ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ফিরছে ফিলিস্তিনের ফুটবল

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৪৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৫ বার


ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ফিরছে ফিলিস্তিনের ফুটবল

আল-খাদার স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠেছিল। কয়েক ঘণ্টার জন্য দৃশ্যটা ছিল যেন স্বাভাবিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।

গ্যালারিতে তরুণদের গান, পরিবারের সদস্যদের আসন নেওয়া, সামনের সারিতে শিশুদের ছোটাছুটি..সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল অন্য যেকোনো ফুটবল ম্যাচের মতোই একটি সন্ধ্যা।

 

মাঠে নেমেছিল আরব অর্থোডক্স বেইত জালা ও দেইশেহ ইয়ুথ ফুটবল দল।

বাঁশির শব্দের সঙ্গে শুরু হয় খেলা। দুই দল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ব্যস্ত, গ্যালারি থেকে উঠছিল উল্লাস, হতাশার শব্দ, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে চিৎকার।

প্রায় তিন বছর পর ফিলিস্তিনি ক্লাবগুলোর প্রথম সংগঠিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ ছিল এটি।

 

তবে ম্যাচের বিরতিতে হঠাৎ স্টেডিয়ামের পেছনে গোলমালের সৃষ্টি হয়।

দর্শকেরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে দেখতে শুরু করেন কী ঘটছে। মাঠ থেকে বেইত জালার ২০ বছর বয়সী খেলোয়াড় সিজার সাররাসও দেখছিলেন, কীভাবে পুরো গ্যালারি শব্দের দিকে ঘুরে যাচ্ছে।

 

‘আমি ভয় পেয়েছিলাম যখন দেখলাম সব দর্শক উঠে দাঁড়াচ্ছে,’ আল জাজিরাকে বলেন সাররাস।

‘কখনও কখনও শুনি, মাঠে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছে। আমি নিজে দেখিনি, কিন্তু এ ধরনের ঘটনা অনেক শুনেছি। তাই আমার মনে হয়েছিল, এটা হয়তো (ইসরায়েলি) সেনাবাহিনী।’

তবে এবার সেটি কোনো সামরিক অভিযান ছিল না। সমর্থকদের মধ্যকার একটি ঝগড়া থেকেই সেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি শান্ত হয়, দর্শকেরা আবার নিজেদের আসনে ফিরে যান এবং ম্যাচও শুরু হয়।

এরপর পুরো রাতের মনোযোগ আবার ফিরে যায় ফুটবলে।

‘এটি আমাদের অনুভব করায় যে, আমাদের জীবনেও একটু স্বাভাবিকতা আছে। বিদেশের মানুষের মতো,’ বলেন ১৫ বছর বয়সী রিমাস সারহান।

বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরের এই কিশোরী আওদ স্পোর্টস একাডেমি ও ফিলিস্তিনের যুব জাতীয় দলের হয়ে খেলেন। পূর্ণ গ্যালারির সামনে খেলার অনুভূতিকে তিনি বলেছেন ‘খুব সুন্দর একটি অনুভূতি’।

এই ম্যাচ ছিল ‘থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপ’-এর অংশ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে নিহত ১ হাজার ১৪ জন ক্রীড়াবিদের স্মরণে এই টুর্নামেন্টের নামকরণ করা হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বাড়তে থাকা হামলার কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর ফিলিস্তিনি ফুটবলে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ ফেরানোর অংশ হিসেবেই আয়োজন করা হয়েছে এই টুর্নামেন্ট।

ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) সাধারণ সম্পাদক ফিরাস আবু হিলাল বলেন, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কারণে ফুটবল কার্যক্রম দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

‘চেকপোস্ট, চলাচলের বিধিনিষেধ, স্থাপনায় হামলা এবং খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তারা সবাইকে ফুটবল খেলা থেকে বাধা দিয়েছে,’ বলেন আবু হিলাল।

তার দাবি, গাজায় প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেডিয়াম ধ্বংস হয়ে গেছে। কিছু মাঠে এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে।

‘আমরা এমন একটি সময়ে বড় হয়েছি, যখন আমাদের উন্নতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে গেছে,’ বলেন সাররাস।

‘সময়টা আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। কোনো লিগ ছিল না।’

এখন আবারও মাঠে ফিরেছে ২০০টির বেশি ক্লাব। পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে ফুটবল কার্যক্রম।

তবে এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য হারানোর গল্প। যুদ্ধের সময় অনেক ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিস্তিন জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড সুলাইমান আল-ওবেইদ, যিনি ২০২৫ সালে গাজায় ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় নিহত হন। এছাড়া ২০২৪ সালে নিহত হন অলিম্পিক দলের কোচ হানি আল-মাসদার।

