ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬ ১৭:২৩ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩১ বার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ফল নয়; এর নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও প্রশাসনিক স্থবিরতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং প্রশাসনের মধ্যম ও মাঠপর্যায়ে বসে থাকা সুবিধাভোগী একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার না করা, সঠিক তথ্য গোপন রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব ঘটানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তোষ উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে মনে করেন তারা।
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন কেবল আন্তর্জাতিক বাজার, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কিংবা এলএনজি সরবরাহে বাধার ফল-নাকি দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা, তথ্যের ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাও সংকটকে তীব্র করছে-এ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সংকটের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) গত আগস্টের তথ্য বলছে, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ১১৯টি কূপ এবং দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। তবে সেখানে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ২৬২ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট।
এ হিসাবে উৎপাদনযোগ্য সক্ষমতার ৪১ শতাংশই থেকে যাচ্ছে অব্যবহৃত।
আরও পড়ুন
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার, সময় লাগতে পারে দুই বছর
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার, সময় লাগতে পারে দুই বছর
এলএনজি টার্মিনালেই বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে।
আরপিজিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফ এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০০ এমএমসিএফ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুটি টার্মিনাল থেকে মোট ২৭৮ হাজার ৭২১ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে সামিট সরবরাহ করে ১৩৯ হাজার ৪৩৯ এমএমসিএফ। তবে সংকট তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে। ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি সম্মিলিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চলতি জুলাই ও আগস্ট (২০২৬) মাসে দুটি টার্মিনাল থেকে দৈনিক গড়ে মাত্র ৫০০ থেকে ৭৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে ২১ জুলাই এক্সিলারেট টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও পরে আগস্টের ১৯ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত এলএনজির মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে এক্সিলারেটের সরবরাহ ‘শূন্য’তে (০ এমএমসিএফডি) নেমে আসে। ফলে এককভাবে সামিটের ওপর চাপ পড়ে। কিন্তু সক্ষমতা থাকার পরও কেন সময়মতো আগাম কার্গো এনে দেশের এলএনজি মজুদ সচল রাখা হয়নি এবং কেন সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়হীনতায় একের পর এক টার্মিনাল অচল হলো-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে কি স্বার্থান্বেষী মহল সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটিয়ে বা ভুল তথ্য পরিবেশন করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে? জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই কোনো অশুভ চক্র কাজ করছে কি না-সেই সংশয় এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
আরও পড়ুন
জ্বালানি সংকট সমাধানে শর্টকাট নেই, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি:সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর
জ্বালানি সংকট সমাধানে শর্টকাট নেই, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি:সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর
সরবরাহ বন্ধ থাকলেও খরচ থামে না
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকলেও এর নির্দিষ্ট কিছু স্থায়ী ব্যয় বা ক্যাপাসিটি চার্জ বহাল থাকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এক্সিলারেটের একটি এলএনজি টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় থাকাকালে বাংলাদেশকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ডলার (প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা) স্থির ফি দিতে হয়েছে। টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় থাকলেও এই বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হওয়ায় কৃত্রিম সংকট বা তথ্য গোপনের পেছনে আর্থিক ও কৌশলগত কারসাজির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
আন্তর্জাতিক সংকট বাস্তব, কিন্তু সেটিই কি একমাত্র কারণ?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটকে নিঃসন্দেহে কঠিন করেছে। হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্নের কারণে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হয়েছে। তথ্য বলছে, কাতার এনার্জি ও স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কার্গো সংগ্রহের ফলেও খরচ বেড়েছে বহুগুণ। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বর্তমান সংকটকে শুধু বৈশ্বিক যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, ভেতরের অব্যবস্থাপনা ও তথ্যের অসচ্ছতাই আসল দুর্বলতা।
স্বৈরাচারী আমলের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও তথ্যের অসচ্ছতা
স্বৈরাচারী সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রভাব বিস্তারকারী বেসরকারি গোষ্ঠীগুলোর স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা আড়াল করছে কিংবা কৌশলগতভাবে সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করছে না। এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আংশিক বা অসম্পূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে একদিকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রের অর্থ আদায় অব্যাহত রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সরকারকে নীতিগত ও জন অসন্তোষের চাপের মুখে ফেলা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামসুল আলম
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামসুল আলম
সংকট ঘনীভূত হওয়ার পেছনে শুধু বেসরকারি খাত নয়, সরকারি সংস্থাগুলোর ভেতরে থাকা সাবেক সরকারের অনুগত বা সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, বিপিডিবি এবং আরপিজিসিএলের মধ্যম ও মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা বিগত আমলের নীতি ও কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামসুল আলম বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে যে অসচ্ছতা তৈরি করে রাখা হয়েছে, তার দায় এখন স্পষ্ট।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের শাসনামলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, প্রশাসনের ভেতরে বাইরে একটি চক্র লম্বা সময় ধরে বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করেছে। এই সুবিধাভোগী শ্রেণী তাদের নিষ্ক্রিয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা দিয়ে সরকারকে বিপাকে ফেলতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারের হাতে তো সার্বভৌম ক্ষমতা রয়েছে, বৃহত্তর স্বার্থে তাকে অবশ্যই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা যত কঠোরই হোক।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি এবং সরবরাহের তথ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। চুক্তিগুলোর নিরপেক্ষ অডিট এবং তথ্যের পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে এই সিন্ডিকেট সরকারকে বারবার জিম্মি করবে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক ডেটা বা জ্বালানি মজুতের প্রকৃত চিত্র শীর্ষ পর্যায়ে যথাসময়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
জরুরি এলএনজি কার্গো অনুমোদন, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বিতরণ পরিকল্পনায় আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব ঘটানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়া বা তথ্য গোপন রাখা প্রশাসনিক ‘নীরব অসহযোগিতা’ বা ‘সাবোটাজ’-এর ইঙ্গিত দেয়, বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে গত এক দশকে চরম অবহেলা করা হয়েছে। আমদানিনির্ভরতার যে মডেল তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। টার্মিনালগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ টেকনিক্যাল ফল্ট সম্পর্কে সঠিক তথ্য না দেওয়াও এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। দুটি টার্মিনালের উপর নির্ভর না করে আরও বেসরকারি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীকে সম্পৃক্ত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করে এই বিশ্লেষক বলেন, কোনো ব্যবস্থাই মনোপলি হওয়া ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ভেতরের সিন্ডিকেট ও আমলাতান্ত্রিক সাবোটাজ আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। সংকট সামাল দিতে হলে সরকারকে এখনই দুটি সমান্তরাল পদক্ষেপ নিতে হবে। একদিকে বেসরকারি কোম্পানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি ও বাস্তব সরবরাহের নিরপেক্ষ অডিট পরিচালনা করে অসাধু চক্রকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে; অন্যদিকে প্রশাসনিক চেইনে থাকা অসৎ কর্মকর্তাদের অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে এবং জনদুর্ভোগ কমাতে তথ্যের শতভাগ স্বচ্ছতা ও কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই পারে জিম্মিদশা থেকে জ্বালানি খাতকে মুক্ত করতে।