ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বেসরকারি খাতে জ্বালানি: কমবে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, কাটবে সংকট

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৩ অগাস্ট, ২০২৬ ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৮ বার


বেসরকারি খাতে জ্বালানি: কমবে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, কাটবে সংকট

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই দেশে দেখা দেয় জ্বালানি সংকটের শঙ্কা। কখনো পেট্রল-অকটেনের জন্য পাম্পে দীর্ঘ সারি, কখনো ডিজেল সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, আবার কখনো গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে থাকে।

এই বাস্তবতায় পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে থাকার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সরকারের একক ব্যবস্থাপনায় যদি বারবার সরবরাহ সংকট, আমদানি ঝুঁকি, ভর্তুকির চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থার দিকে যাওয়া সময়ের দাবি।

সেই বিকল্পের নাম বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার।

 

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেল কিনতে দীর্ঘ সারি দেখা যায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের জন্য দৈনিক জ্বালানি কেনার সীমা নির্ধারণ করে।

 

অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের পুরো কাঠামো থাকার পরও সংকটের সময় সাধারণ মানুষকে রেশনিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে থাকে, এতদিনের রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থাপনা ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চাহিদা পূরণে কতটা সক্ষম।

 

আর উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প চিন্তাভাবনা শুরু করে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি জ্বালানি খাতের ভর্তুকির চাপ কমানো এবং বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেন। গত ১১ আগস্ট রাজধানীতে জ্বালানি খাত নিয়ে এক সেমিনারেও মন্ত্রী বলেন, সরকার বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব এবং বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগে আগ্রহী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রীর ওই বক্তব্য শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়; বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বহু বছরের কাঠামো বদলে দেওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিতও বটে। তারা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তি থেকেই বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের মূল নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হাতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, শিল্পায়ন বেড়েছে, যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে, কৃষি ও পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে কয়েক দশক আগে তৈরি ব্যবস্থাপনা কাঠামো দিয়ে আজকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ-আইসিবির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। আমাদের দেশে টেলিকমিনিকেশন যখন বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়েছে, তখনও বিরোধিতা হয়েছে। সুতরাং ওই বিরোধিতা থাকবেই। এখানে কেউ একটা কাঠামোর ভেতর অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেটার থেকে নড়তে চায় না। তাদের একটু গ্লোবাল ফ্যাক্টর দেখা উচিত। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা ইন্ডিয়া হাও ডিড দে ম্যানেজ, তারা কীভাবে সামলাচ্ছে জিনিসটা। পেট্রোবাংলা যখন দায়িত্ব নিয়েছিল তখনকার কথা ভিন্ন, তখন অর্থনীতির সাইজ ছিল অর্ধেক। এখন আর একা পেট্রোবাংলার পক্ষে এগুলো সামাল দেওয়া সম্ভব না।

 

 

যারা বেসরকারি খাতে না দেওয়ার বিষয়ে নানা ধরনের যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন এবং বিভিন্ন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তাদের বক্তব্য ‘আজেবাজে’ উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ইনভলভ করতেই হবে। আমরা চাইছি কম্পিটিশন। বেসরকারি খাতকে জ্বালানি ব্যবসায় যুক্ত করার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য। আমদানির অনুমোদন, পণ্যের মান, মজুত সক্ষমতা, মূল্য নির্ধারণ, মুনাফার সীমা, বাজারে প্রতিযোগিতা-সবকিছু নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। এখানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। 

রাষ্ট্র ব্যবসা করবে না, কিন্তু রাষ্ট্র বাজারের খেলা নিয়ন্ত্রণ করবে-এই নীতিই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তি হবে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে জ্বালানি খাতের অনুসন্ধান, উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের বিভিন্ন পর্যায়ে বেসরকারি খাত স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছে। তার মতে, বেসরকারি অংশগ্রহণের কারণে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে-এমন ধারণা ঠিক নয়; বরং জনস্বার্থ রক্ষার মূল বিষয় হলো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।

 

 

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উদাহরণ টেনে আশরাফ আহমেদ বলেন, একসময় এই খাতে রাষ্ট্রের প্রাধান্য ছিল শতভাগ। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখেছি, এই কৌশলগত খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা বাড়ার পর সেবার পরিধি ও মানে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

তার মতে, জ্বালানি খাতেও স্বাধীন, দক্ষ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি অংশগ্রহণ থেকে একই ধরনের সুফল পাওয়া সম্ভব।

তিনি আরও মনে করেন, বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আসার আগে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতেই ছিল। ফলে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি ব্যবসায় যুক্ত করা বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন কোনো ধারণা নয়।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির সাবেক এক কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন সরকারের হাতে থাকায় এখানে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তাদের দুর্নীতির কারণেই সিস্টেম লস আর মোটা অংকের ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। সরকার যায়, সরকার আসে, কিন্তু তারা থাকে বহাল তবিয়তে। এখন এই গোষ্ঠী চাইছে না যে, কোনোভাবে এই খাত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাক। কারণ সেটা হলে তারা তাদের দীর্ঘদিনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। 

এ বিষয়ে তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, যে প্রতিষ্ঠান আমদানি করবে, তার পর্যাপ্ত মূলধন থাকতে হবে। নিজস্ব বা নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণব্যবস্থা থাকতে হবে। তেল খালাসের অবকাঠামো, জেটি, পরিবহন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও দেশের বাজারে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, যারা এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে, তাদের রিফাইনারি স্থাপনেও উৎসাহ দিতে হবে।

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে জ্বালানি খাত আর কেবল সরকারি দপ্তরের ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি এখন শিল্প, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। সঠিক নীতি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে আজকের জ্বালানি সংকটই আগামী দিনের শিল্পায়নের বড় সুযোগে পরিণত হতে পারে।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে দুই দিন আগে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং মন্ত্রণালয় থেকে যে প্রেস রিলিজ সরবরাহ করা হয়েছে, সেটি সরকারের অবস্থান। অর্থাৎ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগে আগ্রহী সরকার।


   আরও সংবাদ