ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ত্রুটি সারিয়ে আরও টেকসই আইন করবে বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২০ বার


ত্রুটি সারিয়ে আরও টেকসই আইন করবে বিএনপি

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাস না হওয়ায় ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল (ল্যাপস) হয়ে গেছে এবং চারটি রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে আরও সাতটি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বিলুপ্ত হয়েছে।

বিচার বিভাগ, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

 

তবে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে— জনমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বা বিভ্রান্তি তৈরি করে, এমন কোনো আইন তড়িঘড়ি করে পাস করবে না বর্তমান সরকার।

বরং ত্রুটিপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে।

 

অধ্যাদেশগুলো রহিত বা বাতিল হওয়ার পর জনমনে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে খোদ সরকারি দলেই উদ্বেগ রয়েছে।

গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সরকার দলীয় সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

 

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে দলীয় এমপিরা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তাদের অভিমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে এসব অধ্যাদেশ যুগান্তকারী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এগুলো রহিত করা হলে জনমনে ভুল বার্তা যেতে পারে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, “জনগণ আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছে, তার প্রতিদান দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। কোনো প্রকার ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অবহেলা বরদাশত করা হবে না। আমরা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ।”

দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এসব অধ্যাদেশ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। সেখানেও সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাড়াহুড়ো করে নয়, বরং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা ও জনমতামত যাচাইয়ের পর এই আইনগুলোকে আরও নিখুঁত ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলা হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৩টি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল আকারে সংসদে পাস না হওয়ায় বাতিল (ল্যাপস) হয়ে গেছে। আর চারটি রহিতকরণ বিল পাসে সাতটি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। বাতিল অধ্যাদেশগুলো আরো শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকারি দল।

সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংসদ না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশগুলো পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন উত্থাপন এবং তা ৩০ দিনের মধ্যে বিল আকারে পাস না হলে বাতিল হয়ে যায়। গতকাল ১১ এপ্রিল ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে বিল না পাস হওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে।

সেগুলো হলো—গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ। আর সংসদে চারটি বিল পাসের মাধ্যমে কার্যকারিতা হারানো সাতটি অধ্যাদেশ হচ্ছে—সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ১২ মার্চ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। এরপর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অধ্যাদেশগুলো সংসদের বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়।

গত ২ এপ্রিল বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন সংসদে প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু ও ১৫টি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া চারটি বাতিল ও ১৬টি পরে যাচাই-বাছাইসহ অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের আলোকে মাত্র ছয় দিনে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে চলতি সংসদ। সর্বশেষ গত শুক্রবার ২৪টি বিল পাস হয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ৩১টি, বুধবার ১৩টি, মঙ্গলবার ১৪টি, সোমবার সাতটি ও রবিবার দুটি বিল পাস হয়।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনসহ সাতটি অধ্যাদেশে বাতিল ও বিল আকারে পাস না হওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়েছে। ফলে এসব অধ্যাদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সুরক্ষা কী হবে, তা অস্পষ্ট। ভবিষ্যতে গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে ‘গণভোট ২০২৬’সহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে। অধ্যাদেশ পাস না করায় দুদক আইনের সংশোধনী বাতিল হয়েছে। ফলে সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না। মানবাধিকার কমিশন চলবে ২০০৯ সালের আইনে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না। অধ্যাদেশ রহিত হওয়ায় উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ আবারও প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফিরবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ও বিলুপ্ত হয়েছে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা, পদোন্নতি, বদলির ক্ষমতা ফিরেছে সরকারের কাছে। কমিটি সংশোধন করে পুলিশ কমিশন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সংসদ বিল পাস না করায়, জুলাই সনদে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন বিলুপ্ত হয়েছে। বিশেষ কমিটির সুপারিশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ থাকলেও সংসদে বিল তুলে অধ্যাদেশটি রহিত করায় আগের মানবাধিকার কমিশন আইন পুনর্বহাল হয়েছে। এ সব বিষয় নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল।

অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন গত ২ এপ্রিল সংসদে প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনে ১৬টি অধ্যাদেশ পরে যাচাই-বাছাইসহ অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

তবে বিচার বিভাগীয় অধ্যাদেশগুলো রহিত করার বিষয়ে আপত্তি জানায় জামায়াতে ইসলামী। সংসদীয় কমিটিতে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এসব অধ্যাদেশ হুবহু রাখার পক্ষে মত দিয়ে একটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত প্রদান করেন। তারা উল্লেখ করেন, এই অধ্যাদেশগুলো বিচার বিভাগকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ ছিল।

অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, “সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ শুরু হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা আমরা পালন করেছি। তবে আমরা কোনগুলো উপস্থাপন করব এবং কোনগুলো করব না, সেই এখতিয়ার সরকারের রয়েছে। যেগুলো উপস্থাপন করা হয়নি, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী বাতিল বা ল্যাপস হয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। বিরোধী দলের সঙ্গে পরামর্শ শেষে এগুলো পরে আনা হবে। তখন বিলগুলোর ওপর বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ থাকবে।”

সরকারের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল। শেষ দিনে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে তারা। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, “অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল, সরকার তা ভঙ্গ করেছে। সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সব অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন এবং তা নিয়ে আলোচনা করা হবে। কিন্তু ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ উত্থাপনই করা হয়নি। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো বাদ দিয়ে সরকার নিজেদের খেয়ালখুশিমতো কাজ করছে। ভবিষ্যতে সংসদে এসব বিষয়ে আমরা কঠোর জবাব চাইব।”

অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ার ফলে একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দুদক আইনের সংশোধনী বাতিল হওয়ায় সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না। মানবাধিকার কমিশনকে ২০০৯ সালের পুরনো আইনে চলতে হবে, ফলে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না। এছাড়া, উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুনরায় সরকারের হাতে ফিরে যাওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক অধ্যাদেশ তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল, যেখানে আইনি ফাঁকফোকর ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে বিএনপি বদ্ধপরিকর। আমরা এমন কোনো আইন পাস করব না যা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিচার বিভাগ বা পুলিশের সংস্কার থেমে যাবে না, বরং নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে আরও গণতান্ত্রিক ও টেকসই আইন প্রণয়ন করা হবে।”

আগামী ১৫ এপ্রিল সংসদের অধিবেশন পুনরায় বসবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বাতিল হওয়া এই অধ্যাদেশ এবং নতুন বিল উত্থাপনকে কেন্দ্র করে সংসদের ভেতরে ও বাইরে উত্তাপ আরও বাড়তে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বাংলানিউজকে বলেছেন, জনগণের কাছে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এমন কোনো আইন বিএনপি পাস করবে না বিএনপি। যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়েছে তা ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী কিভাবে করা যায় সে বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা চলছে।


   আরও সংবাদ