আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬ ২৩:০১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ।
বুধবার তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যার পানিতে বেশ কয়েকটি গ্রাম ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে জানান, এখন পর্যন্ত ৯৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
দেশটির কর্মকর্তারা জানান, আকস্মিক বন্যার ঘটনায় ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ২৯১ জন পর্যটক রয়েছেন।
পার্বত্য জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে বন্যার পানি এতটাই বেড়ে গেছে যে সেখানে হেলিকপ্টারও অবতরণ করতে পারছে না।
জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। স্থানীয় প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেপাল সরকারের মুখপাত্র সাসমিত পোখরেল বলেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীনের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
Nepal
জেসিবি যন্ত্রে করে এক বন্যাদুর্গতকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের গিরং এলাকায় ভূমিধসের পর বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। এতে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফা দুর্যোগ ঠেকাতে নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
কাদামাটির স্রোতে ভেসে গেছে গ্রাম
নেপাল পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রকাশ করা ভিডিওতে পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে কাদামিশ্রিত পানির স্রোত নেমে আসতে দেখা গেছে।
নেপালের ইংরেজি দৈনিক রিপাবলিকা ডেইলির সম্পাদক কোশ রাজ কৈরালা জানান, আকস্মিক বন্যার সময় ভারী বৃষ্টিপাত ছিল না। ফলে অনেক মানুষ কোনো ধরনের প্রস্তুতির সুযোগ পাননি।
তিনি বলেন, মানুষ তখন বাড়িতে ছিল। কয়েকটি বাড়ি নদীর স্রোতে ভেসে গেছে।
আরও পড়ুন
নেপালে কেন এমন ভয়াবহ বন্যা, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা
নেপালে কেন এমন ভয়াবহ বন্যা, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে।
দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আট দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক নিখোঁজ এবং আরও ১০ জন আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের উদ্ধারে নেপাল ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তুষারধস থেকেই বন্যার সূত্রপাত?
আকস্মিক বন্যার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিমবাহ থেকে সৃষ্ট তুষার ও পাথরের ধস থেকেই এ বন্যার সূত্রপাত হতে পারে।
Nepal
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, ভোতে কোশি নদীর শাখা লেন্দে খোলা নদীতে ১৪ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। এবার নেপালের অংশে হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে দেওয়ার পর হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জলবায়ু ন্যায্যতা নিয়ে কাজ করা কর্মী প্রয়াশ অধিকারী বলেন, বন্যায় পুরো গ্রাম, ভবন, স্কুল, সেতু ও মহাসড়ক ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
ভোতে কোশি নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। পরে এটি নেপালের ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মিশেছে, যা ভারতে প্রবেশের পর গণ্ডক নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে।
গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যায় নয়জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হন। ওই বন্যায় নেপাল-চীন সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে দুই দেশের যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছিল।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টির কারণে নিয়মিত বন্যা ও ভূমিধস হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা