ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪৩ বার
স্বাদহীন, গন্ধহীন ও খালি চোখে অদৃশ্য ভারী ধাতু ‘সীসা’ আজ দেশের শিশুদের স্বাভাবিক জীবন, মেধা ও শারীরিক বিকাশ নিঃশব্দে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে— বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর রক্তে ভেসে বেড়াচ্ছে বিষাক্ত এই সীসা, যা এক মারাত্মক ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’র জন্ম দিয়েছে। ঢাকার বাতাসে বিষ ছড়িয়ে দেওয়া অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি কারখানা থেকে শুরু করে থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য এবং দেশে বিশেষায়িত ল্যাব ও চিকিৎসার চরম সংকট— এই পুরো বিষাক্ত চক্রটিকে উদ্ঘাটন করতে -এর তিন পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানী সিরিজের আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব: থ্রি-হুইলারের পেটে ব্যাটারির বিষ, আঁধারে ৩ কোটি শৈশব।
ঝাঁজালো বাতাসে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। সকাল হতেই পোড়া ব্যাটারির গন্ধ যেন নিত্যদিনের ব্যাপার। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যেত বসতবাড়ির পাশের আকাশ। সেই জায়গাটিই ছিল আট বছরের অনিকের খেলার মাঠ। বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলত, দৌড়াদৌড়ি করত। ব্যাটারি পোড়ানোর স্থানটির পাশ দিয়েই হেঁটে যেত স্কুলে।
সাভারের আশুলিয়া কাঠগোড়া এলাকার শিশু অনিক তখনও জানত না যে ধোঁয়া তার নাক-মুখ দিয়ে ঢুকছে, যে ধূলিকণায় সে খেলছে, সেটিই ধীরে ধীরে তার শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। একসময় অনিকের রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেল, তার শরীরে সীসার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি।
গবেষণায় সীসা দূষণের উৎসটি চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি বন্ধ হয় এবং জায়গাটি পরিষ্কারও করা হয়। কিন্তু সীসার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অনিক আর পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। অনিক বলে, ‘পড়তে বসলে অনেক কিছু ভুলে যাই। মনোযোগ ধরে রাখতে খুব কষ্ট হয়।’ মা শারমিন আক্তারের উদ্বেগও কাটেনি। তিনি বলেন, ‘এখন অনিক কিছুটা ভালো, কিন্তু সীসার ক্ষতি পুরোপুরি যায়নি। তার স্মৃতিশক্তিজনিত সমস্যা রয়ে গেছে।’
এটি শুধু অনিকের একার গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশুর জন্য এটি এক অদৃশ্য বিপদের প্রতিচ্ছবি— যার মূলে রয়েছে ব্যাটারির অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ রিসাইক্লিং। অথচ সীসা গলানোর এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হয়নি; নেই সরকারের কার্যকর নজরদারিও।
আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণার তথ্য মতে, ব্যাটারি তৈরির কারখানা বা সীসা গলানো শিল্পস্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে বসবাসকারীদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
দেশে ৫০ থেকে ৮০ লাখ অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার ও ই-রিকশা থেকে প্রতি বছর উৎপাদিত ১ লাখ ৬৭ হাজার টন সীসা বর্জ্যের ৭০% অবৈধ চেইনে গিয়ে মিশছে। ফলে বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে গড়ে ৬.৮ µg/dL মাত্রায় সীসা বিষক্রিয়ায় ভুগছে দেশের ৬০% বা প্রায় ৩ কোটি শিশু, যা শিশুদের স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত করছে
পরিবেশবাদী সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর ২০২৬ সালের গবেষণার তথ্যও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংস্থাটির মতে, দেশে ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই চলে যায় অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং নেটওয়ার্কে। সেখানে খোলা জায়গায় বা মাটির গর্তে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই সীসা গলানো হয়।
পিওর আর্থের অপর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তিন চাকার যান— ইজিবাইক, মিশুক ও ই-রিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারিই সীসাদূষণ ছড়ানোর প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার রয়েছে, যেগুলোর ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সীসাদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বিষাক্ত সীসার ধোঁয়ায় হুমকির মুখে আশুলিয়ার অনিকের মতো দেশের ৩ কোটি শৈশব / ছবি- সংগৃহীত
‘বাংলাদেশে সীসাদূষণ হ্রাসের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, সীসা দূষণে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে (আইএইচএমই, ২০২০)। দেশে প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় তিন কোটি শিশু সীসার বিষক্রিয়ায় ভুগছে। শিশুদের রক্তে সীসার গড় মাত্রা ৬.৮ µg/dL (মাইক্রোগ্রাম পার ডেসিলিটার), যা গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ব্যাটারি যখন তার কার্যক্ষমতা হারায় বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গাড়ি চালানোর অযোগ্য হয়ে পড়ে, তখনও কিন্তু তার আয়ু শেষ হয় না; কিংবা সেটি ফেলে দেওয়া সাধারণ বর্জ্যে পরিণত হয় না। বরং এর ভেতরে জমে থাকে সীসা, মারাত্মক অ্যাসিড ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য নানা উপাদান। এসব মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের জন্যই শুরু হয় ব্যাটারি ভাঙা, প্লেট আলাদা করা এবং সীসা গলানোর কর্মযজ্ঞ।
আরও পড়ুন
‘নীরব ঘাতক’ সিসার বিষে নীল শৈশব
শিশু নিখোঁজের জিডি নিতে গড়িমসি, তদন্তেও ‘অনীহা’ পুলিশের!
মায়ের জন্মদিনে সাজেক যাওয়া হলো না, ডেঙ্গু কেড়ে নিল ছোট্ট হিয়ার প্রাণ
নিয়ম মেনে পরিবেশবান্ধব ও অনুমোদিত কারখানায় এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে, পুরো কার্যক্রমটিই পরিণত হয় বিষ ছড়ানোর এক ভয়াল মাধ্যমে। আর আশঙ্কাজনক বিষয় হলো— বাংলাদেশে মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারির সিংহভাগই এখনও চলে যাচ্ছে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকা এই অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং চক্রে।
অটোরিকশার বাড়বাড়ন্তে বাড়ছে দূষণ
রাজধানীসহ সারা দেশের সড়কে এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মিশুকের দাপট। এসব যানে ব্যবহৃত মেয়াদোত্তীর্ণ সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি মারাত্মক পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করলেও দেশে নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত অটোরিকশার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে একক কোনো তথ্য বা হিসাব নেই।
অনুমোদিত রিসাইক্লিং কারখানা মাত্র ৬টি থাকলেও দেশজুড়ে খোলা স্থানে গোপনে সীসা গলানোর ১,১০০টির বেশি অননুমোদিত ইউনিট সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হলেও কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ না থাকায় এবং অবৈধ কারখানাসমূহ বারবার স্থান পরিবর্তন করার কারণে এই ক্ষতিকর প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে
তবে, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা চলাচল করছে; যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই রয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ। এসব যানবাহন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। সারা দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজারের মতো হলেও শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট। এসব যানে অনিরাপদভাবে ব্যবহৃত সস্তা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিই এখন বড় প্রাকৃতিক ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সীসার বিষক্রিয়ায় কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ ও স্মৃতিশক্তি চিরতরে ব্যাহত হচ্ছে / ছবি-
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অন্তত ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও অটোরিকশা রয়েছে। প্রতিটি অটোরিকশায় অন্তত ৪টি করে ১২ ভোল্টের লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। গড়ে ৭ থেকে ১০ মাস, সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকার পর ব্যাটারিগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া সাধারণ যানবাহনের হিসাব যোগ করলে বাংলাদেশে প্রতি বছর কমপক্ষে ২ কোটি ৪০ লাখ ব্যাটারি পরিত্যক্ত হচ্ছে।
এসব বর্জ্য ভাঙাড়ির দোকান থেকে শুরু করে অবৈধ সীসা গলানো কারখানায় পৌঁছে হাতবদল হয়। খোলা আগুনে পুড়িয়ে অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে এসব পরিত্যক্ত ব্যাটারি গালানোর ফলে বাতাসে বিষাক্ত সীসা ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
‘পানি খামু আব্বু’—মাস্ক খুলে পানি খেতেই রক্তবমি, নিথর হয়ে গেল আবির!
‘জেনে, না বুঝে’ সাইবার অপরাধে কিশোর-তরুণরা
কারখানার শ্রমিকদের অধিকাংশই শিশু!
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (UNCTAD) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ই-রিকশা থেকে অন্তত ১ লাখ ৬৭ হাজার টন সীসা বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ মানসম্মত উপায়ে রিসাইকেল করা গেলেও বাকি ৭০ শতাংশই প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে পুরোপুরি অরক্ষিত ও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায়। এর ফলে বিষাক্ত এই ধাতু মাটি, পানি, বাতাস ও খাদ্যশৃঙ্খলে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করছে। এছাড়া, ২০২৬ সালের জুনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘সেফার লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি সার্কুলার ইকোনমি’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, দেশে ব্যবহৃত ব্যাটারির প্রায় ৮০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত অনিবন্ধিত, অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক স্থাপনায় বিপজ্জনক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।
লোকচক্ষুর আড়ালে বিষাক্ত বাণিজ্য
কয়েক বছর আগেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোকালয়ের ভেতরে বা খোলা জায়গায় মাটি গর্ত করে সীসা গলানোর দৃশ্য চোখে পড়ত। সেখানে ব্যাটারির প্লেট ও সীসার অংশ পুড়িয়ে ধাতু আলাদা করা হতো। তবে, সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকি ও নিয়মিত অভিযানের মুখে এখন সেই দৃশ্য আর প্রকাশ্যে দেখা যায় না। কিন্তু প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়নি; বরং লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউনেপ) ২০২০ সালের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি (ULAB) জমা হয়। দেশজুড়ে সক্রিয় রয়েছে ১,১০০টিরও বেশি অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং কারখানা, যার মধ্যে ২৭০টিরও বেশি স্থান ইতোমধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অবৈধ কারখানার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। এমনকি এই মুহূর্তে ছাড়পত্র পাওয়া বৈধ রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান ঠিক কতটি রয়েছে, তাও বলা সম্ভব নয়। কারণ, এ ধরনের কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ নেই; তথ্যগুলো বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।মাসুদ ইকবাল মো. শামীম, পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র), পরিবেশ অধিদপ্তর
ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সোলার হোম সিস্টেম (SHS), মোটরযান, আইপিএস এবং টেলিকম টাওয়ারে ব্যবহৃত ব্যাটারির উচ্চ চাহিদাই এই খাতের মূল চালিকাশক্তি। অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ সংগ্রাহকরা ক্রেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতের চেয়ে বেশি দাম দেয় এবং ব্যাটারির প্রতিটি অংশই পুনর্ব্যবহার করে; ফলে পুরোনো ব্যাটারির সিংহভাগই চলে যায় এই অনিয়ন্ত্রিত খাতে।

ই-রিকশার ব্যাটারি ভাঙার গোপন অনানুষ্ঠানিক চেইন বাড়াচ্ছ মারাত্মক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি / ছবি- সংগৃহীত
তদারককারী সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাটারির ভেতরের সীসা অত্যন্ত মূল্যবান। ফলে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রাহক থেকে শুরু করে ভাঙারি ব্যবসায়ী, ছোট কারখানা ও সীসা ব্যবসায়ী— সবাই মিলে একটি সুদীর্ঘ সরবরাহ চেইন গড়ে তুলেছে। অনুমোদিত কারখানার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণে খরচ কম হওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাতিল ব্যাটারি সেখানেই গিয়ে পৌঁছায়।
অস্থায়ী এসব কারখানার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অটোরিকশার ব্যাটারি দুর্বল হয়ে পড়লে চালকরা তা গ্যারেজ বা ব্যাটারির দোকানে বিক্রি করে দেন। সেখান থেকে তা পৌঁছায় ভাঙারি ব্যবসায়ীদের হাতে। কেউ নিজেরা ব্যাটারি ভেঙে সীসা আলাদা করেন, আবার কেউ অনানুষ্ঠানিক কারখানার কাছে বিক্রি করে দেন।
আরও পড়ুন
যার কাঁধে সচল অর্থনীতি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার সেই নারী
কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার গেন্ডারিয়া, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকার বেড়িবাঁধ, কামরাঙ্গীরচরের ব্যাটারি গলি, মিরপুর বেড়িবাঁধ, আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, সাভার, তুরাগ ও দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে অবৈধ সীসা কারখানা।
এছাড়া আশুলিয়া, বিরুলিয়া, টঙ্গী বেড়িবাঁধ, গাজীপুরের গহিন বনাঞ্চল এবং গ্রাম্য এলাকায় এসব কারখানা গোপনে চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে টঙ্গীর বিসিক আবাসিক এলাকা, আরিচপুর, চেরাগ আলী, হোসেন মার্কেট, মিয়াপাড়া, এরশাদনগর, আউচপাড়া, মরকুন ও বোর্ড বাজার এলাকায় অস্থায়ী বেশ কয়েকটি ব্যাটারি গলানো কারখানার সন্ধান মিলেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ইউনিয়নের করেরগাঁও এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাইনবোর্ডহীন টিনের বেড়া দেওয়া একটি কারখানায় পুরোনো ব্যাটারি ও লোহালক্কড় গলানোর কাজ চলছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে ১৫-১৬ জন শ্রমিক সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করছেন। কেউ ব্যাটারির প্লেট খুলছেন, কেউ-বা ঢালছেন তেজস্ক্রিয় অ্যাসিড। দুপুরের খাবারের বিরতিতে বিষাক্ত অ্যাসিড ও সীসা ধোয়া হাত-মুখ নিয়েই শ্রমিকরা স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে যান কিংবা পাশের পুকুরে গোসল করেন।
