ঢাকা, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

আর্জেন্টিনাকে মেসির বিদায়

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৫৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার


আর্জেন্টিনাকে মেসির বিদায়

আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহ্যবাহী আকাশী-সাদা ১০ নম্বর জার্সি তুলে রাখলেন লিওনেল মেসি। এর সঙ্গে শেষ হলো টানা দুই দশকের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।

 

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার মিশন ব্যর্থ হওয়া এবং সম্প্রতি বাবা হোর্হে মেসির প্রয়াণের শোকে আচ্ছন্ন হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি।

কোনো দীর্ঘ বা জাঁকজমকপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন নয়, যে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামের জন্মও ২১ বছর আগে মেসির জাতীয় দলে অভিষেকের সময় ছিল না, সেই প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করা কিছু আবেগঘন পঙ্‌ক্তির মাধ্যমেই তিনি এই বিদায়ের ঘোষণা দেন।

 

একটি যুগের অবসান ঘটিয়ে নিজের মেসি লেখেন, 'সময় ফুরিয়ে আসছে, অধ্যায়গুলো শেষ হয়ে যায়, এবং এটি এমনই এক অধ্যায় যা আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিচ্ছে।'

জাতীয় দলকে জেতানোর জন্য নিজের শেষ বিন্দু পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

টুর্নামেন্টে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও চরম যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে তিনি আরও লেখেন, 'আমার পা আর চলছিল না। এবার আমি নিজের শারীরিক সীমার বাইরে গিয়ে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি।

'

 

দেশের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা এবং ক্যারিয়ারের কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি আবেগঘনভাবে যুক্ত করেন, 'আমি আপনাদের শপথ করে বলছি, আমি সবসময় সবটুকু দিয়েছি—শুধু এই শেষ কয়েক বছরেই নয় যখন আমরা সবকিছু জিতেছি, বরং তার আগেও।'

'তার আগেও'; এই দুটি শব্দের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ ইতিহাস। এমন এক সময়, যখন জাতীয় দলের হয়ে তিনি কিছুই জিততে পারেননি; যখন দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ও একাগ্রতা নিয়ে খোদ নিজ দেশের মানুষই প্রশ্ন তুলত; এবং যখন হারের সব দায় একা তার কাঁধেই চেপে বসত।

মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্কটা কখনোই খুব সহজ ছিল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে রোজারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানো এই লাজুক তরুণকে নিজের দেশেও দীর্ঘদিন পরবাসী হিসেবে দেখা হতো। তিনি কতটা ‘আর্জেন্টাইন’ বা তার মন স্পেনে পড়ে আছে কি না; এমন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো প্রতিবার। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়ার পর চরম হতাশায় তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ও জানিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, 'জাতীয় দল আমার জন্য এখানেই শেষ।'

তবে তিনি ফিরে এসেছিলেন। কোচ লিওনেল স্কালোনি ও পাবলো আইমারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এবং সতীর্থদের সমর্থনে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল নতুন প্রাণ পায়। আর তারপরই রচিত হয় ফুটবলের অন্যতম সেরা রূপকথা।

২০২১ সালে ব্রাজিলের মারাকানায় কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্রফির খরা কাটে মেসির। আর এর ১৮ মাস পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টে সাতটি গোল ও অজস্র মনোমুগ্ধকর পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে দেশকে বিশ্বসেরা করেন মেসি। যে ম্যারাডোনার ছায়া তাকে তাড়া করে বেড়াত, সেই কিংবদন্তির পাশেই নিজের আলাদা এক অমলিন আসন তৈরি করে নেন তিনি।

২০২৩ সালে ইউরোপের পাট চুকিয়ে তুলনামূলক কম চাপের মেজর লিগ সকারে (ইন্টার মায়ামি) যোগ দেন মেসি। উদ্দেশ্য ছিল শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে আরও কিছুটা দীর্ঘায়িত করা। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর ২০২৬ বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর।

বয়সের কারণে আগের মতো গতির ঝড় তুলতে না পারলেও নিজের খেলার ধরন বদলে ফেলেছিলেন তিনি। গতি কমালেও কমেনি তার ফুটবলের প্রজ্ঞা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিখুঁত পাসিং সেন্স। তরুণ সতীর্থদের ওপর আস্থা রেখে মাঠের কৌশল নিয়ন্ত্রণ করেছেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেলে আর্জেন্টিনা দলকে ফাইনালেও তোলেন। কিন্তু নিউ জার্সির ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে যাওয়ায় টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।

পেলের তিনটি বিশ্বকাপ জয় কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোলসংখ্যা হয়তো পরিসংখ্যানবিদদের কাছে আলাদা আলোড়ন তুলবে; কিন্তু মেসি ছিলেন শিল্প ও বিজ্ঞানের এমন এক নিখুঁত মিশ্রণ, যা ফুটবল বিশ্ব আর কখনো দেখেনি। তিনি বিদায় নিচ্ছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বাধিক গোল, অ্যাসিস্ট ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার প্রায় সব রেকর্ড সঙ্গে নিয়ে।

তবে এই সংখ্যাগুলোর চেয়েও বড় হয়ে থাকবে মাঠে তার তৈরি করা হাজারো অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। এক সময়ের সন্দেহ ও সমালোচনা পেরিয়ে ভালোবাসার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা হয়তো তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ককে হারাল, আর ফুটবল বিশ্ব হারাল তার সৌন্দর্যের সবচেয়ে খাঁটি রূপটিকে; হারাল তার আত্মাকেই!


   আরও সংবাদ