ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

কেন্দ্রে ‘নতুন’ তারেক রহমান

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১০:০৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫০ বার


কেন্দ্রে ‘নতুন’ তারেক রহমান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি এখন এক নতুন ভাবমূর্তিতে জনগণের সামনে আবির্ভূত হয়েছেন। গত দেড় দশকে তার বিরুদ্ধে চালানো সুপরিকল্পিত নেতিবাচক প্রচারণা ও অপপ্রচার কীভাবে ধুলিসাৎ হয়ে গেল, তা এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গবেষণার বিষয়।

তারেক রহমান আজ আর কেবল একটি দলের উত্তরসূরি নন; বরং তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের প্রতীক।

দীর্ঘদিনের অপপ্রচারকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে জয় করে তিনি যে নতুন ভাবমূর্তি নির্মাণ করেছেন, তা আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে উত্তরণ: কীভাবে ঘটল এই পরিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল প্রচার করে আসছিল, তারেক রহমান মানেই ‘দুর্নীতি’ বা ‘১০ শতাংশ কমিশন’। এমনকি ‘টাকা তোলে পল্টনে, ভাগ যায় লন্ডনে’—এমন চটকদার ও ভিত্তিহীন স্লোগান দিয়ে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে সময়ের ব্যবধানে এসব প্রচারণা মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

 

তারেক রহমান তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধৈর্যশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে এই নেতিবাচক ইমেজ কাটিয়ে উঠেছেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছেন এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিয়েছেন। তার বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রোশের চেয়ে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের অধিকারের বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ায় মানুষের মনে তার প্রতি আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংবর্ধনায় জনসমুদ্র: ইতিহাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত
দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর তাকে সংবর্ধনা জানাতে যে মানুষের ঢল নেমেছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল সমাগম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তার অবস্থান কতটা সুসংহত। বিশেষ করে ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফুট সড়ক) সংলগ্ন এলাকায় যে জনসমুদ্র তৈরি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ের অন্য যেকোনো রাজনৈতিক জমায়েতকে ছাপিয়ে গেছে। এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই জানান দেয়, তারেক রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা এখন পাহাড়সম।

 

দায়িত্বশীল রাজনীতির উদাহরণ
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়; বরং নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো রাজধানীর ৩০০ ফুট সড়ক এলাকায় সংবর্ধনা-পরবর্তী কার্যক্রম।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সময় সেখানে বেশ কিছু গাছ নষ্ট হয়েছিল এবং ময়লা-আবর্জনা জমেছিল। তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনায় নষ্ট হওয়া গাছ পুনরায় লাগানো হয়েছে এবং পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে এমন পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল আচরণ বিরল, যা সাধারণ মানুষের কাছে তার ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে।

 

দলীয় শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী প্রস্তুতি: প্রার্থী বদলের কঠোর বার্তা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমান অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এবার তিনি প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। দলের ভেতরে তিনি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, জনবিচ্ছিন্ন বা বিতর্কিত কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে ঘোষিত প্রার্থী বদল করে ক্লিন ইমেজের প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই কঠোর অবস্থানের ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন শৃঙ্খলা ফিরেছে, তেমনি জনগণের মধ্যেও বিএনপির প্রতি গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

শহিদুল ইসলামের মুক্তি ও বাকস্বাধীনতা
তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার শিক্ষক এ কে এম শহিদুল ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে বিএনপি। এই দাবির মধ্য দিয়ে দলটি যেমন তাদের নেতার সম্মানের প্রশ্নে অনড় অবস্থান প্রকাশ করেছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির তাগিদ দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি কৌশল।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অপপ্রচারের জবাব
তারেক রহমানের রাজনীতি ও তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলেও চলছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানকে নিয়ে কিছু কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, তিনি ‘ভারতের কাছে মুচলেকা দিয়ে দেশে এসেছেন’।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এ তথ্যকে ডাহা মিথ্যা ও স্রেফ অপপ্রচার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সূত্র বলছে, তারেক রহমান কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে নতি স্বীকার করেননি; বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি অবিচল। ভূ-রাজনৈতিক এই জটিল সমীকরণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথ অনুসরণ করছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ ১৭ বছর অনুপস্থিত থাকার পর দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছেন, যা কেবল দলীয় সমর্থকদের মধ্যেই নয়, গোটা রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাসনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে তিনি যখন ফিরলেন, তখন তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি প্রত্যাশার জায়গাটাও বিস্তৃত। তবে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে একটি শব্দ—‘নতুন ইমেজ’। প্রশ্ন হলো, এই ইমেজ তিনি কতটা ধরে রাখতে পারবেন এবং তা বাস্তব রাজনীতির শক্তিতে কতটা রূপ নিতে পারবে।

কারণ, এই ফেরা কেবল রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়; এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ১৭ বছর আগের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখনকার রাজনীতি, দল পরিচালনার ধরন, নেতৃত্বের চরিত্র ও জনমানস সবকিছুই অনেকটাই বদলে গেছে। এখন রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, মাঠের সংগঠনের ভিত, নির্বাচনী কৌশল—সব মিলিয়ে নেতৃত্বকে আরও সতর্ক, কৌশলী ও ধৈর্যশীল হতে হয়। এই নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই তারেক রহমানকে নিজের ভূমিকা প্রমাণ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, তারেক রহমান এমন এক সময়ে দেশে ফিরেছেন, যখন দলের ভেতরে ঐক্য বজায় রাখা, প্রার্থী বাছাইয়ের সংবেদনশীলতা সামাল দেওয়া এবং নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ চাপ নিয়ন্ত্রণ করা নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন তার ইমেজ। দীর্ঘদিন দূরে থেকেও তিনি এমনভাবে ফিরে এসেছেন যে, তার প্রতি নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তিনি কোনো ক্ষমতার জাঁকজমক বা সম্পদ নিয়ে ফেরেননি; বরং ‘শূন্য হাতে’ ফিরে এসে নেতৃত্বের দাবি করেছেন, যা মানুষের মনোজগতে একটি প্রতীকী বার্তা তৈরি করেছে। জনগণের একটি অংশ এখন দেখতে চায়, তিনি কী ধরনের রাজনীতি করতে চান, তিনি সত্যিই কি দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, নাকি আগের বিতর্কগুলো আবার তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের নেতারা বিষয়টিকে দল পুনরুজ্জীবনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ হয়েছে এবং নেতৃত্ব এখন আরও দৃশ্যমান হয়েছে। অনেকেই বলছেন, তারেক রহমানের ফিরে আসা শুধু প্রতীকী ঘটনা নয়; বরং সংগঠনকে নতুন করে সাজানোর সূচনা।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা মনে করছেন, সামনে নির্বাচনকে ঘিরে তারেক রহমানের উপস্থিতি কর্মীদের মনোবল বাড়াবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আনবে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে। তবে তারা এটাও স্বীকার করছেন, দায়িত্ব এখন বেশি, প্রত্যাশাও বেশি; ফলে নেতৃত্বকে আরও পরিণত, ধৈর্যশীল ও বাস্তবমুখী হতে হবে।

দলটির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, ‘তিনি এখন দলের জন্য নতুন এনার্জি। তবে সামনে আমরা বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছি। সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’


   আরও সংবাদ