ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বাতিল হয়েছে ৭২৩ প্রার্থীর মনোনয়ন

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৬ জানুয়ারী, ২০২৬ ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪৬ বার


বাতিল হয়েছে ৭২৩ প্রার্থীর মনোনয়ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরাট সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এক্ষেত্রে একডজন কারণকে প্রার্থিতা বাতিলের পেছনে দায়ী করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গত ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এতে ৩ হাজার ৪০৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।

তাদের মধ্যে জমা দেন ২ হাজার ৫৬৮ জন। এদের মধ্যে বাছাইয়ে বৈধ হয়েছেন ১ হাজার ৮৪২ জন। ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় তার তিনটি মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের জন্য বিবেচনায় রাখা হয়নি।

 

ইসি সূত্রে জানা গেছে, বাতিল ৭২৩টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ৩৫০ জনের মতো। বাকিগুলো ৫১টি নিবন্ধিত দলের। আবার দলগুলোর মধ্যে বিএনপির ২৭, জামায়াতে ইসলামীর ৯, জাতীয় পার্টির ৫৭ ও ইসলামী আন্দোলনের ৪১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপির বাতিল হওয়া ২৭ জনের মধ্যে বেশিরভাগই দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলীয় প্রার্থী হওয়ার প্রত্যয়ন ছিল না।

বিএনপির পরিচয়ে ৩৩১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

 

জামায়াতে ইসলামীর নয়জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। দলটি থেকে ২৭৬ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪১ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। বৈধতা পেয়েছেন ২২৭ জন।

দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে জাতীয় পার্টির। দলটির ২২৪ জনের মধ্যে ৫৭ জন বাদ পড়েছেন। বৈধতা পেয়েছেন ১৬৭ জন প্রার্থী।

 

কেন বিরাট সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলো

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা বাছাইয়ের সময় আইনে নির্ধারিত নিয়মকানুন মানার বিষয়ে কোনো ঘাটতি আছে কিনা, মূলত সেটাই দেখেন। এক্ষেত্রে এক ডজনের মতো কারণ উঠে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর না করা, ঋণখেলাপি হওয়া, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করা, আয়কর বিবরণী না দেওয়া, মনোনয়নপত্র পূরণে অসম্পূর্ণতা রাখা, দ্বৈত নাগরিকত্ব, মামলা সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ না করা, তথ্য গোপন করা, জামানতকারী হিসেবে ঋণখেলাপি হওয়া, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের তিন বছর অতিবাহিত না হওয়া, দলের প্রত্যয়ন না দেওয়া ও ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর না থাকায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে (স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রযোজ্য বিধান)।

তফসিলের পর মনোনয়নপত্র পূরণে ইসির কী নির্দেশনা ছিল

নির্বাচন কমিশন বলছে, তফসিলের পরপরই কীভাবে মনোনয়নপত্র পূরণ করতে হবে, তার সব নির্দেশনা বিভিন্ন পরিপত্র জারি করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ছোটখাটো ভুলের জন্য যেন কারও প্রার্থিতা বাতিল না করা হয়, সে নির্দেশনাও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে। এরপরও রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের সুযোগ রাখা আছে আইনে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, যে কোনো ব্যক্তি রিটার্নিং কর্মকর্তার যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। কমিশন শুনানি করে রায় দেবে। এরপরও কেউ সন্তুষ্ট না হলে সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠিত হাইকোর্টে পৃথক বেঞ্চ গঠন করা আছে। সেখানে যেতে পারবেন।

মনোনয়নপত্র পূরণে কী আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক

নির্বাচনের মনোনয়নপত্র পূরণ বা জমাদানে আইনজীবী নিয়োগের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ যদি নিজেই মনোনয়নপত্র পূরণ করতে পারেন, সেটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। তবে আইনজীবীরা আইন-কানুন সম্পর্কে অবহিত থাকার কারণে তাদের পরামর্শ নিয়ে অনেকে মনোনয়নপত্র পূরণ করে থাকেন। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা ও আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। হলফনামাও কেউ চাইলে নিজেই পূরণ করতে পারেন। আবার আইনজীবীর পরামর্শ নিয়েও পূরণ করতে পারেন। তবে হলফনামায় অবশ্যই বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বা নোটারি পাবলিকের সামনে (সরকার কর্তৃক অনুমোদিত আইনজীবী) স্বাক্ষর দিতে হয়। এক্ষেত্রে ‘হলফনামায় প্রদত্ত যাবতীয় তথ্য এবং এতদসঙ্গে দাখিলকৃত সকল দলিল দস্তাবেজ আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল’ মর্মে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে হয় প্রার্থীকে।

আবার সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে ‘...তারিখে সম্মুখে শপথপূর্বক বর্ণিত হলফনামা প্রদান করেছেন মর্মে’ ঘোষণা দিতে হয় ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিককে। অন্যদিকে আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রেও আইনজীবী নিয়োগের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

এ বিষয়ে ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব (সংযুক্ত) মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, কেউ যদি নিজেই সব ফরম পূরণ করতে পারেন, এটা তো সবচেয়ে ভালো। আর যদি মনে করেন আইনজীবীর সহায়তা প্রয়োজন, তিনি সেটাও নিতে পারেন। তবে অবশ্যই হলফনামায় একজন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বা নোটারি পাবলিকের সামনে স্বাক্ষর করতে হবে।

মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময়ও কেউ চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে অংশ নিতে পারেন। মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, যেহেতু মনোনয়নপত্র বাছাই এবং আপিলের শুনানি আধাবিচারিক কার্যক্রম, তাই সেখানে আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টি সামনে আসে। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন নেই।

রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল

সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের জন্য আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল আবেদন নেবে ইসি। প্রথম দিনে ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৪১টি আবেদন পড়েছে প্রার্থিতা ফিরে পেতে। আর একটি আবেদন পড়েছে প্রার্থিতা বাতিলের।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের একে একরামুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করেন বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নান। একরামুজ্জামান নবম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে পরাজিত হন। তবে ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে জয় পান।

আবেদনকারীদের মধ্যে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা নির্বাচন ভবনে গিয়েছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার জমা দেওয়া এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক তালিকায় ত্রুটি থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। এছাড়া বগুড়া-৪ আসনে আমজনতার দলের প্রার্থী হিরো আলম আবেদন জানাতে এলে তাকে আদালতে যেতে বলেছে ইসি। হিরো আলম পর্যাপ্ত ‘সময় না পাওয়ায়’ মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি।

অন্যদিকে আলোচিত অন্যদের মধ্যে দলীয় প্রত্যয়নে সঠিকতা না থাকায় চট্টগ্রাম-৫ আসনে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বাক্ষর না করায় বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার, মামলার তথ্য যথাযথ না হওয়ায় কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র, ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগে ঢাকা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল হকের মনোনয়নপত্র, দলীয় প্রত্যয়ন না থাকায় কুমিল্লা-৫ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফীর ও ঢাকা-১৫ আসনে দলটির প্রার্থী আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেলের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তারা এখনো আপিল করেননি।

ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আটটি দল এবার প্রার্থী দেয়নি। দলগুলো হলো-বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম।


   আরও সংবাদ