ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বৈশাখ বরণের বর্ণিল আয়োজন

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২০ বার


বৈশাখ বরণের বর্ণিল আয়োজন

চৈত্রের খরতাপকে ছাপিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণে এখন শুধুই রঙের উৎসব। রঙতুলির আঁকিবুঁকিতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ, পাখিসহ নানা শৈল্পিক কারুকার্য।

 

শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত চারুকলা অনুষদ ঘুরে বর্ষবরণের এমন প্রস্তুতি দেখা গেছে। বরাবরের মতো বর্ষবরণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শোভাযাত্রা।

এ বছর নামকরণ পাল্টে বৈশাখী শোভাযাত্রা রাখা হয়েছে। 

 

‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এ বছর বৈশাখী বরণে ৫টি বড় মোটিফ রাখা হয়েছে।

এরমধ্যে রয়েছে একটি বড় মোরগ, নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের কাঠের হাতি, শান্তির পায়রা, বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে একটি বড় দোতারা এবং টেপা আকৃতির ঘোড়া।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, বড় মোরগের কাজ প্রায় শেষের দিকে।

শুভ্র এই মোরগ ভোরের ডাক দিচ্ছে। হাতি, দোতারা তৈরির কাজও শেষের দিকে। বর্ষবরণকে সামনে রেখে চারুকলার সামনের দেয়াল সেজেছে নকশিকাঁথার সাজে। এছাড়া চারুকলার প্রতিটি কোণ, গ্যালারি আর বারান্দা সেজে উঠেছে বর্ণিল ক্যানভাসে। 

 

একটু ভেতরে প্রবেশ করলেই সবার প্রথমে চোখে পড়ে জয়নুল গ্যালারির সামনে সামনের জায়গাটা, যেখানে দেয়াল ঘেঁষে সারি টেবিলে চলছে নানান লোকজ মুখোশ তৈরির কাজ।  রাজা-রানি, বাঘ, পেঁচা আর নানা লোকজ চরিত্রের এসব মুখোশে তুলির শেষ আঁচড় দিচ্ছেন চারুকলার সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা। 

তার থেকে সামনে গেলেই দেয়ালে কয়েকটি পটচিত্র রাখা। গতবারের আনন্দ শোভাযাত্রায় প্রথম এই পটচিত্রগুলো প্রদর্শন করা হয়। চারুকলার লিচুতলার পাশেই পাখিঘরে চলছে পাখি তৈরির কার্যক্রম। তার থেকে বের হয়ে পূবে আসলে মোটিফ তৈরির যজ্ঞ চোখে পড়ে। বাঁশ আর ককশিতের বুননে ধীরে ধীরে এসব মোটিফ প্রাণ পাচ্ছে। 

চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী দস্তগীর চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয় এই বিষয়ে। তিনি মঙ্গল শোভাযাত্রা উপলক্ষ্যে ১৫ এপ্রিল একটি যাত্রাপালার চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, বৈশাখের উৎসব মূলত শুরু হবে। ১৪ এপ্রিল প্রথম প্রহরে। মধ্যরাতে চারুকলার শিক্ষার্থীরা লিচুতলায় ঢোলের তালে নাচবে। অনেকে সারা রাত অবস্থান করবে। পরদিন সকালে শুরু হবে শোভাযাত্রা। ১৫ তারিখ চারুকলার শিক্ষার্থীরা বটতলায় একটি যাত্রাপালা করবে। ১৬ তারিখ কিশোরগঞ্জের একটি যাত্রাদল আসবে। 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে বর্ষবরণ আয়োজন নিয়ে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা এবার অনেকটাই কমে গেছে। আগের মতো শিক্ষার্থীরাই এটি আয়োজন করছেন। এবার সরকারের দিক থেকে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতাও বেশি। 

এ বছর বৈশাখী শোভাযাত্রা শুরু হবে সকাল ৯ টায়। সকাল ৮ টা থেকেই প্রস্তুতি চলবে। উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক প্রস্তুতি এরই মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। 

শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউ-টার্ন নেবে। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শোভাযাত্রা শেষ হবে।

শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা শুধু নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। শোভাযাত্রা চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রবেশ পথ ও সংলগ্ন সড়ক বন্ধ থাকবে। শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষার্থে আশপাশ দিয়ে শোভাযাত্রায় প্রবেশ করা যাবে না। শেষ প্রান্ত দিয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের নিজ নিজ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা অব্যাহত রেখে লোক-ঐতিহ্য ধারণ করে বড় পরিসরে এবং বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে এবছরও শোভাযাত্রায় সর্বজনীন অংশগ্রহণের আয়োজন করা হয়েছে। এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি মোটিফ থাকবে। তাহলো-মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। লোকজ প্রতীকের ধারায় এগুলো শক্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। প্রতিটি মোটিফেই প্রতিফলিত হবে বাংলার লোক-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার গভীর অনুষঙ্গ। 

পাশাপাশি ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, এসো হে বৈশাখ এবং দেশাত্মবোধক সংগীত শোভাযাত্রার আবহকে আরও উদ্দীপনাময়, প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবে। শোভাযাত্রায় ২শ’ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন।

পহেলা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোন ধরনের মুখোশ পরা এবং ব্যাগ বহন করা যাবে না। তবে চারুকলা অনুষদ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। নববর্ষের শোভাযাত্রায় কোন ধরনের ইংরেজি প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া বেলুন ও ফেস্টুন উড়ানো এবং আতশবাজি পোড়ানো যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভুভুজিলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

বর্ষবরণ শোভাযাত্রা চলাকালে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের জন্য ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখস্থ রাজু ভাস্কর্যের পেছনের গেইট,  চারুকলা অনুষদ সম্মুখস্থ ছবির হাটের গেইট এবং বাংলা একাডেমির সম্মুখস্থ রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন গেইট বন্ধ থাকবে।

নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে সব ধরনের অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত প্রবেশ করা যাবে। ৫ টার পর কোনভাবেই প্রবেশ করা যাবে না, শুধু বের হওয়া যাবে। আগামীকাল ১৩ এপ্রিল সোমবার সন্ধ্যা ৭টার পর ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে কোন ধরনের যানবাহন চালানো যাবে না এবং মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসরত কোনো ব্যক্তি নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যাতায়াতের জন্য শুধুমাত্র নীলক্ষেত মোড় সংলগ্ন গেইট ও পলাশী মোড় সংলগ্ন গেইট ব্যবহার করতে পারবেন।

ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম এবং অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প থাকবে। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠ সংলগ্ন এলাকা, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা, দোয়েল চত্বরের আশপাশের এলাকা ও কার্জন হল এলাকায় মোবাইল পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হবে।

নববর্ষ উপলক্ষ্যে নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে চৈত্র সংক্রান্তি বিকেলে চারুকলা অনুষদে সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকবে, যা পুরাতন বছরের সমাপ্তি ও নতুন বছরের সূচনাকে প্রতিফলিত করবে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। সেখানে লোকসংগীত, নৃত্য ও শিল্পচর্চার বিভিন্ন ধারার পরিবেশনা থাকবে। এছাড়া ১৫ ও ১৬ এপ্রিল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ‘প্রত্যয় বাংলাদেশ’-এর পরিবেশনায় ‘বাগদত্তা’ ও ‘দেবী সুলতানা’ শীর্ষক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হবে।


   আরও সংবাদ