ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

থমকে গেছে মোটরসাইকেল বাজার

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৪ বার


থমকে গেছে মোটরসাইকেল বাজার

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর তার ছাপ পড়ছে মোটরসাইকেল খাতে। ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, শো-রুমে ক্রেতার সংখ্যা কম; এই দুই বিপরীত চিত্র একসঙ্গে বাজারে চাপ তৈরি করছে। তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে লাইসেন্সের জন্য মানুষ ভিড় করছেন সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে, আর হেলমেটের বিক্রিও বেড়ে গেছে।

রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলার মোটরসাইকেল বাজারে প্রায় একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

শো-রুমগুলোয় বিরাজ করছে অস্বাভাবিক নীরবতা। ইয়ামাহা, সুজুকি, হিরো, টিভিএস ও বাজাজের মতো বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রয়কেন্দ্রগুলোয় কর্মীদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। 

 

বিক্রেতাদের ভাষ্য, ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সিসি ও স্টাইলের মোটরসাইকেল বিক্রির যে গতি তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রেখে ঈদুল আজহা পর্যন্ত ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই জ্বালানি সংকট সেই সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

অনেক শো-রুমেই বিক্রি কমেছে প্রায় অর্ধেকে।

 

বাজারে যে চিত্র
মিরপুর ৬০ ফিট এলাকার ইয়ামাহা, সুজুকি, হিরো, টিভিএস ও বাজাজের শো-রুমগুলোর বিক্রয়কর্মী ও ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আকর্ষণীয় অফার দিয়েও ক্রেতাদের আগ্রহী করা যাচ্ছে না। ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ ছাড় কিংবা ক্যাশব্যাক সুবিধা দেওয়া হলেও নতুন বাইক কেনার বিষয়ে মানুষের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে।

একই চিত্র মগবাজারেও।

দেশি-বিদেশি মোটরসাইকেলের শো-রুমগুলোর ব্যবস্থাপকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। কারণ, ক্রেতারা এখন শুধু মোটরসাইকেল কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত করছেন না, বরং অনেকেই নিজেদের বাহনটি খুব প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করছেন না।

 

বিক্রি হচ্ছে না ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বাজারেও
তেল সংকটের প্রভাব ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের বাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগে তুলনামূলক কম খরচে পুরোনো বাইক কিনে চলার চিন্তা করতেন অনেকেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আগ্রহ চোখে পড়ার মতো কমে গেছে।

ক্রেতাদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, নিয়মিত জ্বালানি না পেলে মোটরসাইকেল কেনা শেষ পর্যন্ত বাড়তি ঝামেলাই তৈরি করবে।

 

ঢাকার বিক্রেতা রাশেদুল ইসলাম জানান, ক্রেতাদের প্রধান উদ্বেগ এখন জ্বালানি পাওয়া নিয়ে। বেশিরভাগ ক্রেতাই প্রথমে জানতে চান তেল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না। এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে না পারায় অনেকেই কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এমনকি আগে যারা বুকিং দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ তা বাতিল করে দিয়েছেন।

নওগাঁর সেকেন্ড হ্যান্ড মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী আব্দুল করিম জানান, একসময় প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনটি বাইক বিক্রি হতো। এখন পুরো সপ্তাহ পার হলেও একটি বাইক বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই শো-রুমে এসে খোঁজখবর নিলেও শেষ পর্যন্ত কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।

বিক্রেতারা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন মোটরসাইকেলের পাশাপাশি পুরোনো বাইকের বাজারেও বড় ধরনের ধস নামতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় দৈনিক পাঁচ থেকে সাতটি বিক্রি যেখানে স্বাভাবিক ছিল, সেখানে এখন বিক্রির সংখ্যা প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে।

সার্ভিস সেক্টরেও মন্দা
জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মোটরসাইকেল সার্ভিস সেক্টরেও। ধানমণ্ডির এক মোটরসাইকেল মেকানিক জানান, আগে যেখানে প্রতিদিনই সার্ভিসিংয়ের জন্য দীর্ঘ লাইন থাকত, এখন সেখানে ভাটা পড়েছে। টেকনিশিয়ানদের অনেকেই কাজের অভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আয়ের অনিশ্চয়তা তাদের জীবনে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।

মগবাজার রেলগেট এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্কশপে কর্মরত মেকানিকদের কথায় উঠে এসেছে বাস্তবতার কঠিন চিত্র। তাদের ভাষায়, এখন শুধু যাদের জরুরি প্রয়োজন তারাই বাইক ব্যবহার করছেন, অন্যরা গ্যারেজেই ফেলে রাখছেন। ঈদের আগে যেখানে সার্ভিসিং, ধোয়া-মোছা কিংবা ছোটখাটো মেরামতের জন্য ভিড় লেগেই থাকত, এখন সেই ব্যস্ততা আর নেই। দিনের বড় একটি সময়ই পার হচ্ছে কাজের অপেক্ষায়।

ঢাকার বাইরে প্রশাসনের কঠোর নিয়ম
এই সংকটের মাঝেই দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক প্রবণতা। সড়কে নিরাপত্তা জোরদার ও অবৈধ মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণে ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট এবং বৈধ কাগজপত্র ছাড়া জ্বালানি তেল বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দেশের কয়েকটি জেলায়। রংপুর ও গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। নিয়ম না মানলে তেল না দেওয়ার পাশাপাশি করা জরিমানার বিধানও রাখা হচ্ছে। ফলে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্সের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অফিসগুলোয় ভিড় বেড়েছে। 

রংপুর জেলা প্রশাসন অবৈধ মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের মোটরযানে জ্বালানি তেল সরবরাহ না করতে পেট্রোল পাম্প, প্যাকড পয়েন্ট ও এজেন্সিগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ অনুরোধ জানানো হয়। 

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া কোনো মোটরযান সড়ক, মহাসড়ক বা পাবলিক প্লেসে চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের ধারা ৪(১) ও ১৬(১) অনুযায়ী বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং রেজিস্ট্রেশন সনদ ছাড়া যানবাহন চালানো নিষিদ্ধ। একইসঙ্গে ধারা ২৫(১) অনুযায়ী ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস দিয়ে কোনো যানবাহন পরিচালনা করা যাবে না।

আইনের বিধান প্রতিপালনের লক্ষ্যে শুধুমাত্র নিজ নামে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন সনদ, হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন, মোটরযান চালনার হালনাগাদ ড্রাইভিং লাইসেন্স, মানসম্মত হেলমেট, হালনাগাদ ফিটনেস সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), হালনাগাদ রুট পারমিট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ইত্যাদি থাকা অবস্থায় মোটরযানকে জ্বালানি সরবরাহ করা যাবে। বিজ্ঞপ্তিতে কাগজপত্রবিহীন কোনো ধরনের মোটরযানে জ্বালানি তেল না দেওয়ার জন্য পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংকট নিরসনে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়িতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার করে জ্বালানি দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে চালকদের হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মোটরসাইকেলের বৈধ কাগজপত্র থাকতে হবে। অন্যথায় তেল দেওয়া হবে না এবং তাদেরকে জরিমানার আওতায় নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পাম্প মালিকদের জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিটি পাম্পে জ্বালানি বিতরণের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ উপস্থিত থাকবে। একই সঙ্গে হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ছাড়া তেল না দেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়।

জ্বালানি তেলের চলমান সংকট ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে সাতক্ষীরায় মোটরসাইকেলের জন্য তেল সরবরাহে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে জেলা প্রশাসনের সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত নির্ধারিত ‘ফুয়েল কার্ড’ এবং বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলে জ্বালানি তেল দেওয়া হবে না। 

গত বুধবার রাতে সাতক্ষীরা জেলা তথ্য অফিসার জাহারুল ইসলাম এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জেলার সব ফিলিং স্টেশন থেকে শুধুমাত্র মোটরসাইকেলে জ্বালানি নেওয়া যাবে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে কোনো পাম্প বা ডিলার পয়েন্ট থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে না। এছাড়া জ্বালানি নিতে গেলে চালকদের বৈধ কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স টোকেন, সঙ্গে রাখতে হবে এবং হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। জেলা প্রশাসনের সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত নির্ধারিত ফুয়েল কার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কার্ড ছাড়া কোনো ফিলিং স্টেশন বা ডিলার পয়েন্ট থেকে জ্বালানি দেওয়া হবে না। ফুয়েল কার্ড জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইউএনও অফিস ও জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা যাবে। প্লাস্টিক বোতল, ড্রাম বা কোনো ধরনের কনটেইনার জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাশাপাশি অনুমোদিত ফিলিং স্টেশন ও ডিলার পয়েন্ট ছাড়া খোলা বাজারে জ্বালানি তেল ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ থাকবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে প্রশাসন।

