ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৩১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২২ বার
পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে চলতি বছরে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৃণমূল খামারে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অঙ্ক না মেলায় খামার বন্ধ করে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার খামারি।
চলতি বাজেটে এক লাফে কর্পোরেট কর ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধিসহ সব ধরনের কর ও শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় এবং দফায় দফায় পোল্ট্রির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সবমিলিয়ে বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের উদীয়মান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পোল্ট্রি খাতে কর্পোরেট কর এখন সবচেয়ে বেশি।
২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, নেপাল, ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পোল্ট্রি ও পশুখাদ্য খাতে কর ও শুল্ক সুবিধার তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।
আসন্ন বাজেটে পোল্ট্রি শিল্পের ওপর করের বোঝা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পোল্ট্রির এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো বাজেটে পোল্ট্রি খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কর অব্যাহতি সুবিধা রাখা। আয়কর, আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়করে (এআইটি) সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহায়ক বাজেট ব্যবস্থাপনা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
তারা জানান, বাজেটে ভালো ব্যবস্থাপনা না থাকলে সাধারণ মানুষের সহজলভ্য প্রোটিনের সবচেয়ে বড় উৎস পোল্ট্রি শিল্প খাদের কিনারে গিয়ে পড়বে। এ খাত বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানির অধীনে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে।
খামারিরা জানান, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হয় সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে অনেক সময় সেটি সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৪৬ টাকা, যেখানে পাইকারি দাম থাকে ১৪৫ থেকে ১৪৮ টাকা। এ অবস্থায় উৎপাদন খরচ কমানো ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
দুই যুগের বেশি সময় ধরে খামার পরিচালনা করে আসা টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার খামারি আলমগীর হোসেন বলেন, গত এক বছরে যেভাবে খাদ্যের দাম বেড়েছে অতীতে এমন কখনো হতে দেখিনি। প্রতিদিন আমিসহ হাজার হাজার খামারি লোকসান গুনছি। উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে আমাদের ডিম, মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। চোখের সামনে শত শত খামারিকে নিঃস্ব হতে দেখছি। খাদ্যের দাম যদি না কমানো যায় তাহলে প্রান্তিক পর্যায়ের আমরা কোনো খামারিই টিকে থাকতে পারব না।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল বলেন, পোল্ট্রি শিল্প বাঁচাতে চাইলে প্রথমে খাদ্যের দাম কমাতে হবে। কেননা, খামারির মোট খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই হয় খাদ্য কেনায়। কম দামে খামারিদের খাদ্য দিতে হলে খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আপনাকে আয়কর ও শুল্ক কমাতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। এর পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরি করে তাদের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়সহ নানা সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন এই অধ্যাপক। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এ থেকে উত্তরণের এটিই একমাত্র পথ। যদি এর সমাধান না হয় তাহলে সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের এই উৎসটি গভীর সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোনো খাতে এত উচ্চ কর নেই। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কর অব্যাহতি দিয়ে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দিয়ে থাকে। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমরা উল্টোটা করছি। এটার প্রভাব কিন্তু ইতোমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়া শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এই প্রভাব বাজার ও ভোক্তাদের ওপর পড়বে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সুরক্ষা এবং পোল্ট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিতে বর্তমানের কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসা জরুরি। নইলে প্রান্তিক খামারিদের আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আর প্রান্তিক খামারি না থাকলে এ শিল্প পুরোটাই বড় কর্পোরেট কোম্পানির অধীনে চলে যাবে। তখন ওই সব কর্পোরেট কোম্পানির বেঁধে দেওয়া দামেই ভোক্তাদের মাছ, ডিম, মুরগি ও মাংস কিনে খেতে হবে।
মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, গত ৫ বছর ধরে নানা চড়াই-উতরাই পার করে পোল্ট্রি শিল্প টিকে আছে। করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের এই খাতকে আরও বেশি দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে গেছে। এরপর চলতি বছরে প্রায় দ্বিগুণ কর ও শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়। কর্পোরেট কর ১৫% থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫% করা হয়েছে, যা একেবারেই অযৌক্তিক। এআইটি ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এভাবে আমাদের ওপর গত বছর করের বোঝা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রভাব কিন্তু সরাসরি তৃণমূল খামারিদের ওপর গিয়ে পড়েছে। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম, মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। মাসের পর মাস লোকসানের ঘানি টানছেন লাখ লাখ খামারি। বিদ্যুতের ভর্তুকিসহ সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারের কৃষক কার্ডে খামারিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা কোয়ালিটি ব্রিডার্স লিমিটেডের পরিচালক মো. সাফির রহমান বলেন, সরকার যদি আগামী বাজেটে পোল্ট্রি শিল্পে বিশেষ সুবিধা না দেয় তাহলে এ খাতে আর কেউ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে না। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। যারা আছেন তারা বিকল্প খাতে চলে যাবেন। তখন কিন্তু ডিম, মুরগি আমাদের উচ্চ মূল্যে কিনে খেতে হবে। ওই সময় সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাবে সহজলভ্য প্রাণিজ এ পণ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও পোল্ট্রির খাতগুলোর সংগঠন ও খামারিদের দেওয়া তথ্যে মতে, গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, কমেছে প্রবৃদ্ধি হার। ২০২১ প্রবৃদ্ধি হার ৪.৫ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ১০০কে ভিত্তি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২২ প্রবৃদ্ধি ৫.২ শতাংশ হয়েছে এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ প্রবৃদ্ধি ৩.৮ শতাংশ হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ (প্রাক্কলিত) প্রবৃদ্ধি হার ৩.২ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯০ শতাংশ।