স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩৪ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪৯ বার
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের ‘গোলাম বানানোর’ চেষ্টা? ভারতীয় প্রশিক্ষণ ঘিরে উঠছে প্রশ্ন
ভারত সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি নিছক সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, নাকি এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভারতের প্রভাব বিস্তারের কোনো প্রচেষ্টা রয়েছে?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের আলোচিত টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের নামও। বিভিন্ন সময়ে তার উচ্চস্বরে সংবাদ উপস্থাপন ও স্টুডিও আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিয়ে সমালোচনামূলক লেখাতেও তার উপস্থাপনার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির তথ্য প্রচার করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। কর্মসূচিতে অর্থনীতি ও বাণিজ্যবিষয়ক সাংবাদিকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের কথা বলা হচ্ছে।
প্রশিক্ষণটি ভারত সরকারের ITEC কর্মসূচির আওতায় হলে এর ব্যয়ভার ভারতীয় পক্ষ বহন করার বিষয়টিও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রশিক্ষণটির উদ্দেশ্য যে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করা বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার জন্য লোক তৈরি করা—এমন অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন মন্তব্যকে অভিযোগ ও আশঙ্কা হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে অভিযোগ করেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
এর পর ভারতীয় হাই কমিশনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিষয়টি সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দুই ঘটনাকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করছেন। তবে এই সময়গত মিল থেকেই কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায় না।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আলোচনা সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবহারকারী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ওপর ভারতের প্রভাব বাড়ানো হতে পারে। আবার কেউ এটিকে সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নের একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ হিসেবেও দেখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘র-এর এজেন্ট তৈরি’, ‘দালালি শেখানো’ কিংবা ‘বাংলাদেশি সাংবাদিকদের গোলাম বানানোর’ মতো মন্তব্যও দেখা গেছে। তবে এসব মন্তব্যের কোনোটি প্রমাণিত তথ্য নয়; এগুলো মূলত ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত অভিযোগ ও আশঙ্কা।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সূচক। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) ২০২৬ সালের World Press Freedom Index-এ বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম এবং ভারত ১৫৭তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ ওই সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে পাঁচ ধাপ এগিয়ে।
তবে এই র্যাংকিং কোনো দেশের সাংবাদিকতা পুরোপুরি ভালো বা খারাপ—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না। এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত, সামাজিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সূচকের সমন্বিত মূল্যায়ন।
সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। কিন্তু যখন একটি দেশের সাংবাদিকরা অন্য দেশের সরকারি অর্থায়নে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তখন স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণের পাঠ্যসূচি, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই প্রশিক্ষণে কী শেখানো হবে, কারা অংশগ্রহণ করবেন, নির্বাচন কীভাবে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক শর্ত আছে কি না।
‘বাংলাদেশি সাংবাদিকদের গোলাম বানাতে চায় ভারত’—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো হলেও, এটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। তবে বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার নীতিমালা নিশ্চিত করার দাবি যে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে।