ঢাকা, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

তীব্র তাপদাহে বাংলাদেশের ক্ষতি ১৮০ কোটি ডলার

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ১৬:০০ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩১ বার


তীব্র তাপদাহে বাংলাদেশের ক্ষতি ১৮০ কোটি ডলার

তীব্র তাপদাহ ও অতিরিক্ত গরমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় শুধু ২০২৪ সালেই দেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান।

আর এতে শুধু ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে।

 

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়, এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা দ্রুত কমতে থাকে এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।

 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের মধ্যে তাপদাহের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকায়। অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রতি বছর ঢাকার মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে।

এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় হারানো কর্মঘণ্টার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে মোট কর্মঘণ্টার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পও চরম তাপদাহের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির যৌথ বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক খাত সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে।

অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তীব্র গরমের কারণে পোশাক কারখানায় উৎপাদনের নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে না পারলে নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

বিশ্বব্যাংকের মতে, তাই তাপমাত্রা সহনীয় রাখতে কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

প্রতিবেদনে ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’ গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপদাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এ ছাড়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৫২ কোটি মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হবেন। বর্তমানে এ ধরনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি হবে।

সবুজ বিনিয়োগে ইতিবাচক অগ্রগতি
সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, তাপসহনশীল অবকাঠামো এবং সবুজ অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড চালুর পর দেশের শিল্পকারখানায় জ্বালানি ও পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা (আইএফসি)-এর সহযোগিতায় এই রূপান্তর আরও গতিশীল হয়েছে।

এর ফলে ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ২৭০টিরও বেশি এলইইডি সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে উঠেছে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সবুজ শিল্প অবকাঠামোর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, তাপদাহ সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে অতিরিক্ত গরম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে শহরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত।

তিনি বলেন, এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভবিষ্যতের জন্য আরও বাসযোগ্য, সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক শহর গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।


   আরও সংবাদ