‘আমরা ফিরে এসেছি পুরো বিশ্বকে দেখানোর জন্য যে, আমরা এমন একটি জাতি, যাদের বেঁচে থাকতে হবে,’ বলেন আবু হিলাল।

তবে মাঠে ফেরার পরও আগের মতোই নানা বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে খেলোয়াড়দের। পশ্চিম তীরে দূরপাল্লার যাতায়াত কমাতে পিএফএ কাছাকাছি এলাকার দলগুলোকে একসঙ্গে গ্রুপ করেছে। তারপরও ম্যাচ আয়োজন কঠিন হয়ে পড়ে।

‘প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহরের প্রবেশপথে একটি করে লোহার (সামরিক) গেট আছে,’ বলেন আবু হিলাল।

‘দখলদার বাহিনী যেকোনো সময় এসে সেই গেট বন্ধ করে দিতে পারে, তখন দল ম্যাচে পৌঁছাতে পারে না।’

তবে এসব বাধায় টুর্নামেন্ট বন্ধ হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি, ‘ম্যাচ পিছিয়ে যেতে পারে, কিন্তু বাতিল হবে না। ম্যাচ হতেই হবে, আমাদের খেলতেই হবে।’

ফুটবলের এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আর্থিক সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্লাব খেলোয়াড়দের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছে। ফলে অনেক পেশাদার ফুটবলার আবার অপেশাদার পর্যায়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রায় তিন বছর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল না থাকায় অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘কিছু মানুষের ক্রীড়া ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে,’ বলেন দেইশেহের খেলোয়াড় ও স্থানীয় ফুটবল একাডেমির কোচ মোহাম্মদ এল-জগাইরি।

‘আমি যদি একাডেমি ও কোচিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে ধরে না রাখতাম, তাহলে আবার মাঠে ফিরতে পারতাম না।’

তার নিজের ক্যারিয়ারও এর আগে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ইসরায়েলি কারাগারে বিভিন্ন স্থানে আট বছর ছয় মাস কাটাতে হয়েছিল তাকে। ২০১৫ সালে সেনাদের গুলিতে তার পায়ের হাড় ভেঙে যায়, যার কারণে দুই বছর মাঠের বাইরে ছিলেন।

‘আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম,’ বলেন এল-জগাইরি।

তবে পরে আবার অনুশীলনে ফিরে আসেন তিনি, ‘আত্মসমর্পণের কোনো জায়গা নেই। আমরা প্রতিরোধ করতে চাই, আমরা বাঁচতে চাই এবং আমরা আশাকে আঁকড়ে ধরতে চাই।’

গত তিন বছরে হামলার শিকার হওয়া অনেক মাঠেই এখন আবার ফুটবল চলছে। পিএফএর দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

পশ্চিম তীরেও ঝুঁকি কমেনি। বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরে আওদ স্পোর্টস একাডেমির মাঠটি ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতাবাদী দেয়াল ও নজরদারি টাওয়ারের ছায়ায় অবস্থিত। স্থানীয়রা জানান, শিবিরটিতে নিয়মিত সামরিক অভিযানও হয়।

২০ বছর বয়সী কারিম, যিনি থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বলেন এসব পরিস্থিতি খেলোয়াড়দের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। নিরাপত্তার কারণে নিজের আসল নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

এই মাঠটিও ধ্বংসের হুমকির মুখে পড়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মাঠটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবাদের পর ফিফা ও উয়েফাসহ বিভিন্ন ফুটবল সংস্থার উদ্যোগে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়। তবে মাঠের হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পায়নি আইদা ইয়ুথ সেন্টার।

‘এই মাঠ আমাদের জন্য শ্বাস নেওয়ার জায়গা,’ বলেন কারিম।

‘যখন ধ্বংসের নির্দেশ এসেছিল, আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা ভাবতেই পারিনি এমন কিছু হতে পারে।’

ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে শিশুদের দৌড়ানো ও খেলার জন্য এই মাঠ অন্যতম কয়েকটি খোলা জায়গার একটি। একই সঙ্গে এটি মেয়েদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

‘আমি সেই নিয়ম ভেঙেছি যে ফুটবল মেয়েদের জন্য নয়,’ বলেন ১৫ বছর বয়সী ফাতিমা লুৎফি, যিনি আওদ স্পোর্টস একাডেমির হয়ে খেলেন।

সব বাধা সত্ত্বেও পিএফএ জানিয়েছে, থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপ নিয়মিত আয়োজন করা হবে।

আল-খাদার স্টেডিয়াম থেকে সাররাস বলেন, ‘কিছু মানুষের জীবন নির্ভর করে তাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার ওপর। কারণ সেটাই তাদের আশা দেয়।’

‘আমাদের হয়তো অনেক কিছু নেই। কিন্তু আমরা আছি। আমরা শুধু একটি সংখ্যা নই।’


   আরও সংবাদ