অটোরিকশার ব্যাটারি ৭-১০ মাসে নষ্ট হলে তা স্থানীয় ভাঙাড়ির দোকান থেকে সরাসরি বিষাক্ত সীসা গলানোর অনানুষ্ঠানিক কারখানায় যায়। খোলা বাতাসে পোড়ানোর ফলে আশেপাশের ২.৫ কিলোমিটার এলাকার ফসলি জমির উৎপাদন হ্রাস পায়, গাছপালার রঙ বদলায় এবং পুকুরের পানি কালো হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যা তৈরি করে
করেরগাঁওয়ের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এসব কারখানায় দিনে-রাতে পুরোনো ব্যাটারি গলানো হচ্ছে। এর বিষাক্ত প্রভাবে আশপাশের আড়াই কিলোমিটার এলাকার ফসলি জমির ফলন কমে গেছে, গাছপালা ও সবজির রঙ বদলে গেছে এবং পুকুরের পানি হয়ে পড়েছে কালচে। অ্যাসিডের ঝাঁজালো গন্ধের কারণে এলাকার অনেকেরই শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে।’

দেশে ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই চলে যায় অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং নেটওয়ার্কে / ছবি- ঢাকা পোস্ট
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রিশাদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘সীসার ভয়াবহতা সম্পর্কে এখানকার সাধারণ মানুষ সচেতন নন। অথচ সীসা পোড়ানো ধোঁয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। একই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে জমি ও পরিবেশ।’
ঝুঁকির কথা জানা সত্ত্বেও পেটের দায়ে কাজ করার কথা জানান কারখানার কর্মী আলিম। তিনি বলেন, ‘এলাকায় অন্য কাজ কম। শারীরিক ঝুঁকি আছে জেনেও বেশি মজুরি পাওয়ার আশায় এই ব্যাটারি কারখানায় কাজ করছি।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপ-পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ব্যাটারি উৎপাদনের মতোই তা রিসাইকেল বা গলানোর ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। অনুমোদন ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে সীসা গলানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর।’
তিনি আরও জানান, খবর পাওয়া মাত্রই অবৈধ কারখানা বন্ধ, সিলগালা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কেরানীগঞ্জ ও ডেমরাসহ একাধিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে এবং এই ধারাবাহিক তদারকি অব্যাহত রয়েছে।
অভিযানের পরও থামছে না তৎপরতা
পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অভিযান ও নজরদারির কারণে অসদুপায় অবলম্বনকারী কারবারিরা এখন লোকালয়ের প্রকাশ্য স্থানের বদলে অপেক্ষাকৃত নির্জন ও দুর্গম এলাকা বেছে নিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা ও নীতিগত আলোচনায়ও এ ধরনের কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের এক নীতিবিষয়ক সংলাপে গবেষকরা জানান, অনানুষ্ঠানিক এসব রিসাইক্লিং কারখানা ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য কোনো আইনসম্মত ব্যবসার লাইসেন্স দেখিয়ে তার আড়ালে গোপনে ব্যাটারি ভাঙা ও সীসা গলানোর কাজ চালানো হয়। ফলে অভিযান চালিয়ে একটি কারখানা বন্ধ করলেও সমস্যাটি স্থায়ীভাবে মিটছে না।
ব্যাটারি তৈরি, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও একাধিক বিধিমালা থাকলেও প্রয়োগে বড় ঘাটতি রয়েছে। ব্যাটারির উৎপাদন থেকে বিনাশ পর্যন্ত সম্পূর্ণ জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পর্যায়ে ট্রেসেবিলিটি বা ডিজিটাল ট্র্যাকিং, নির্দিষ্ট স্মেল্টিং ফি চালু এবং আন্তর্জাতিক মানের বর্ধিত উৎপাদক-দায়বদ্ধতা (EPR) নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে
অর্থাৎ, প্রকাশ্য ‘ভাটি’ বা সীসা গলানোর চুলা কমলেও পুরো চক্রটি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে না। বরং বসতবাড়ির পেছনে, পরিত্যক্ত প্রাঙ্গণে, গুদামের আড়ালে কিংবা ছদ্মবেশী কোনো ব্যবসার সুযোগ নিয়ে বিপজ্জনক উপায়ে সীসা গলানোর এই অবৈধ কাজ অব্যাহত রয়েছে।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে কালচে হয়ে যাচ্ছে আশপাশের পুকুর ও জলাশয়ের পানি / ছবি- সংগৃহীত
গত জুনে এমনই এক গোপন কারখানার সন্ধান মেলে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বনের গভীরে। উপজেলার জাথালিয়া, মজিদচালা ও মৌচাক ইউনিয়নের কাচারস এলাকায় সবুজে ঘেরা গহিন বনের ভেতরে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয় নামহীন দুটি কারখানা। কয়লা ব্যবহার করে সেখানে রাতের আঁধারে পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানো হতো, যা থেকে নির্গত তীব্র কালো ধোঁয়া ও অ্যাসিডের ঝাঁজালো দুর্গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই শুরু হতো ব্যাটারি পোড়ানোর আয়োজন, যা চলত রাতভর। এতে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। গাছপালার পাতা ও বাসাবাড়ির টিনের চালে আস্তরণ জমতে শুরু করে কয়লার মতো কালচে পদার্থের।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সদস্য মোতালেব মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এ এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন স্বচ্ছ ও সতেজ বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেলেও হঠাৎ গড়ে ওঠা কারখানা দুটি স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পরিবেশ ধ্বংসকারী এসব কারখানা স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের বিকল্প নেই।’
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ফখরুল হোসাইন স্পষ্ট জানান, ‘বন বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির কোনো সুযোগ নেই এবং এর কোনো অনুমোদনও দেওয়া হয় না। এটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও বেআইনি।’
পরবর্তীতে জানা যায়, জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কারখানা দুটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় আইনি ব্যবস্থা। যদিও অনুসন্ধানে উঠে আসে, বন্ধ হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠান দুটি অন্য এলাকায় একইভাবে তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
৮ বছরে ১০১টি ভ্রাম্যমাণ আদালত, মামলা ১৩৬
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত গত আট বছরে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি কারখানায় ১০১টি ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ১৩৬টি মামলা দায়েরের পাশাপাশি ১ কোটি ১৯ লাখ ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, যার মধ্যে আদায় হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
সীসাদূষণ বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে সীসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বহুবর্ষী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। তবে, কেবল অবৈধ কারখানা বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; শিল্পখাতের জন্য বিসিক এলাকায় পৃথক রিসাইক্লিং জোন তৈরি এবং সীসা কারখানার শ্রমজীবী মানুষদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন
অভিযানের অংশ হিসেবে ১৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া, ৩৭টি সীসা বা ব্যাটারি গলানোর কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ, ২৬টি কারখানা পুরোপুরি উচ্ছেদ এবং ১৭টি কারখানার বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

ঢাকার আশপাশের এলাকায় পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে চলছে ব্যাটারি গলানো / ছবি- সংগৃহীত
এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৬৫৩টি সীসা বার, ৫৯ বস্তা পুরোনো সীসা বার, ২৯৯টি পুরোনো ব্যাটারি, ২৮টি ফর্মা এবং ২০টি হাতল। একই সঙ্গে জব্দ করা হয় ১৭ ট্রাক সীসা গলানোর যন্ত্রপাতি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে প্রশাসনের অভিযান একেবারে নেই, বিষয়টি তেমন নয়। তবে, তদারকি ও কার্যকারিতা নিয়ে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন। একটি কারখানা উচ্ছেদ বা সিলগালা করার পর সেই স্থানে বা অন্য কোথাও নতুন করে কারখানা গড়ে উঠছে কি না এবং বাসাবাড়ি বা গ্যারেজ থেকে পরিত্যক্ত ব্যাটারি শেষ পর্যন্ত কোন হাত ঘুরে কোথায় যাচ্ছে— তার পূর্ণাঙ্গ কোনো হিসাব বা তথ্য নজরদারি নেই অধিদপ্তরের কাছে।
নেই কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ, জানা নেই বৈধ-অবৈধের হিসাব
পরিবেশবাদী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর ‘টক্সিক সাইটস আইডেন্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’-এর ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্যে উঠে এসেছে সীসা দূষণের এক ভয়াবহ চিত্র। বাংলাদেশে ৩৫০টির বেশি সম্ভাব্য দূষিত স্থান পরীক্ষা করে ২৯০টিতেই সীসাদূষণের প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ২৬০টি স্থান সরাসরি সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, গলানো বা মেরামতের কাজে যুক্ত।
আরও পড়ুন
নিষিদ্ধ শিশুশ্রমে ‘নীল’ ওদের শৈশব
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দূষিত স্থান শনাক্ত হয়েছে ঢাকায়, ৫৪টি। এছাড়া টাঙ্গাইলে ৩৭টি, চট্টগ্রামে ২৩টি, নারায়ণগঞ্জে ২২টি, খুলনায় ২১টি, গাজীপুরে ২০টি এবং গাইবান্ধায় ১৯টি দূষিত স্থান চিহ্নিত করা গেছে।
এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, সীসাদূষণ কেবল রাজধানী বা বড় শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শহর, উপশহর থেকে শুরু করে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে পুরোনো ব্যাটারি ভাঙা ও গলানোর ছোট-বড় কেন্দ্র। অথচ দেশে ঠিক কতগুলো অবৈধ কারখানায় সীসা গলানোর কাজ চলছে কিংবা এসবের নেপথ্যে কারা জড়িত— তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব বা ডেটাবেজ নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে।
