ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

মানবিক সমাজ বিনির্মাণে আদর্শ ও কর্মপন্থা

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১ জানুয়ারী, ২০২৬ ১৬:৫৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬১ বার


মানবিক সমাজ বিনির্মাণে আদর্শ ও কর্মপন্থা

গবেষক ও বিশ্লেষক: কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী

 

ভূমিকা: সমাজ ও মানবিকতার নবদিগন্ত- মানুষ সামাজিক জীব। আদিম অরণ্যচারী জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যখন গোত্রবদ্ধ হতে শুরু করল, তখন থেকেই সমাজের উদ্ভব। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, সমাজ কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ মানুষের সমষ্টি নয়; বরং সমাজ হলো আদর্শ, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের এক সুসংহত ও জটিল বুনন। একটি আদর্শ সমাজ তখনই গঠিত হয় যখন তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় মানবিকতার ওপর। মানবিকতা হলো সেই অমোঘ শক্তি যা মানুষকে অন্যের দুঃখে ব্যথিত হতে শেখায়, অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়ার প্রেরণা দেয়। ইসলামি দর্শনে এই মানবিকতা কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি খোদাপ্রাপ্তির অন্যতম সোপান। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে। বর্তমানের ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীতে যেখানে নৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ আর স্বার্থপরতার দেয়াল আকাশচুম্বী, সেখানে শায়খ সাঈদ আনোয়ার মোবারকী (মা.জি.আ.) এক আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর দর্শন কেবল পুথিগত বিদ্যা নয়, বরং তাঁর জীবন ও সাধনার নির্যাস। তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, ধর্ম আর মানবিকতা আলাদা কোনো সত্তা নয়; বরং একটিকে বাদ দিলে অন্যটি অপূর্ণ। দর্শনের ভিত্তি: শরিয়াহর ইনসাফ ও সুফিপথের এহসান- শায়খ মোবারকীর সমাজ বিনির্মাণের এই সুদীর্ঘ পথচলা বুঝতে হলে তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীরতা বোঝা আবশ্যক। তাঁর এই রূপরেখা দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: এক. ইসলামি শরিয়াহর ইনসাফ (ন্যায়বিচার) এবং দুই. সুফিপথের এহসান (সৃষ্টির সেবা)। ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে প্রতিটি মানুষের অধিকার বা ‘হক্কুল ইবাদ’ নিশ্চিত করা ফরজ। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনের জন্য সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিলোপ অপরিহার্য। অন্যদিকে, তাসাউফ আমাদের শেখায় 'তাজকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি। শায়খ মোবারকী মনে করেন, সমাজের পরিবর্তন তখনই সম্ভব যখন ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটবে। মানুষের অন্তরে যদি আল্লাহর ভয় এবং সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা না থাকে, তবে কোনো আইন দিয়ে সমাজকে সুস্থ রাখা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, অতীতের স্মৃতি কেবল জাদুঘরে সাজিয়ে রাখার বস্তু নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের জঞ্জাল পরিষ্কার করাই হলো প্রকৃত সাধনা। শক্তিশালী সমাজ গঠনের চল্লিশটি স্তম্ভ: শায়খ মোবারকীর মানবিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের আলোকে: ১. নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়ন: একটি ইমারত যেমন তার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সমাজও তেমনি তার সদস্যদের নৈতিকতার ওপর টিকে থাকে। শায়খ মোবারকীর প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ হলো মানুষের অন্তরে খোদাভীতি বা তাকওয়া সৃষ্টি করা। যখন কোনো ব্যক্তি উপলব্ধি করে যে তার প্রতিটি কাজ পরকালে জবাবদিহি করতে হবে, তখন সে একা থাকলেও কোনো অপরাধে লিপ্ত হয় না। এই আত্মিক জাগরণই হলো সমাজ সংস্কারের প্রথম ধাপ। ২. আইনের সমান অধিকার: বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি সমাজকে ক্যানসারের মতো ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে। শায়খ জোর দিয়ে বলেন, আইন হতে হবে সবার জন্য সমান। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা নির্বিশেষে যদি সবাই ন্যায়বিচার পায়, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা কমে আসে। ইসলামের ইতিহাসে খলিফাদের শাসনকাল আমাদের এই সাম্যের শিক্ষা দেয়, যা শায়খ তাঁর দর্শনে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ৩. মাদক নির্মূল অভিযান: মাদক কেবল একটি জীবন নয়, একটি পরিবার ও একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। শায়খ মোবারকীর মতে, মাদক নির্মূলে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়; বরং যুবকদের জন্য সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তাদের অন্তরে জীবন সম্পর্কে উচ্চতর লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে হবে যাতে তারা মরণনেশার পথে পা না বাড়ায়। ৪. এতিমের অভিভাবকত্ব: সমাজে সবচেয়ে অসহায় হলো পিতৃহীন শিশু বা এতিম। শায়খ এই বিষয়টিকে কেবল দয়া হিসেবে দেখেন না, বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। এতিমদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের স্থায়ী সমাধান করার মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা তাঁর দর্শনের অন্যতম প্রয়োগিক দিক। তিনি বিশ্বাস করেন, এতিমের মুখে হাসি ফোটানো মানেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ করা। ৫. নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা: নারী সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শায়খের দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি পর্দার পাশাপাশি নারীর প্রকৃত অধিকার—শিক্ষা, উত্তরাধিকার এবং সম্মানের কথা বলেন। তাঁর মতে, যে সমাজে নারী নিরাপদ নয়, সে সমাজ কখনো আল্লাহর রহমত পেতে পারে না। ৬. শিক্ষার প্রচার ও প্রসার: অজ্ঞতা হলো সকল পাপের মূল। শায়খ মোবারকী নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সমন্বয়ে এক দক্ষ জনশক্তি গড়ার আহ্বান জানান। জ্ঞানচর্চাই পারে সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অন্ধকার দূর করতে। ৭. আদর্শিক ঐক্য: বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ ও বাঙালি সমাজ ছোট ছোট মতভেদ নিয়ে শতভাগে বিভক্ত। শায়খ এই অপ্রয়োজনীয় কাদা-ছোড়াছুড়ি ও বিভাজন দূর করে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন। তাঁর দর্শনে 'আদর্শিক ঐক্য' মানে হলো—মৌলিক মানবিক ও ধর্মীয় বিষয়ে সবাই একমত হয়ে সমাজ গঠনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা। ৮. প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা: আধুনিক নগরায়ণের যুগে আমরা পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবরও রাখি না। শায়খ মোবারকী প্রতিবেশীর অধিকারের ওপর অত্যন্ত জোর দেন। হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সেই ব্যক্তি মুমিন নয় যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। প্রতিবেশীর সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোই হলো সামাজিক সম্প্রীতির মূল মন্ত্র। ৯. শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতকরণ: একটি দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান শ্রমিকরা। শায়খ শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে ইসলামী শ্রমনীতির বাস্তবায়নের কথা বলেন। ‘‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করো’’—এই হাদিসকে তিনি আধুনিক অর্থনীতির মূল নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা কেবল দয়া নয়, এটি তার আইনগত ও ধর্মীয় অধিকার। ১০. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন: ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও অপশাসন একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। শায়খ মোবারকীর দর্শনে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার জন্য প্রথমত সৎ নেতৃত্ব এবং দ্বিতীয়ত কঠোর জবাবদিহিতা প্রয়োজন। যখন আমলারা জনগণের সেবককে নিজেদের প্রভু মনে না করে খাদেম মনে করবেন, তখনই প্রকৃত সমৃদ্ধি আসবে। ১১. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: বাংলাদেশ ও ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্য হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। শায়খ মোবারকী বিশ্বাস করেন, ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি উদারতা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি নববী আদর্শ। পবিত্র কুরআনের বাণী—'তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমার জন্য আমার দ্বীন'—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তিনি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের আহ্বান জানান, যেখানে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সবাই সম্মানের সাথে বসবাস করবে। ১২. দরিদ্র বিমোচন ও সম্পদের সুষম বণ্টন: পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সম্পদ কেবল কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত থাকে। শায়খ মোবারকীর দর্শনে দরিদ্র বিমোচনের প্রধান হাতিয়ার হলো জাকাত ও সদকা। তিনি মনে করেন, জাকাত কোনো দান নয়, বরং এটি দরিদ্রের পাওনা। পরিকল্পিতভাবে জাকাত সংগ্রহের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব। ১৩. চিকিৎসাসেবা সহজীকরণ: মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। বর্তমান যুগে চিকিৎসাসেবা যখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, শায়খ তখন চিকিৎসাকে একটি মানবিক অধিকারে রূপান্তরের তাগিদ দেন। তাঁর দর্শনে—মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সুচিকিৎসা প্রতিটি নাগরিকের দোড়গোড়ায় সুলভে পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিত্তবানদেরও ঈমানি দায়িত্ব। ১৪. তরুণদের কর্মসংস্থান: তরুণ প্রজন্ম একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্তু বেকারত্ব তাদের হতাশায় নিমজ্জিত করে। শায়খ মোবারকী দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি যুবকদের কারিগরি শিক্ষা ও উদ্যোক্তা হওয়ার প্রেরণা দেন, যাতে তারা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। যুবসমাজের শ্রম ও মেধাকে গঠনমূলক কাজে লাগানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। ১৫. পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রকৃতি প্রেম: ইসলামি ও সুফি দর্শনের একটি গভীর দিক হলো প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা। শায়খ মোবারকী বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াব হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর মতে, মহান আল্লাহর সৃষ্ট এই সুন্দর পৃথিবীকে দূষণমুক্ত রাখা এবং বনভূমি রক্ষা করা ইবাদতের অংশ; কারণ প্রকৃতি বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে। ১৬. গুজব প্রতিরোধ ও সত্যনিষ্ঠা: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গুজব ছড়িয়ে সমাজে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা অস্থিরতা তৈরি করা একটি ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শায়খ পবিত্র কুরআনের সূরা হুজুরাতের আলোকে শিক্ষা দেন যে—যাচাই না করে কোনো তথ্য বিশ্বাস বা প্রচার করা পাপ। সত্যনিষ্ঠা এবং তথ্যের সঠিকতা যাচাই করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি বজায় রাখা তাঁর ৪০ দফার অন্যতম শর্ত। ১৭. বাল্যবিবাহ ও যৌতুক রোধ: সামাজিক কুসংস্কার যেমন বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথা একটি সুন্দর সমাজ গঠনে প্রধান বাধা। শায়খ মোবারকী তাঁর বয়ান ও কর্মতৎপরতায় এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি মনে করেন, কন্যা সন্তান আল্লাহর রহমত, অভিশাপ নয়; তাই যৌতুক নামক সামাজিক ব্যাধিটি নির্মূল করতে হলে পুরুষদের মাঝে নৈতিক জাগরণ সৃষ্টি অপরিহার্য। ১৮. পশুপাখির প্রতি মায়া ও মমতা: সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ছাড়া স্রষ্টাকে পাওয়া অসম্ভব—এই সুফি দর্শনটি শায়খের জীবনে প্রবল। তিনি আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি প্রাণীর প্রতি মমতা প্রদর্শনের শিক্ষা দেন এবং পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা বর্জন করে তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াকে আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ মনে করেন। ১৯. মিতব্যয়িতা ও অপচয় রোধ: অপচয়কারী শয়তানের ভাই—এই চিরন্তন সত্যটি শায়খ আধুনিক অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করেন। অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক ও অপচয় রোধ করে সেই অর্থ দিয়ে মানুষের কল্যাণ সাধনের শিক্ষা দেন তিনি; তাঁর মতে, মিতব্যয়ী জীবনযাপন মানুষকে লোভ থেকে মুক্তি দেয় এবং সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখে। ২০. পারিবারিক আদর্শ ও সামাজিক মূল্যবোধ: পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট। পরিবারে যদি বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহের অভাব থাকে, তবে সেই সমাজে শৃঙ্খলা থাকবে না। শায়খ মোবারকী পারিবারিক সুসম্পর্ক রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি মনে করেন, মা-বাবার সেবার মাধ্যমেই জান্নাতের পথ সুগম হয় এবং এই আদর্শই সমাজকে সংহতি দান করে। সামাজিক রূপান্তর ও শায়খের কর্মপন্থা: শায়খ সাঈদ আনোয়ার মোবারকী (মা.জি.আ.)