ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১০:০১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬৪ বার
বাংলাদেশে গত ১৬ মাসে মব সন্ত্রাসের নামে নানারকম অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বাড়িঘর, শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট। মাজারে আক্রমণ, বাউলদের ওপর হামলা, গণমাধ্যম অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, সংস্কৃতি কর্মকাণ্ডে বাধা ইত্যাদি। তবে মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ হচ্ছে, গণপিটুনি।
চুরি, ছিনতাই, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের অভিযোগে গণপিটুনিতে মৃত্যু বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে মব তৈরি করে ১৮২ জনকে হত্যা করা হয়, যার মধ্যে ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৭২ জন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, গত পৌনে আট বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৫৪৭ জন। এর মধ্যে ২০১৮ সালে নিহত হন ৩৯ জন, তাঁদের মধ্যে ঢাকায় নিহত হন ২১ জন।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৬৫ জনকে (ঢাকায় ২২ জন) গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। ২০২০ সালে নিহতের সংখ্যা কমে হয় ৩৫ জন, ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৮ জন, ২০২২ সালে বেড়ে হয় ৩৬ জন। ২০২৩ সালে নিহতের সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ৫১ জন, এর মধ্যে ঢাকাতেই ২৫ জন। ২০২৪ সালে তা আড়াই গুণ বেড়ে হয় ১২৮ জন।
আর চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) নিহত হন ১৮৪ জন। চলতি বছরের পরিসংখানে দেখা গেছে, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৭২ জন নিহত হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রামে ২৮, খুলনায় ১৭, বরিশালে ১৪, রাজশাহীতে ১৩, ময়মনসিংহ ১০, রংপুর ৭ এবং সিলেটে চারজন নিহত হন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পট পরিবর্তনের পর গণপিটুনিতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। আদালত প্রাঙ্গণে মারধরের শিকার হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে বিচারপতিও।
সেই ধারাবাহিকতায় গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে হত্যার ঘটনা ঘটছে। গণপিটুনিতে হত্যার তালিকায় প্রতিবন্ধী ও শিশুরাও রয়েছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিষ্ক্রিয়।
গণপিটুনির বর্বরতার শিকারদের মধ্যে যাদের নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন-
ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যা : ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস (২৭) নামে এক পোশাকশ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনো সত্যতা পায়নি পুলিশ। যে পোশাক কারখানায় দিপু কাজ করতেন সেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে হত্যার শিকার হতে পারেন বলে জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয়রা।
পরিবারের ভাষ্য, এটি হঠাৎ কোনো উত্তেজিত জনতার ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তৈরি করে দিপুকে হত্যা করা হয়েছে।
ভালুকা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণও আছে। ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি করার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে এখনো পর্যন্ত আমরা তদন্তে নিশ্চিত হতে পারিনি। জঘন্য এ অপরাধের সঙ্গে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত এ মামলার তদন্তের নতুন কোনো গ্রেপ্তারের খবর নেই। অনেকের আশঙ্কা, এনিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে বলেই এখন গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। কিছুদিনের মধ্যে আলোচনা থেমে গেলেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হবে। এ ধরনে শঙ্কার কারণ হলো, এ ঘটনার সঙ্গে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অতীতেও এ ধরনের গণপিটুনির ঘটনার বিচার হয়নি। আসামিরা ছাড়া পেয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাবির ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের শনাক্ত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তারা জামিনে মুক্ত হন। ১৫ মাস হয়ে গেলেও এ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়নি। এ ব্যপারে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশ জানায়, তদন্ত চলছে। কিন্তু হামলার সঙ্গে জড়িতদের এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় মেয়ের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে গিয়ে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রূপলাল (৪০) ও প্রদীপ (৩৫) নামে হরিদাস সম্প্রদায়ের দুই লোক।
রূপলালের পরিবার ও স্থানীয় মানুষ জানান, ১০ আগস্ট মিঠাপুকুর উপজেলার শ্যামপুর এলাকার এক তরুণের সঙ্গে রূপলালের বড় মেয়ে নূপুর রানীর বিয়ের দিন ঠিক করার কথা ছিল। এ জন্য গত ৯ আগস্ট মিঠাপুকুর থেকে নিজের ভ্যান চালিয়ে রূপলালের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তাঁর ভাগনির স্বামী প্রদীপ দাস। কিন্তু গ্রামের ভিতর দিয়ে রাস্তা না চেনায় প্রদীপ দাস সয়ার ইউনিয়নের কাজীরহাট এলাকায় এসে রূপলালকে ফোন করেন। রূপলাল সেখানে যান। তাঁরা দুজনে ভ্যানে চড়ে রূপলালের বাড়ি ঘনিরামপুর গ্রামের দিকে রওনা হন। রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জ-কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে ভ্যানচোর সন্দেহে তাঁদের দুজনকে থামান স্থানীয় কয়েকজন। এরপর সেখানে লোক জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে মব তৈরি করে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রূপলালের স্ত্রী হত্যা মামলা করেন এবং পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু আসামিরা এক সপ্তাহের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত এখনো চলছে।
ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙারি পণ্যের ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। হত্যার আগে ডেকে নিয়ে তাকে পিটিয়ে এবং ইটপাথরের টুকরা দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করা হয়। তার শরীরের ওপর উঠে লাফায় কেউ কেউ। এ ঘটনা সারা দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় গোটা দেশ। কিন্তু সোহাগ হত্যার আবেগ থিতিয়ে পড়লে মামলার তদন্ত থেমে যায়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রধান অভিযুক্ত এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও এখন তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। গত ২৩ নভেম্বর দিবাগত রাত ২টার দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের দেবীনগর গ্রামে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে শাহিন শিকদার নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এ সময় তার আরও তিন সহযোগীকে গণপিটুনি দিলে আহত হয়।
এ ঘটনায় মামলা হলেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযুক্তদের সবাই চেনে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান এলাকাবাসী। এরকম ঘটনা অনেক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গুজবের বিস্তার এবং আইনের প্রতি আস্থাহীনতা এ বর্বরতাকে উসকে দিচ্ছে। যখন একদল মানুষ একত্রিত হয়ে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করছে। এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সৌজন্যে, বাংলাদেশ প্রতিদিন