শুধু অবৈধ কারখানাই নয়, পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া বৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানগুলোরও কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ সংরক্ষণ করে না দপ্তরটি।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র) মাসুদ ইকবাল মো. শামীম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অবৈধ কারখানার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। এমনকি এই মুহূর্তে ছাড়পত্র পাওয়া বৈধ রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান ঠিক কতটি রয়েছে, তাও বলা সম্ভব নয়। কারণ, এ ধরনের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ নেই; তথ্যগুলো বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।’
একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ গড়ে তোলা জরুরি। এর আওতায় অননুমোদিত ব্যাটারি উৎপাদন ও ভাঙা বন্ধে কার্যকর নজরদারি, সারা দেশে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, জাতীয় ডাটাবেজ ও ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।মুনাওয়ার মিসবাহ মঈন, সভাপতি, ABMEAB
অবশ্য, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউনেপ) ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক বা বৈধ খাতে প্রক্রিয়াজাতকরণের অনুমোদিত কারখানা রয়েছে মাত্র ৬টি। এর মধ্যে ৪টি ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিসাইক্লিং ইউনিট রয়েছে। সেগুলো হলো— রহিমআফরোজ ব্যাটারিজ লিমিটেড (জিরানী বাজার, সাভার), পান্না ব্যাটারি লিমিটেড (পশ্চিম রসুলপুর, কামরাঙ্গীরচর), খোরশেদ মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ/হামকো গ্রুপ (বিসিক শিল্প এলাকা, খুলনা) এবং রিমসো ব্যাটারি (মাসাবো, বরপা, নারায়ণগঞ্জ)।

সাভারে অবস্থিত একটি অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা / ছবি- সংগৃহীত
বাকি দুটি স্বাধীন অনুমোদিত রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে— কিষাণ অ্যাকুমুলেটরস লিমিটেড (উজিরপুর, নড়াইল) ও বেঙ্গলএক্সপো লিমিটেড (পাবনা)।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে প্রতিনিয়ত জমা হওয়া বিশাল পরিমাণ পুরোনো ব্যাটারির তুলনায় এই মাত্র কয়েকটি বৈধ কারখানার ধারণক্ষমতা বা প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এছাড়া, কারখানাগুলো মূলত বড় শহরের আশপাশে অবস্থিত হওয়ায় দেশের দূরদূরান্ত থেকে বাতিল ব্যাটারি সংগ্রহ করা তাদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
আইনের অভাব নেই, বড় সংকট প্রয়োগে
বাংলাদেশে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে একেবারেই কোনো নীতিমালা বা আইন নেই— বিষয়টি এমন নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিমালায় লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি প্রস্তুত, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি ও ব্যবহার সংক্রান্ত ২০২১ সালের এসআরও (SRO) এবং পৃথক প্রজ্ঞাপন রয়েছে। পাশাপাশি ‘বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজভাঙা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১’-তেও সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির প্লেট ও সীসাজাত বর্জ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২-এর আওতায় পরিবেশ দূষণ ও বিপজ্জনক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের স্পষ্ট আইনি বিধান রয়েছে।
পিওর আর্থ বাংলাদেশ পুরোনো বা ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির জন্য ‘সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব’ (EPR) নির্দেশিকা তৈরিতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি থ্রি-হুইলারের নিবন্ধন, ব্যাটারির ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা এবং বৈধ রিসাইক্লারদের উৎসাহিত করতে নির্দিষ্ট ‘স্মেল্টিং ফি’ প্রবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।পিওর আর্থের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ
তবে, এত সব আইন ও নীতিমালার অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও ব্যাটারির পুরো জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণে বড় ফাঁক থেকে গেছে। ব্যাটারি তৈরি বা আমদানি থেকে শুরু করে এর বিক্রি, ব্যবহার, বাতিল ব্যাটারি সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত সীসা পুনরুদ্ধার— পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তদারকির জন্য কার্যকর কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আইনি কাঠামো থাকলেও তার প্রয়োগ বাস্তবে বেশ দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা ছাড়া সমাধান কঠিন
২০২৬ সালের জুনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পিওর আর্থ বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা এবং জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে একটি নীতিবিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ব্যবহৃত ব্যাটারির জন্য জাতীয় পর্যায়ে ‘ট্রেসেবিলিটি’ বা ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাটারি কোথায় তৈরি হলো, কে কিনল, কোথায় ব্যবহৃত হলো, কখন বাতিল হলো এবং শেষ পর্যন্ত কোন অনুমোদিত রিসাইক্লারের কাছে গেল, তার পুরো ডিজিটাল হিসাব সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত একটি সীসা উৎপাদনকারী কারখানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত / ছবি- সংগৃহীত
