্র: রয়টার্স