-এর এই দর্শনের মূল বিশেষত্ব হলো এর বাস্তবমুখী প্রয়োগ। তিনি কেবল মসজিদে বসে উপদেশ দেন না, বরং তিনি রাজপথে এসে আর্তমানবতার সেবা করেন। যখন দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তখন তাঁর ত্রাণ কার্যক্রম হয়ে ওঠে অনন্য উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন শায়খ বা আলেম কেবল আধ্যাত্মিক গুরু নন, বরং তিনি সমাজের একজন অভিভাবকও বটে। ২১. রক্তদান কর্মসূচি: রক্তের কোনো ধর্ম নেই, নেই কোনো সীমানা। শায়খ মোবারকী মানুষের জীবন বাঁচাতে রক্তদানকে একটি মহৎ মানবিক কাজ হিসেবে প্রচার করেন। তাঁর অনুসারীদের মাঝে তিনি এই চেতনা জাগিয়ে তুলেছেন যে, একজনের রক্তে আরেকজনের জীবন রক্ষা পাওয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ। ২২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা: পানির অপর নাম জীবন—কিন্তু দূষিত পানি অনেক সময় মরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সুপেয় পানির কল বা টিউবওয়েল স্থাপন করাকে শায়খ অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর দর্শনে মানুষের তৃষ্ণা মেটানো ইবাদতের সমতুল্য। ২৩. কারাবন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসন: অপরাধীকে ঘৃণা নয়, বরং অপরাধকে ঘৃণা করার সুফি দর্শন শায়খ ধারণ করেন। কারাগারে যারা আছেন, তাদের নৈতিক পরিবর্তন ও মুক্ত হওয়ার পর সুস্থ জীবনে ফিরে আসার জন্য পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া তাঁর মানবিক দর্শনের একটি ব্যতিক্রমী দিক। ২৪. মানবিক ত্রাণ কার্যক্রম: বন্যা, খরা বা শীতে মানুষের হাহাকার শায়খকে ব্যথিত করে। তিনি সাহসিকতার সাথে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ নিয়ে ছুটে যান। তাঁর এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, মানবসেবাই হলো ধর্ম পালনের প্রকৃত মাঠ। ২৫. পাঠাগার স্থাপন ও জ্ঞানচর্চা: বইপড়া ও গবেষণার মাধ্যমে একটি উন্নত জাতি গঠন সম্ভব। শায়খ মোবারকী মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার স্থাপনের গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, একটি পাঠাগার হাজারো মদের আড্ডার চেয়ে শক্তিশালী। ২৬. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সুস্থ বিনোদন: সংস্কৃতিহীন মানুষ পশুর সমান। তবে শায়খ অশ্লীলতা বর্জন করে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান জানান। ইসলামি ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতিই পারে যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে। ২৭. মেধাবীদের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: দরিদ্রতার কারণে যেন কোনো মেধা ঝরে না যায়, সেদিকে শায়খ সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং তাদের সাহস জোগানোর মাধ্যমে তিনি একটি শিক্ষিত ও দক্ষ সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। ২৮. গৃহহীনদের পুনর্বাসন: মাথার ওপর ছাদ না থাকা মানুষের কষ্ট অবর্ণনীয়। শায়খ মোবারকী ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উদ্যোগে আশ্রয়হীনদের জন্য স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করাকে বড় ইবাদত মনে করেন। ২৯. পরমতসহিষ্ণুতা ও সমালোচনার উদারতা: একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজে ভিন্নমতের শ্রদ্ধা থাকা আবশ্যক। শায়খ মোবারকী ভিন্নমত বা সমালোচনার প্রতি সহনশীল হওয়ার শিক্ষা দেন। তাঁর মতে, পরমতসহিষ্ণুতা সামাজিক কলহ দূর করে ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি করে। ৩০. আত্মনির্ভরশীলতা ও ভিক্ষাবৃত্তি পরিহার: হাত পাতা ইসলামে অপছন্দনীয়। শায়খ যুবকদের ও অভাবী মানুষকে ক্ষুদ্র ঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র পুঁজি ও কারিগরি শিক্ষা দিয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বনির্ভর সমাজই পারে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। ৩১. খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা: খাদ্যে ভেজাল মেশানো কেবল অপরাধ নয়, এটি একটি নীরব গণহত্যা। শায়খ মোবারকী তাঁর দর্শনে ঘোষণা করেন যে, যে জাতি নিজের খাবারকে বিষমুক্ত রাখতে পারে না, সে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তিনি ব্যবসায়ীদের মাঝে আমানতদারিতা ও পরকালীন জবাবদিহিতার চেতনা জাগ্রত করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, হালাল এবং বিশুদ্ধ খাদ্য গ্রহণ ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত। ৩২. সুদমুক্ত সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক মুক্তি: সুদ হলো শোষণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, যা গরিবকে আরও গরিব আর ধনীকে আরও ধনী করে। শায়খ মোবারকী ইসলামের সুদমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষপাতি। তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোর স্বপ্ন দেখেন যেখানে মানুষ ঋণের জালে আবদ্ধ হবে না, বরং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমৃদ্ধি অর্জন করবে। ৩৩. সামাজিক শালীনতা ও মার্জিত জীবনাচার: আচরণ, ভাষা এবং পোশাকে শালীনতা বজায় রাখা একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। শায়খ মোবারকী বিশ্বাস করেন, অশ্লীলতা কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে চারিত্রিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। তিনি যুবসমাজকে ভদ্রতা, নম্রতা এবং মার্জিত রুচিবোধের দীক্ষা দেন, যা আধুনিক প্রজন্মের চারিত্রিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। ৩৪. প্রযুক্তির সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার: প্রযুক্তি একটি দ্বিমুখী তলোয়ার। এর সঠিক ব্যবহার যেমন উন্নয়ন ঘটায়, অপব্যবহার তেমনি ধ্বংস আনে। শায়খ মোবারকী প্রযুক্তিকে শিক্ষা, দ্বীন প্রচার এবং মানবকল্যাণে ব্যবহারের তাগিদ দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণা বা পাপাচার না ছড়িয়ে একে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করাই তাঁর দর্শনের অন্যতম দিক। ৩৫. প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা: দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। শায়খ মোবারকী এই 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা'দের সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে সোচ্চার। তাঁর মতে, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক মূল্যায়ন এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। ৩৬. যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব নির্বাচন: একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হয় তার নেতৃত্বের মাধ্যমে। শায়খ মোবারকী ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সততা, যোগ্যতা এবং খোদাভীতির ভিত্তিতে নেতৃত্ব বাছাইয়ের পরামর্শ দেন। তাঁর দর্শনে—নেতৃত্ব কোনো ভোগের বস্তু নয়, বরং এটি একটি মহান আমানত এবং বিশাল দায়িত্ব। ৩৭. ঋণমুক্তির সহায়তা ও সামাজিক সংহতি: ঋণে জর্জরিত মানুষ সমাজে সবচেয়ে বেশি মানসিক যন্ত্রণায় থাকে। শায়খ মোবারকী গোপনে এবং প্রকাশ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেন। তিনি মনে করেন, সমাজ যদি একে অপরের ঋণের বোঝা লাঘবে এগিয়ে আসে, তবে সেখানে আত্মহত্যার মতো চরম ঘটনাগুলো আর ঘটবে না। ৩৮. পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও নাগরিক সচেতনতা: পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ—এই কালজয়ী আদর্শকে শায়খ মোবারকী ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজ জীবনে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি কেবল নিজ ঘর নয়, বরং রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চারপাশ পরিষ্কার রাখার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলেন। তাঁর দর্শনে পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষা করা আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। ৩৯. কৃতজ্ঞতাবোধ ও ভালোবাসার বন্ধন: মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া যায় না। শায়খ মোবারকী সমাজে একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস গড়ার ওপর জোর দেন। একটি ছোট উপকারের স্বীকৃতিও সমাজে ভালোবাসার প্রবাহ তৈরি করে, যা হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করতে সাহায্য করে। ৪০. পরকালীন জবাবদিহিতা: সকল কর্মের কেন্দ্রবিন্দু: শায়খ মোবারকীর ৪০টি স্তম্ভের শেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো—এই বিশ্বাস যে, প্রতিটি ক্ষুদ্র কাজের জন্য একদিন মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এই একটি চেতনা যদি মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়, তবে সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায়, জুলুম এবং হাহাকার চিরতরে বিদায় নেবে। শায়খ সাঈদ আনোয়ার মোবারকী (মা.জি.আ.): আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর- শায়খ মোবারকী শুধুমাত্র আদর্শের প্রচারক নন, তিনি একজন নিরলস কর্মী। অসহায় মানুষের জন্য স্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ, এতিমের অভিভাবকত্ব গ্রহণ এবং মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান প্রমাণ করে যে—তিনি সমাজ সংস্কারকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর জীবনদর্শন হলো স্মৃতি ও সাধনার এক জীবন্ত পাণ্ডুলিপি, যেখানে প্রতিটি মানুষের আর্তনাদ শোনা যায় এবং সেই আর্তনাদকে সেবার মাধ্যমে প্রশান্তিতে রূপান্তর করা হয়। উপসংহার- পরিশেষে বলা যায়—মানবিকতা ও ইসলাম একটি অবিচ্ছেদ্য স্রোতধারা। শায়খ সাঈদ আনোয়ার মোবারকী (মা.জি.আ.)-এর প্রস্তাবিত এই চল্লিশটি নীতি যদি আমরা ব্যক্তি ও সমষ্টিগতভাবে গ্রহণ ও অনুশীলন করতে পারি, তবে আমাদের সমাজ হয়ে উঠবে কল্যাণ, ন্যায়, মমতা ও শান্তির বাস্তব প্রতিচ্ছবি—একখণ্ড জান্নাতের মতো। শায়খ মোবারকীর এই মানবিক বিপ্লব প্রতিটি হৃদয়ে পৌঁছে যাক—এটিই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।


   আরও সংবাদ