ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

যেভাবে এল ফিফা আসিয়ান কাপ

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:০৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৯ বার


যেভাবে এল ফিফা আসিয়ান কাপ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবল মানেই যেন আলাদা এক আবেগ। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর—দেশগুলোর মধ্যে ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু পুরোনো। কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলের জাতীয় দলগুলোর লড়াই ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু প্রতিযোগিতা আর আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টকে ঘিরে। নিয়মিত, নিজেদের একটি আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপের প্রয়োজনীয়তা তখন থেকেই অনুভূত হচ্ছিল।

সেই প্রয়োজন থেকেই ১৯৯৬ সালে জন্ম নেয় যে প্রতিযোগিতা, সেটিই পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পরিণত হয়। প্রথম আসরে নাম ছিল ‘টাইগার কাপ’। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে অংশ নেয় আসিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের ১০ সদস্য। দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে লড়াইয়ের পর ফাইনালে মালয়েশিয়াকে ১–০ গোলে হারিয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় থাইল্যান্ড। কিয়াতিসুক সেনামুয়াংয়ের করা একমাত্র গোলেই লেখা হয় নতুন ইতিহাস।

তবে এই গল্পের শুরু আরও একটু আগে। ১৯৯৪ সালে মালয়েশিয়ার উদ্যোগে আসিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের কার্যক্রম নতুন করে গতি পায়। তখন লক্ষ্য ছিল শুধু প্রশাসনিক সহযোগিতা নয়, সদস্য দেশগুলোর ফুটবলকে এগিয়ে নিতে নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। কিন্তু বড় একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য প্রয়োজন ছিল অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতা। সে সময়ের কর্মকর্তাদের ভাবনায় আসে—এমন একটি প্রতিযোগিতা দরকার, যা একদিকে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় দলকে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেবে, অন্যদিকে ফেডারেশনের আর্থিক ভিত্তিও শক্ত করবে। সেই ভাবনা থেকেই বাজারজাতযোগ্য একটি জাতীয় দলভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পায়।

১৯৯৬ সালের সেই প্রথম আসরই বদলে দেয় অঞ্চলের ফুটবলের চেহারা। সিঙ্গাপুরের ৫৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার জাতীয় স্টেডিয়াম ছিল মূল ভেন্যু। ফাইনাল দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৩২ হাজার দর্শক, সেমিফাইনালে দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার। বহুজাতিক ক্রীড়া আসর সি গেমসের বাইরে জাতীয় দলগুলোর জন্য আলাদা একটি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা হিসেবে টুর্নামেন্টটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এরপর নাম বদলেছে, পৃষ্ঠপোষক বদলেছে, টুর্নামেন্টের কাঠামোও বদলেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা কমেনি। ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বাছাইপর্ব চালু হয়। ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর প্রথমবারের মতো যৌথভাবে আয়োজক হয়। ২০০৪ সালে দুই লেগের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল চালু হয়। ২০০৮ সালে ‘টাইগার কাপ’ নামের অধ্যায় শেষ হয়ে প্রতিযোগিতার নাম হয় এএফএফ সুজুকি কাপ। ২০০৭ সালে মূল পৃষ্ঠপোষক না থাকায় একবার এর নাম ছিল শুধু এএফএফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। পরে ২০০৮ সালে সুজুকি পৃষ্ঠপোষক হওয়ার পর আবার নতুন পরিচয় পায় টুর্নামেন্টটি।

এ সময়ের মধ্যে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতার দুই প্রধান শক্তি। ১৯৯৬, ২০০০ ও ২০০২ সালে থাইল্যান্ড প্রথম তিনটি শিরোপার মধ্যে তিনটিই জেতে। সিঙ্গাপুর ১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০০৭ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়। ভিয়েতনাম প্রথমবার শিরোপা জেতে ২০০৮ সালে, আর ২০১০ সালে মালয়েশিয়া যোগ দেয় চ্যাম্পিয়নদের তালিকায়। পরবর্তী সময় থাইল্যান্ড আবার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

শুধু শিরোপার হিসাবেই অবশ্য এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব বোঝা যায় না। সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। ২০১৮ সালের আসরে দর্শক উপস্থিতি ছিল ৭ লাখ ৫২ হাজার ৯৪৫ জন। একই আসর থেকে গ্রুপ পর্বের কাঠামোও বদলে যায়—প্রতিটি দল নিজেদের মাঠে দুটি ও প্রতিপক্ষের মাঠে দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়।

এই জনপ্রিয়তার পেছনে ছিল আরেকটি বাস্তবতা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু ফুটবল সংস্কৃতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। জাতীয় দলগুলোর নিয়মিত লড়াই তাই শুধু শিরোপার জন্য নয়, আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নেও পরিণত হয়। ফিফাও সময়ের সঙ্গে এই অঞ্চলের ফুটবল সম্ভাবনা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

সেই সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় ২০১৯ সালে। ব্যাংককে ৩৫তম আসিয়ান সম্মেলনের পাশে ফিফা ও আসিয়ানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও আসিয়ানের তৎকালীন মহাসচিব দাতো লিম জক হই চুক্তিতে সই করেন। লক্ষ্য ছিল ফুটবলকে সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শিক্ষা, খেলোয়াড়দের সুরক্ষা, ক্রীড়া সততা ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।

এই সহযোগিতা শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘ফুটবল ফর স্কুলস’ কর্মসূচির মাধ্যমে স্কুলশিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল পৌঁছে দেওয়া, খেলাধুলার মাধ্যমে জীবনদক্ষতা তৈরি, নারীদের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, ম্যাচ পাতানো ও ডোপিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির মতো বিষয়ও ছিল সহযোগিতার অংশ। ২০২১ সালে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ‘রিচআউট’ প্রচারণাতেও ফিফা ও আসিয়ান একসঙ্গে কাজ করে।

এরপর আসে বড় ঘোষণা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কুয়ালালামপুরে ৪৭তম আসিয়ান সম্মেলনের সময় ফিফা ও আসিয়ানের মধ্যে নতুন পাঁচ বছরের সমঝোতা স্মারক সই হয়। সেই চুক্তির পরই ঘোষণা করা হয় নতুন ‘ফিফা আসিয়ান কাপ’-এর। উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব ফিফা সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে একটি নতুন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার আওতায় আনা। প্রতিযোগিতার কাঠামোকে ফিফা আরব কাপের আদলে করার কথা জানানো হয়।

এখানেই নতুন ফিফা আসিয়ান কাপের সঙ্গে পুরোনো আসিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। আসিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের আয়োজনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাতীয় দলগুলোর ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা। আর ফিফা আসিয়ান কাপ হচ্ছে ফিফা ও আসিয়ানের নতুন সহযোগিতার অংশ হিসেবে তৈরি নতুন একটি প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের সেই টুর্নামেন্টের সরাসরি নতুন নাম নয় এটি; বরং একই অঞ্চলের ফুটবল ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি নতুন মঞ্চ।

২০২৬ সালে সেই নতুন মঞ্চের পর্দা উঠছে। প্রথম ফিফা আসিয়ান কাপে অংশ নিচ্ছে ১৪টি দল—আসিয়ানের ১১ সদস্য দেশের পাশাপাশি আরও তিনটি অতিথি দল। ইন্দোনেশিয়া ও হংকং যৌথভাবে আয়োজন করছে প্রতিযোগিতাটি। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে পুরো আসর। প্রথম বিভাগে আটটি দল এবং দ্বিতীয় বিভাগে ছয়টি দল খেলবে। দুই বিভাগেই দুটি করে গ্রুপ থাকবে, গ্রুপপর্ব হবে এক লেগের লিগ পদ্ধতিতে। দুই গ্রুপের চ্যাম্পিয়নরা নিজ নিজ বিভাগের ফাইনালে খেলবে।

প্রথম বিভাগের ‘এ’ গ্রুপে আছে ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। ‘বি’ গ্রুপে ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়াম ও বান্দুংয়ের সি জালাক হারুপাত স্টেডিয়ামে হবে প্রথম বিভাগের ম্যাচ। দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচগুলো হবে হংকংয়ের কাই তাক স্টেডিয়াম ও মং কক স্টেডিয়ামে।

এক অর্থে তাই ফিফা আসিয়ান কাপের জন্ম কোনো একদিনের সিদ্ধান্তে নয়। এর পেছনে আছে তিন দশকেরও বেশি সময়ের আঞ্চলিক ফুটবল-চর্চা। ১৯৯৬ সালে টাইগার কাপ দিয়ে যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে এএফএফ চ্যাম্পিয়নশিপ, সুজুকি কাপ, মিতসুবিশি ইলেকট্রিক কাপ হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত আঞ্চলিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আর ২০১৯ সালে ফিফা–আসিয়ান সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং ২০২৫ সালে নতুন চুক্তির মধ্য দিয়ে সেই অঞ্চলের ফুটবল এবার ঢুকে পড়ছে ফিফার নিজস্ব একটি নতুন প্রতিযোগিতার পরিসরে।

১৯৯৬ সালে যে প্রতিযোগিতা জন্ম নিয়েছিল মূলত নিজেদের মধ্যে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর ফুটবলের আর্থিক ভিত্তি শক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে, তিন দশক পর তারই উত্তরাধিকার বহন করে নতুন এক নাম সামনে এসেছে—ফিফা আসিয়ান কাপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলের পুরোনো আবেগ এবার নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামোয় কতটা বড় হয়ে ওঠে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।


   আরও সংবাদ