ওই আলোচনায় বাতিল ব্যাটারি অবৈধ পথে না গিয়ে অনুমোদিত রিসাইক্লিং কেন্দ্রে পাঠানো নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, নির্দিষ্ট ‘স্মেল্টিং ফি’ নির্ধারণ এবং বর্ধিত উৎপাদক-দায়বদ্ধতা (EPR) কাঠামো অনুসরণের তাগিদ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা পিওর আর্থ জানিয়েছে, বাংলাদেশে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির জন্য দেশের প্রথম ‘বর্ধিত উৎপাদক-দায়বদ্ধতা’ (EPR) নির্দেশিকা তৈরিতে তারা কাজ করছে। এতে ব্যাটারির উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে সংগ্রহ, রিসাইক্লিং এবং চূড়ান্ত বিনাশ পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রের দায়িত্ব নির্ধারণ ও গতিপথ অনুসরণের রূপরেখা থাকছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল নিজ নির্বাচনী এলাকার একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘অননুমোদিত ব্যাটারি গলানো কারখানাগুলোই সীসা দূষণের প্রধান কারণ। এসব কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। নরসিংদীর মনোহরদীতে এমন একটি অবৈধ কারখানা থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। সম্প্রতি এক শিশুর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কারখানাটি গুঁড়িয়ে দেয়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে এসব মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাটারি গলানো কারখানা অবিলম্বে ও কঠোরভাবে বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।’
পরিবেশগত সুবিচার বা ‘এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যখন আমরা জানতে পারলাম যে দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ এই সীসাদূষণের মাধ্যমে চরম হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে, তখন উপলব্ধি করলাম— বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই সীসাদূষণ তথা পরিবেশ দূষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।তরুণ পরিবেশকর্মী সোহানুর রহমান
সরকারের নতুন পরিকল্পনা, আছে চ্যালেঞ্জও
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনানুষ্ঠানিক সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও গোপন সীসা গলানোর স্থানগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত নজরদারির আওতায় আনতে জেলা প্রশাসনগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সীসা দূষণ মোকাবিলায় তৈরি করা ‘জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষী কর্মপরিকল্পনা’ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।

জাতীয় পর্যায়ে ব্যাটারির ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও নিরাপদ রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি / ছবি- ঢাকা পোস্ট
পিওর আর্থ-এর কারিগরি সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে সীসা দূষিত এলাকা শনাক্তকরণ, তদন্ত, প্রতিকার ও ঝুঁকি হ্রাসের মানদণ্ড (প্রটোকল) প্রস্তুত করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ৪০ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিবেশ-২ অধিশাখা) মোহাম্মদ রেজাউল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মানবদেহে সীসার ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে সরকার পূর্ণ সচেতন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের নীতি হলো জিরো টলারেন্স। সীসার গ্রহণযোগ্য কোনো মাত্রা থাকতে পারে না। শিশু, গর্ভবতী নারী এবং গর্ভের সন্তানও এখন উচ্চমাত্রার সীসা দূষণের শিকার হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক সংলাপে বসেছি এবং একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা দাঁড় করিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি সীসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’
আরও পড়ুন
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব এলাকায় সীসা দূষণের তীব্রতা বেশি, সেই হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে বহু-বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা (মাল্টি-ইয়ার প্ল্যান) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় আলোচনা করে কোন মন্ত্রণালয় কী কাজ করবে, তার দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা সফল হব।’
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা হবে অনানুষ্ঠানিক কারখানা
মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ সম্পর্কে যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, অননুমোদিত বা অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) উপায়ে যারা সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কীভাবে নিয়মভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা যায়, সে বিষয়ে রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশজুড়ে সীসা দূষণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা ‘হটস্পট’গুলোর একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
উৎপাদক ও আমদানিকারকদের দায়
সীসা দূষণ বন্ধে করণীয় সম্পর্কে অ্যাকুমুলেটর ব্যাটারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ABMEAB) সভাপতি মুনাওয়ার মিসবাহ মঈন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ব্যাটারি ভাঙা ও রিসাইক্লিং কার্যক্রমকে পরিবেশসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে প্রতিটি জেলার বিসিক শিল্পনগরীতে পৃথক জোন বা ক্লাস্টার গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে অননুমোদিত ও অপরিকল্পিত স্থানে ব্যাটারি ভাঙার প্রবণতা কমবে এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’
মানবদেহে সীসার ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে সরকার পূর্ণ সচেতন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের নীতি হলো জিরো টলারেন্স। সীসার গ্রহণযোগ্য কোনো মাত্রা থাকতে পারে না। শিশু, গর্ভবতী নারী এবং গর্ভের সন্তানও এখন উচ্চমাত্রার সীসা দূষণের শিকার হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক সংলাপে বসেছি এবং একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা দাঁড় করিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি সীসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।মোহাম্মদ রেজাউল করিম, যুগ্মসচিব (পরিবেশ-২ অধিশাখা), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়
তিনি বলেন, ‘ABMEAB-এর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও সুপারিশ বহুবার তুলে ধরা হয়েছে। নির্ধারিত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং কঠোর সরকারি নজরদারির মাধ্যমে রিসাইক্লিং পরিচালিত হলে সীসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।’
ব্যাটারি খাতকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করতে সরকারের নেতৃত্বে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ গড়ে তোলার জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর আওতায় অননুমোদিত ব্যাটারি উৎপাদন ও ভাঙা বন্ধে কার্যকর নজরদারি, সারা দেশে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, জাতীয় ডাটাবেজ ও ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

২০৩৫ সালের মধ্যে সীসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা / ছবি- ঢাকা পোস্ট
একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার সঠিক বাস্তবায়ন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা ও ব্যাটারি শিল্পের টেকসই বিকাশ— দুটি লক্ষ্যই একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।
একই বিষয়ে পিওর আর্থের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সীসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হলো ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার বা ইজিবাইক ও অটোরিকশায় ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অবৈধ ও অনিরাপদ রিসাইক্লিং। এ ধরনের অনিরাপদ প্রক্রিয়ায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সীসা সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।’
এই সংকট মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, “পিওর আর্থ বাংলাদেশ পুরোনো বা ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির জন্য ‘সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব’ (EPR) নির্দেশিকা তৈরিতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি থ্রি-হুইলারের নিবন্ধন, ব্যাটারির ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা এবং বৈধ রিসাইক্লারদের উৎসাহিত করতে নির্দিষ্ট ‘স্মেল্টিং ফি’ প্রবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় পরিবেশগত নীতির কঠোর প্রয়োগ, জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত নিয়মিত নজরদারি এবং সর্বস্তরে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে এসব মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাটারি গলানো কারখানা অবিলম্বে ও কঠোরভাবে বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
সীসা কারখানার শ্রমিকদের কথাও ভাবা উচিত
অবৈধ সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি কারখানা বন্ধে সরকারের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন তরুণ পরিবেশকর্মী সোহানুর রহমান। তার মতে, সীসাদূষণ রোধে অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করা যেমন জরুরি, তেমনি সেখানকার শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত।
তিনি বলেন, “পরিবেশগত সুবিচার বা ‘এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যখন আমরা জানতে পারলাম যে দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ এই সীসাদূষণের মাধ্যমে চরম হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে, তখন উপলব্ধি করলাম— বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই সীসাদূষণ তথা পরিবেশ দূষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।”
সোহানুর রহমান আরও জানান, সীসাদূষণ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা তৈরি করতে ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের যৌথ অংশীদারত্বে দেশের ৬৪ জেলাতেই স্থানীয় যুব সংগঠনগুলোকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।