ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৬ জানুয়ারী, ২০২৬ ১৭:৪০ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪৯ বার
ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই ২০২৫ সাল পার করলো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। গত বছর দুর্বার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয় দলটি। শুধু ক্ষমতাচ্যুতই নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয় আওয়ামী লীগকে। ২০২৫ সালে দলটির ওপর আরও দুটি বড় বিপর্যয় নেমে আসে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগের ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। দলের নেতাকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে আত্মগোপনে চলে যান। দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ অনেক নেতাকর্মী দেশ ছেড়ে ভারত, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের নানা দেশে আশ্রয় নেন। এর পর চলতি বছর দলটির ওপর আরও বড় আঘাত আসে।
বছরের মাঝামাঝিতে আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকার।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলটির বিভিন্ন কার্যালয়, অনেক নেতা ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের বাড়িতে দফায় দফায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এরপর বছরের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে যে ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ও দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালে সেই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
এ বছর আরেকটি বড় আলোচিত ঘটনা ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যাওয়া। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়।
ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দলটিকে নিষিদ্ধ ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি উঠতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দাবি আরও জোরালো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের দেশত্যাগ ও ফিরে আসা
সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের দেশত্যাগ ঘিরে ব্যাপক আলোড়ন, আলোচনা, সমালোচনা ও ক্ষোভ-বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন। গত ৭ মে দিবাগত রাতে তিনি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান। এর আগে, ১৪ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ সদর থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়।
এই পরিস্থিতিতে তার বিদেশ যাওয়া নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এর পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি আরও জোরালো হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে নামেন। প্রশ্ন ওঠে, তিনি কীভাবে দেশ ছাড়লেন। এরই ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তী সরকার বিচার চলা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ১০ মে রাতে উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচার কার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সাইবার স্পেসসহ দলের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও গত ৯ জুন চিকিৎসা শেষে আব্দুল হামিদ থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফেরেন।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ
২০২৫ সালে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়কর ঘটনাগুলোর একটি ছিল দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া। গত ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, উসকানিমূলক মিছিল, রাষ্ট্রবিরোধী লিফলেট বিতরণ এবং বিদেশে পলাতক নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা চালানো হয়েছে।
এসব অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব ধরনের প্রকাশনা, প্রচারণা, সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
এরপর নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। দলের ৭৬ বছরের ইতিহাসে এটি প্রথম ঘটনা যখন কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগই পেল না দলটি। অতীতে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত থাকলেও নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার ঘটনা কখনো ঘটেনি।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়
আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত আসে দলের প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ের মাধ্যমে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনা শুধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নন, তিনি দলটির প্রধান সিদ্ধান্তদাতা ও কেন্দ্রীয় নেতা। দলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি তাকে ঘিরেই আবর্তিত। তার বিকল্প নেতৃত্ব এখনো গড়ে ওঠেনি বলে দলের নেতাকর্মীদের অভিমত। এই বাস্তবতায় আদালতের রায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরও অনিশ্চিত ও সংকটময় করে তোলে।
তবে আওয়ামী লীগ এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির নেতারা একে সাজানো ও পূর্বনির্ধারিত রায় বলে দাবি করেন।
শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ, রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা, চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যাসহ পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়।
রায়ের পর দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত ও সাজানো।