ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ফুটবলের আকাশে চিরকাল উজ্জ্বল ম্যারাডোনা

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১২ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার


ফুটবলের আকাশে চিরকাল উজ্জ্বল ম্যারাডোনা

ফুটবল ভালোবাসেন, অথচ দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারও কাছে তিনি ফুটবলের রাজপুত্র, কারও কাছে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন।

কারও হৃদয়ে তিনি আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক, আবার কারও কাছে তার বাঁ পায়ের জাদু ফুটবলের সৌন্দর্যের চিরন্তন প্রতীক। মাঠের অসাধারণ নৈপুণ্য, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং ও ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যে ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম চিরস্থায়ী করে গেছেন এই কিংবদন্তি।

 

আজ ৩০ অক্টোবর, দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার জন্মদিন। ১৯৬০ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের কাছে লানুসে জন্মগ্রহণ করেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড়।

বেঁচে থাকলে আজ ৬৬ বছরে পা দিতেন তিনি। ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর মাত্র ৬০ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে আজও অমলিন ম্যারাডোনা।

তার জন্মদিনে তাই ফিরে আসে মাঠ কাঁপানো সেই সব মুহূর্ত, যেগুলো ফুটবলকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

 

ম্যারাডোনার বেড়ে ওঠা ছিল সাধারণ এক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। মাত্র আট বছর বয়সে স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রতিভা নজরে আসে। এরপর আর্জেন্টিনার ক্লাব আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের বয়সভিত্তিক দল লস সেবোলিতাসে যোগ দেন তিনি। সেখানেই ধীরে ধীরে নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৯৭৬ সালে আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় ম্যারাডোনার। বয়সে তরুণ হলেও বল নিয়ন্ত্রণ, গতি, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠার দক্ষতা এবং গোল করার ক্ষমতায় দ্রুতই সবার নজর কাড়েন তিনি। ১৯৮১ সালে যোগ দেন নিজের প্রিয় ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে। সেখানে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগ জয়ের স্বাদও পান।

এরপর ১৯৮২ সালে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে পা রাখেন ম্যারাডোনা। বার্সেলোনায় তার সময়টা খুব দীর্ঘ ছিল না। অসুস্থতা ও চোটের কারণে ক্যারিয়ারে বাধাও আসে। তবে ক্লাবটির হয়ে কোপা দেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপসহ একাধিক শিরোপা জেতেন তিনি।

১৯৮৪ সালে ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। তার আগমনের আগে ইতালির ফুটবলে নাপোলি খুব বড় শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল না। কিন্তু ম্যারাডোনার নেতৃত্ব, অসাধারণ পারফরম্যান্স ও মাঠের প্রভাব দলটিকে বদলে দেয়। নাপোলির হয়ে ১৯৮৬-৮৭ ও ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে ইতালিয়ান লিগের শিরোপা জেতেন তিনি। ১৯৮৭ সালে কোপা ইতালিয়া এবং ১৯৮৯ সালে উয়েফা কাপ জয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দক্ষিণ ইতালির ক্লাবটির সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আবেগের নাম। তার সম্মানে নাপোলির হোম স্টেডিয়ামের নামও পরে রাখা হয় দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম।

নাপোলি অধ্যায় শেষে স্পেনের সেভিয়া, আর্জেন্টিনার নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ ঘুরে ১৯৯৫ সালে আবার বোকা জুনিয়র্সে ফেরেন ম্যারাডোনা। ১৯৯৭ সালে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেন তিনি। তবে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পরও ফুটবল থেকে কখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হননি এই কিংবদন্তি।

ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে সেই আসরে তিনি যা করেছিলেন, তা আজও বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অনন্য এক কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরো টুর্নামেন্টে পাঁচটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও পাঁচটি গোল করান তিনি। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে। সেখানে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনালে জয়সূচক গোলটি করেন হোর্হে বুরুচাগা, সেই গোলের আক্রমণ গড়ে দেওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ম্যারাডোনার।বিশ্বকাপজুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জেতেন তিনি। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেয়নি, ম্যারাডোনাকেও প্রতিষ্ঠিত করেছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুটি গোল আজও ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় থাকে। প্রথম গোলটিতে থাকে হাত দিয়ে গোল করার বিতর্ক, যা পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়। গোলটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রেফারির চোখ এড়িয়ে সেটি বৈধতা পায়। এর কয়েক মিনিট পরই আসে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত গোল। নিজেদের অর্ধের কাছাকাছি বল পেয়ে একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকেও পরাস্ত করেন ম্যারাডোনা। প্রায় ৬০ মিটার বল নিয়ে দৌড়ে করা সেই গোলটি ২০০২ সালে ফিফার ভোটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নির্বাচিত হয়।
একই ম্যাচে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের গোল একটি বিতর্কিত, অন্যটি অসাধারণ নৈপুণ্যের নিদর্শন। এই দুই গোলই যেন ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। তিনি যেমন ছিলেন অতুলনীয় প্রতিভার অধিকারী, তেমনি তার ক্যারিয়ার ঘিরে ছিল বিতর্কও।

