ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪১ বার
বিশ্ব রাজনীতিতে কিছু ঘটনা এমন হয়, যা কেবল একটি দেশের ইতিহাস নয়, পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দেয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সামরিক অভিযানে আটক করা এবং তাকে নিউইয়র্কের আদালতে হাজির করার ঘোষণা সেই ধরনের ঘটনা। এটি সরাসরি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর অন্য দেশের আগ্রাসন, যা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এবং নৈতিক রাজনীতি—সবকিছুকে চ্যালেঞ্জ করছে।
যে দেশ গণতন্ত্রের মুখোশ পরে নিজেকে বিশ্বের রক্ষক দাবি করে, সেই আমেরিকাই আজ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে উপহাস করেছে।
রাতের অন্ধকারে মাদুরোকে তুলে নেয়া, তার পরিবারের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি এবং দেশটিকে সাময়িকভাবে ‘পরিচালনা করার’ ঘোষণা সবই চরম অন্যায় এবং নিন্দনীয়। এই ঘটনা বিশ্বের অন্য আধিপত্যবাদী শক্তির জন্য সুস্পষ্ট উসকানি। আমেরিকার এই নিকৃষ্ট কাজের কারণে আরও কেউ কেউ উৎসাহিত বোধ করতে পারে।
সার্বভৌমত্বের প্রতি অমর্যাদা
মাদুরোকে আটক করে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া মানে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপ্রধানকে নয়—একটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামো, সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ভেঙে দেওয়া।
জাতিসংঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা এই পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দেয়নি। এটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—শক্তিশালী রাষ্ট্র চাইলে আইন ও নৈতিকতা সবকিছুকে উপেক্ষা করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যায়
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি সরাসরি অন্যায়।
শক্তি প্রয়োগ করে অন্য দেশের সরকার বদলানো কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায় না। শান্তি, সংলাপ, কূটনীতির কথা বলে এ ধরনের আগ্রাসন চালানো—এটি আন্তর্জাতিক নীতির বিরোধী।
মাদুরো পরিবার ও দেশীয় অস্থিতিশীলতা
মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আলাদা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পরিবারের নিরাপত্তা অনিশ্চিত। রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
দেশের প্রশাসন বর্তমানে বিভ্রান্ত। সেনাবাহিনী কার নির্দেশ মানবে, প্রশাসন কার হাতে যাবে, সব প্রশ্ন ঝুলে আছে। রাজনৈতিক শূন্যতার এই পরিস্থিতি দেশে সন্ত্রাস, অপরাধ ও মাদক ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এরইমধ্যে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ আসছে, ভেনেজুয়েলায় মাদকের ঘন প্রবাহ, অপরাধ ও সন্ত্রাসমূলক কার্যক্রম বেড়ে গেছে। ছোট ও দুর্বল দেশগুলোর ওপর এই ধরনের চাপ, আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের সঙ্গে মিলিয়ে, জনগণের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ভয়ংকরভাবে দুর্বল করে।
মাদক ও সন্ত্রাসের আন্তর্জাতিক প্রভাব
ভেনেজুয়েলার মধ্যমাত্রিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত অপরাধীদের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন অংশে মাদক সরবরাহ হয়। এখনকার রাজনৈতিক অস্থিরতা এই প্রবাহকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। মার্কিন আগ্রাসন, মাদুরোকে আটক করা, দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোকে ভাঙার মাধ্যমে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জাতিসংঘের অক্ষমতা: আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার চরম পরীক্ষা
ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক আগ্রাসনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘ কোথায় ছিল? বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। জাতিসংঘ চার্টারে স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো দেশ অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলে নিরাপত্তা পরিষদ হস্তক্ষেপ করবে, প্রয়োজনে শান্তি রক্ষা অভিযান পরিচালনা করবে বা রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করবে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা গেল জাতিসংঘ চুপ। নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক হতে পারতো, কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেত। কিন্তু কিছুই হয়নি। অবশ্য, বৈঠক হলেও খুব বেশি কিছু করা হয়তো যেত না, কারণ আমেরিকার মতো শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতা নেই এই সংস্থার। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো শক্তি রয়েছে তাদের। এই ভেটো ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক আইন বা নৈতিকতার ওপর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
মূলত জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তায় এক ধরনের স্পষ্ট বার্তা গেছে—যদি বড় শক্তিধর দেশ কিছু করে, ক্ষুদ্র বা মধ্যম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে নিরাপদ নয়। সংস্থার সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সমর শক্তির কারণে পরাশক্তি বা বড় শক্তির দেশগুলোর যা খুশি তাই করার অধিকার আছে। আন্তর্জাতিক আইন যখন বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারছে না, তখন প্রশ্ন ওঠে—জাতিসংঘ কি কার্যকর সংস্থা নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সুবিধার জন্য একটি কাগজের ঘর?
ভেনেজুয়েলার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বৃহৎ শক্তির আগ্রাসন এবং জাতিসংঘের অক্ষমতা একসাথে মিলিয়ে বিশ্বে নৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা ভঙ্গুর। এ ঘটনার পর স্পষ্ট হয়, যদি আন্তর্জাতিক সংস্থা শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে, তখন তার মূল লক্ষ্য—শান্তি রক্ষা ও সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা
ভেনেজুয়েলার শক্তি হিসেবে চীন ও রাশিয়া অতীত থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। চীন দেশটির বড় ঋণদাতা এবং তেল ও অবকাঠামো প্রকল্পে নিযুক্ত। রাশিয়া সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সহায়তায় সক্রিয়। মাদুরো আটক হওয়ার পর এই দুটি দেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা নিতে পারে।
তাদের মূল লক্ষ্য হতে পারে—
• আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষা ও সার্বভৌমত্বের মূল্যবোধের পুনঃপ্রকাশ
• দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
• মাদক ও সন্ত্রাসের প্রসার রোধে কৌশলগত সহায়তা
চীন ও রাশিয়া ইতিবাচক কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামের মাধ্যমে, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের প্রতি সংহতি প্রদর্শন করতে পারে। তবে তাদের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা
ইরানও ভেনেজুয়েলার মিত্র। বিশেষ করে ২০২০ সালে তেল সরবরাহের মাধ্যমে ইরানকে ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী মিত্র হিসেবে দেখা গেছে। মাদুরো আটক হওয়ার পর ইরান শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিয়ে দেশটিকে টেকসই করতে পারে। বিশেষ করে তেল, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও সতর্কবার্তা
মাদুরো এখন আমেরিকার উচ্চ নিরাপত্তা কেন্দ্রের নজরদারিতে। তার সামনে প্রধান ঝুঁকি হলো দীর্ঘ রাজনৈতিক বন্দিত্ব, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা হতে পারে। এ ছাড়া, আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে, পরিবার ও মিত্রদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক শূন্যতা ও দেশের প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা মাদুরোর ওপর চাপ বাড়াবে। তৃতীয় ঝুঁকি হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মাদক-সন্ত্রাস পরিস্থিতির জটিলতা, যা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থান আরx দুর্বল করবে। ফলে তার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের অধীনে।
যে পথই বেছে নেয়া হোক, এটি স্পষ্ট মাদুরোর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আইনের অধীনে নয় বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
বিশ্বব্যবস্থায় বার্তা
এই ঘটনার মাধ্যমে প্রতিটি দেশের সামনে সতর্কবার্তা স্থির হলো— শক্তিধর রাষ্ট্র চাইলে আইন, নৈতিকতা, সার্বভৌমত্ব সবই উপেক্ষা করতে পারে। গণতন্ত্র বন্দুকের নলের নিচে আসে, সার্বভৌমত্ব শক্তির কাছে হেরে যায়।
বিশ্বে দু’ধরনের আইন আছে—একটি শক্তিধরদের জন্য, অন্যটি দুর্বলদের জন্য। মাদুরোর আটকের ঘটনা আমাদের সতর্ক করে দিয়েছে, ছোট দেশগুলোর ওপর শক্তির প্রয়োগ যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা, কূটনীতি ও নৈতিক রাজনীতি সবই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
চীন, রাশিয়া ও ইরান যদি ইতিবাচকভাবে উদ্যোগ নেয় তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য শক্তিশালী বার্তা দিতে পারে। তা না হলে, আজ ভেনেজুয়েলা আক্রান্ত, কাল অন্য কেউ হবে। সেক্ষেত্রে প্রশ্নটি স্থির—এই দুনিয়ায় তাহলে কে নিরাপদ?