ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:১৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪৩ বার
ঢাকা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই দলটিকে লড়াই করতে হচ্ছে দ্বিমুখী ফ্রন্টে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য এবারের নির্বাচন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সঙ্গে লড়াই নয়, বরং দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামাল দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বিএনপির এই বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত দলের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে বিদ্রোহীদের শক্ত অবস্থান দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বিচলিত করে তুলেছে। তৃণমূল পর্যায়ে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে ভোটের সমীকরণ ও ভোট ভাগাভাগির ঝুঁকি তীব্রতর হচ্ছে, যা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া বিএনপির জন্য কঠিন করে তুলতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও দলীয় সূত্র অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরে বিদ্রোহের মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার বেশ প্রকট। দলের হাইকমান্ড থেকে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া এবং কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও বহু নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে করে দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাই কেবল বাড়বে না, বরং এই মুহূর্তে তা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর বড় আঘাত হানতে পারে।
ইতোমধ্যে বিএনপির ১৯০ জনেরও বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী দেশের ১১৫টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এই সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যানের বিচারে বড় নয়, বরং রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ১১৫টি আসনের মধ্যে এমন অনেক আসন রয়েছে যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ‘ভোট ব্যাংক’ বা শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এমন কী রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বাংলানিউজকে বলেন, “যখন কোনো বড় রাজনৈতিক দলে বিপুল সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকেন, তখন কর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। এতে কেবল প্রার্থীর পরাজয় ঘটে না, বরং দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত হবে এখনই এসব বিষয়ে আলোচনা করে নিয়ন্ত্রণে আনা।”
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের ভাষ্য এবং কৌশলগত অবস্থান কিছুটা ভিন্ন।
তারা সব প্রার্থীকে সরাসরি ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে নারাজ। দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দাবি করছেন, ১৯০ জন প্রার্থীর সবাই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাননি। বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মামলা-মোকদ্দমা, ঋণ খেলাপি হওয়া কিংবা কারিগরি কোনো ত্রুটির কারণে দলের মূল প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা করতেই অন্তত ১৫টির বেশি আসনে তারা ‘বিকল্প প্রার্থী’ প্রস্তুত রেখেছেন। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এটি নতুন কিছু নয়, তবে এবার এর পরিধি অনেক বড়। এছাড়া অনেক প্রার্থীর বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত আইনি জটিলতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি কোনো কারণে বাছাই প্রক্রিয়ায় মূল প্রার্থী বাদ পড়ে যান, তবেই এই বিকল্প প্রার্থীদের চূড়ান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হবে। কিন্তু বিকল্প হিসেবে রাখা নেতাদের বাইরেও অনেকে নিজের স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিএনপি জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে।
তবে বিদ্রোহীদের লাগাম টেনে ধরতে বিএনপি এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কড়া নির্দেশে এরই মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দলটি। বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোটের মাঠে থাকবেন, তাদের জন্য দলে আর কোনো জায়গা নেই। এই হুঁশিয়ারি কেবল কথার কথা নয়, বরং এর বাস্তব প্রয়োগও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি ৯ জন হেভিওয়েট নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ ছিল- জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া।
দলটির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে জানানো হয়েছে, যারা অফিশিয়াল তালিকার বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তারা যদি ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখ পর্যন্ত সরে না দাঁড়ান, তবে কেবল পদ থেকে অপসারণ নয়, তাদের প্রাথমিক সদস্যপদও চিরতরে বাতিল করা হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির মতো বড় দলের জন্য একই সাথে ১৯০ জন নেতাকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হতে পারে যদি না কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এই বহিষ্কারের ফলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আরও বেশি বিভ্রান্ত হতে পারেন, যা সরাসরি ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলবে।
দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির যে ৯ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ এলাকায় শক্তিশালী জনভিত্তি রয়েছে। এই বহিষ্কৃত নেতাদের তালিকায় রয়েছেন- বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন, আব্দুল খালেক এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক তারুণ দে। এছাড়াও ঢাকা উত্তর সিটি বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ এবং বাঞ্চারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহদি হাসান পলাশকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
এই নেতাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, তারা জোটের শরিকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজ নিজ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, রুমিন ফারহানা বা সাইফুল আলম নীরবের মতো নেতাদের বহিষ্কার করা দলের জন্য একটি বড় ধাক্কা, কারণ তারা দীর্ঘকাল ধরে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় হাইকমান্ড তাদের ব্যাপারে কোনো আপস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে বলেন, “দল থেকে বহিষ্কার করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত আমাদেরকে নিতে হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং মহাসচিব বারবার সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়ার পরও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া দুঃখজনক। দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে আমাদের শরিক হিসেবে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাটাও তো বুঝতে হবে। যাদেরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তাদের জন্য দলের তো অন্য চিন্তা-ভাবনা ছিল। সবাইকে তো মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব না, এটা বুঝতে হতো।”
বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা কেবল দলের ভেতর নয়, বরং জোটসঙ্গীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি করেছে। জোটের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী বিএনপি অনেক আসন শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু সেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিব্রতকর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি বিএনপি জামিয়াত উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের জন্য ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু সেখানে হেভিওয়েট নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় জোটের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।
একইভাবে ঢাকা-১২ আসনটি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের জন্য নির্ধারিত থাকলেও সেখানে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাইফুল আলম নীরব। সিলেট-৫ আসনে জামিয়াত উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবাইদুল্লাহ ফারুকের বিপরীতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মামুনুর রশীদ দাঁড়িয়েছেন, যিনি ওই এলাকার জোটপ্রার্থীর জয়ের পথে গলার কাঁটা হয়ে উঠেছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি মুফতি মনির হোসেন কাসেমীর জন্য বরাদ্দ থাকলেও সেখানে বিএনপির মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন নিজের প্রার্থিতা বহাল রেখেছেন।
ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের মতো প্রভাবশালী নেতার বিপরীতে বিএনপির গোলাম নবী আলমগীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় পার্থের জয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, সেখানে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকির জন্য আসনটি রাখা হলেও বিএনপির অন্তত পাঁচজন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন।
পটুয়াখালী-৩ আসনেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের জন্য আসনটি ছাড়া হলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান মামুন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এছাড়া নাটোর-১, ঝালকাঠি-১, কিশোরগঞ্জ-১ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ এর প্রতিটি আসনে চারজন করে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। রাজশাহী-৫ ও পঞ্চগড়-২ আসনে তিনজন করে এবং বাগেরহাট-১, বাগেরহাট-২, চট্টগ্রাম-১৪ ও কুষ্টিয়া-৪ আসনে দুইজন করে বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
জোটের কয়েকজন নেতা এই প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে আসন ভাগাভাগির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে চলেছে। তারা মনে করছেন, যেখানে বিএনপি নেতাকর্মীদের তাদের সহযোগিতা করার কথা, সেখানে উল্টো বিএনপির নেতারাই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন। এতে তৃণমূলের সাধারণ ভোটাররা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং নির্বাচনী কার্যক্রমের সমন্বয় ভেঙে পড়ছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জোটের শীর্ষ নেতারা সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ঢাকা–১২ আসনের জোট প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে বলেন, “দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির এক নেতা এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন, এটা আমার জন্য বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তিনি দেখবেন।”
অন্যদিকে একই আসনে বহিষ্কার হওয়া বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব বাংলানিউজকে বলেন, “এই এলাকায় আমি দীর্ঘদিন যাবত কাজ করছি। এলাকার মানুষের দাবিতেই এখান থেকেই নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দল থেকেও প্রাথমিকভাবে আমাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী কাজ শুরু করা হয়েছিল। এখন এলাকার মানুষ আমাকে আর সরে দাঁড়াতে দিতে চান না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ভোটের সমীকরণ ও মাঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী দলের প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি ধারার দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমন অবস্থায় যেসব আসনে বিএনপির মূল প্রার্থীর বিপরীতে শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন, সেখানে দলটির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক নিশ্চিতভাবেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে।
এই বিভাজনের সুযোগটিই নিতে পারে জামায়াত-এনসিপি জোট। যেখানে বিএনপির প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যকার কোন্দল মেটাতে ব্যস্ত, সেখানে জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গীরা সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে যেসব আসনে বিএনপি তাদের জোটসঙ্গীদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু দলের বিদ্রোহীরা সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ, সেখানে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীরা একচেটিয়া সুবিধা পেয়ে জয়ী হয়ে আসতে পারেন। ফলে বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কেবল আসন হারানোর কারণই হবে না, বরং তা জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদী গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত যারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না, তাদের ব্যাপারে কোনো ক্ষমা নেই। প্রয়োজনে তাদের আজীবন বহিষ্কার করা হবে। তবে একটি নমনীয়তার সুযোগও রাখা হয়েছে, যদি বহিষ্কৃতরা ২০ জানুয়ারির মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন, তবে তাদের বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
বিএনপির এই বিদ্রোহ কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই ১৯০ জন প্রার্থীর বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থেকে যান, তবে বিএনপির ভোট ব্যাংক কয়েক ভাগে বিভক্ত হবে। এর সরাসরি সুফল পাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। বিশেষ করে জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া ১৪টি আসনে যদি বিদ্রোহীরা শক্তিশালী থাকে, তবে জোটের ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল ধরবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ২০ জানুয়ারির মধ্যে এই বিদ্রোহীদের নিবৃত্ত করা। বিএনপি যদি এই ‘গলার কাঁটা’ উপড়ে ফেলতে না পারে, তবে আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দলটির জন্য এখন শাঁখের করাত অবস্থা- একদিকে দলের নেতাদের ত্যাগ করা, অন্যদিকে জোটের শর্ত রক্ষা করা। শেষ পর্যন্ত দলের হাই-কমান্ড এই বিদ্রোহী দাবানল কতটা নেভাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচনে বিএনপির ফলাফল।