১৯৮৬ সালের সাফল্যের পরও বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার গল্প শেষ হয়নি। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে আবারও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন তিনি। চোট ও ফিটনেসের সমস্যা থাকলেও তার নেতৃত্বে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে শিরোপার লড়াইয়ে পৌঁছে যায় দলটি। তবে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও খেলেন ম্যারাডোনা। গ্রিসের বিপক্ষে গোল করে আলোচনায় এলেও পরে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার ঘটনায় তাকে টুর্নামেন্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেটিই ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ।

আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ৯১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ম্যারাডোনা। গোল করেছেন ৩৪টি। চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে নিজের দেশকে একবার চ্যাম্পিয়ন এবং আরেকবার ফাইনালে তোলার কৃতিত্ব রয়েছে তার।

ম্যারাডোনাকে শুধু তার ফুটবলীয় সাফল্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মাঠের বাইরে তার জীবনও ছিল নানা উত্থান-পতন, বিতর্ক ও ব্যক্তিগত সংগ্রামে ভরা। মাদকাসক্তি, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তার ক্যারিয়ারকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ১৯৯১ সালে মাদক পরীক্ষায় কোকেনের উপস্থিতি পাওয়ার পর ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা পান তিনি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও মাদক পরীক্ষার ঘটনায় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকট ও শারীরিক সমস্যাও দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে এই তারকাকে। তবে বিতর্কের মধ্যেও আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তা কখনো পুরোপুরি ম্লান হয়নি। বিশেষ করে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি তাকে দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তার কাছে ফুটবল ছিল কেবল একটি খেলা নয়, ছিল নিজের পরিচয়, আবেগ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর কোচিংয়েও যুক্ত হন ম্যারাডোনা। ২০০৮ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন তিনি। তার অধীনেই ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে অংশ নেয় আর্জেন্টিনা। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় দলটিকে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্লাবের কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু খেলোয়াড় ম্যারাডোনার যে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, কোচ হিসেবে তা অর্জন করতে পারেননি। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে আছে সবুজ মাঠে বল পায়ে প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বেড়ানো সেই জাদুকরী খেলোয়াড়।

২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ম্যারাডোনা। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তার মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শোকের ছায়া নেমে আসে বিশ্ব ফুটবলে। আর্জেন্টিনা থেকে ইতালি, ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা সর্বত্র ভক্তরা শ্রদ্ধা জানান এই কিংবদন্তিকে। ম্যারাডোনার মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায় একটি জীবনের পথচলা, কিন্তু শেষ হয়নি তার প্রভাব। আজও তার খেলার ভিডিও দেখে নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা অনুপ্রাণিত হন। তার ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস এবং চাপের মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা ফুটবলের সৌন্দর্যের অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।

ফুটবল ইতিহাসে পেলে, লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে সর্বকালের সেরার আলোচনায় বারবার উঠে আসে ম্যারাডোনার নাম। কে সেরা, সেই বিতর্কের উত্তর হয়তো কখনো এক হবে না। কিন্তু ম্যারাডোনার প্রতিভা, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের অসামান্য কীর্তি এবং ফুটবলকে ঘিরে তার আবেগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কমই আছে।

আজ তার জন্মদিনে ফুটবলপ্রেমীরা ফিরে দেখবেন সেই জাদুকরী বাঁ পায়ের গল্প, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য গোল, বিশ্বকাপ হাতে উল্লাস ও নাপোলির হয়ে ইতিহাস গড়ার মুহূর্তগুলো। সময়ের নিয়মে কিংবদন্তিরা একদিন চলে যান, কিন্তু তাদের কীর্তি থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিতে। ম্যারাডোনাও তেমনই এক নাম যাকে মনে করতে কোনো বিশেষণের প্রয়োজন হয় না। তিনি দিয়েগো ম্যারাডোনা, ফুটবলের এক অবিস্মরণীয় জাদুকর। 


   আরও সংবাদ