লাইসেন্স রেজিস্ট্রেশনে আবেদন বেড়েছে দ্বিগুণ
বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলের তুলনায় লাইসেন্স রেজিস্ট্রেশন আবেদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। খুলনা বিআরটিএ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন মোট ৫ হাজার ২০০ জন। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে আবেদন জমা পড়েছে ২ হাজার ২০০টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪০০টি এবং মার্চে ১ হাজার ৬০০টি। একই সময়ে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে ২ হাজার ৭৯৭টি।

খুলনা সার্কেলের বিআরটিএর সহকারী পরিচালক উসমান সরওয়ার আলম জানান, লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কার্যক্রমে মানুষের আগ্রহ এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই অনেকে অফিসে এসে আবেদন করছেন। তিনি বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব সেবার চাহিদাও বাড়ছে। জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে মোটরসাইকেল বিক্রিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, তবে লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনের আবেদনের প্রবাহে তেমন কোনো স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকায় মোটরসাইকেলের লাইসেন্সের সংখ্যা বেড়েছে কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর উপ-পরিচালক তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী বাংলানিউজকে জানান, লাইসেন্সের আবেদন বেড়েছে কি না তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই সঠিক তথ্য দিতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে, বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (লাইসেন্স) মো. ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বেড়েছে ইলেক্ট্রিক বাইকের বিক্রি
তেলের বাজারে টানা অস্থিরতা, মূল্যবৃদ্ধি আর সরবরাহ ঘাটতির প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বেড়েছে ইলেক্ট্রিক বাইকের বিক্রি। বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং অনিশ্চয়তা থেকেই মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে ঝুঁকছেন ব্যাটারিচালিত দুই চাকার যানবাহনের দিকে।

ঢাকার বিভিন্ন শো-রুম ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক মাসের তুলনায় ইলেক্ট্রিক বাইকের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে যেখানে মূলত স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য এসব বাইক কিনতেন গ্রাহকরা, এখন তা ব্যবহার হচ্ছে দৈনন্দিন অফিস যাতায়াত, ব্যবসায়িক কাজে এমনকি পণ্য পরিবহনেও। অনেকেই বলছেন, একবার চার্জ দিলেই ৬০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলা যায়, ফলে প্রতিদিনের তেলের খরচ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় যেখানে গণপরিবহন তুলনামূলক কম সেখানে ইলেক্ট্রিক বাইক হয়ে উঠছে সহজ ও সাশ্রয়ী সমাধান। স্থানীয় ডিলাররা জানান, আগে মাসে যে পরিমাণ বাইক বিক্রি হতো, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই আগে মোটরসাইকেল ব্যবহার করলেও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ইলেক্ট্রিক বাইকে চলে এসেছেন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এই বাইকের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে তরুণদের মধ্যে।

হেলমেটের বিক্রি আগের চেয়ে বেশি
তেল সংকট পরিস্থিতিতে চলাচল সীমিত হওয়া ও জেলা প্রশাসনের কড়াকড়ি আরোপের ফলে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে হেলমেটের বাজারে। হঠাৎ করেই হেলমেটের চাহিদা বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে বিক্রিও। হেলমেট বিক্রেতারা জানান, আগে অনেক মোটরসাইকেল চালক নিয়ম মানতেন না। কিন্তু তেলের সংকটের কারণে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমে যাওয়ায় এখন যারা বের হচ্ছেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক। পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে হেলমেট ছাড়া চলাচলে জরিমানার ভয়ও কাজ করছে।

একজন বিক্রেতা জানান, আগে দিনে ১০-১৫টি হেলমেট বিক্রি হতো, এখন সেটা বেড়ে ২৫-৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিনে প্রশাসনের অভিযান জোরদার হওয়ার পর বিক্রি আরও বেড়েছে। আরেকজন বিক্রেতা বলেন, মানুষ এখন বাধ্য হয়েই হেলমেট কিনছে। আগে অনেকেই গুরুত্ব দিত না, কিন্তু এখন জরিমানা এড়াতে এবং নিরাপত্তার কথা ভেবেই কিনছে। এতে আমাদের ব্যবসা কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

মোটরসাইকেল খাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও নগরজীবনের গতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উৎপাদন, বিপণন থেকে শুরু করে সার্ভিসিং; এই পুরো চেইনে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৃহৎ জনগোষ্ঠী আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে এই নীরব সংকট বড় ধরনের অর্থনৈতিক অস্থিরতার রূপ নিতে পারে। জ্বালানি তেলের এই কৃত্রিম সংকট কেবল একটি খাতের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিকভাবে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় যাতায়াতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। একইসঙ্গে এ অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


   আরও সংবাদ