ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ১৩:০৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১০ বার
পাখি, প্রজাপতি এবং বন্যপ্রাণীর খোঁজে বেড়িয়ে পড়া সেই সকালে। এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে কাটছে সময়।
তখন হঠাৎ চোখে পড়লো - চা বাগানের স্বল্পপানিপূর্ণ ছড়ার নিচে সৌন্দর্য ছড়িয়ে ফুটে আছে ‘ছাতিম’। তবে এ সৌন্দর্য প্রকাশ্যে প্রস্ফুটিত নয়, কিছুটা গোপনতায়! এই গুচ্ছ গুচ্ছ সৌন্দর্যের দৃশ্যে ভরে উঠে হৃদয়!
মাদকতাময় সুঘ্রাণের অধিকারী ছাতিম ফুল।
ভীষণ সুন্দর! শুধুই ইচ্ছে হয় নাসিকামূলে এর ঘ্রাণ টেনে নিতে! রাতের বেলায় ছাতিম ফুলের মৃদু ঘ্রাণ বহুদূর থেকে পাওয়া যায়। এখানে এই সময়টাতে ছাতিম ফুলের সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে যায়।
দিনের বেলায় ফুলের সুবাসের তীব্রতা কম থাকে। তবে সন্ধ্যা বা রাতের বেলায় পথ চলতে গেলে আশ্বিন-কার্তিক মাসে হঠাৎ হালকা ঝাঁঝালো সুগন্ধি নাকে এসে লাগে।
হাঁটার গতি কমিয়ে তখন খুঁজতে হয়–এ সুগন্ধির উৎস!
প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী, গবেষক ও প্রকৃতি বিষয়ক আলোকচিত্রী ড. নওয়াজেশ আহমদ ‘ছাতিম’ ফুল বিষয়ক একটি নিবন্ধে লিখেছেন- “আমাকে সপ্তপর্ণ কেন বলা হয় জানো? কারণ আমার সাতটি পাতার সমন্বয়ে গঠিত হয় সুন্দর এক পত্রগুচ্ছ।... তোমরা হয়তো শুনে থাকবে যে, কবিগুরুর সময় শান্তিনিকেতনে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের সমাবর্তনের সময় আমার পাতা প্রথমে উপহার দেওয়া হতো। শুনেছি এ প্রথা এখনো চালু আছে। এতোসব গৌরবোজ্জ্বল দিক থাকা সত্ত্বেও গ্রামবাংলার লোকেরা মনে করে আমার গাছে নাকি ভূত থাকে!”
ফুলপূর্ণ প্রকৃতির এই অনাড়ম্বর আয়োজন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি এমন সৌন্দর্য মানেই সতেজতার উদাত্ত আহ্বান। প্রকৃতি বিষয়ক নানান লেখায় ফুটে উঠেছে ছাতিম ফুলের স্বকীয়তার জয়গান। ফুলটি গুচ্ছাকারে সুসজ্জিত। ছোট ছোট অনেকগুলো ফুল একত্রিত হয়ে বিশাল একগুচ্ছ সৌন্দর্য নিজের শরীরে দখল করে রেখেছে। সবুজ পাতায় ফাঁকে ফাঁকে আবার কখনোবা পুরো গাছজুড়ে ছাতিমের এই প্রস্ফুটিত শোভা ফুলপ্রেমীদের দৃষ্টি কাড়ে। ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে রয়েছে সে।
সবুজাভ সাদা ফুলগুচ্ছের সুবাস ছড়ানো মাদকতাময় ঘ্রাণে মুগ্ধ হচ্ছেন পুষ্পপ্রেমীরা। ছাতিম ফুলের মিষ্টি সুবাসে শহরময় বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ঋতুর আগমনী বার্তা। নবান্নের উৎসব শুরু না হলেও ছাতিম ফুলেরা যেন কাছে ডেকে বলে দেয় প্রকৃতিতে এসেছে ঋতুকন্যা হেমন্ত। যা হেমন্তের প্রকৃতিতেও যোগ করেছে অনন্য সৌন্দর্য।
আমাদের ব্যস্ত জীবনে ছাতিম ফুলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যেন এনে দিয়েছে স্বস্তির পরশ। ফুলে ফুলে সুশোভিত ডালপালায় নিজেই নিজের স্বকীয়তার জানান দিচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে। গাছের ডালে ডালে ফুটেছে দৃষ্টিনন্দন ফুল। থোকা থোকা ফুলের সবুজাভ আহ্বান দৃষ্টি কেড়ে নেয় নিমিষেই।
ছাতিম একটি সুগন্ধি ফুলের গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Alstonia scholaris। গাছটি Apocynaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে একে Devil's Tree Flower বা White Cheesewood বলা হয়। এ গাছটি অনুকূল পরিবেশে প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ছাতিম’ পরিচিত একটি বৃক্ষ। সংস্কৃত ভাষায় একে ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’ বলা হয়।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও ছাতিম ফুলের বিশেষ স্থান রয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই গাছ। শান্তিনিকেতনে ছাতিম গাছের নিচে বসে তিনি লেখালেখি ও পাঠদান করতেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ছাতিমের পাতা উপহার দেওয়ার ঐতিহ্যও রয়েছে সেখানে। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসেও ছাতিম ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসের বর্ণনা পাওয়া যায়।
ছাতিমের আদিনিবাস ভারতীয় উপমহাদেশসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা। বাংলাদেশের আর্দ্র ও জলসিক্ত পরিবেশে ছাতিম গাছ জন্মাতে দেখা যায়। এর নরম কাঠ দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড, পেনসিল ও প্যাকিংবক্স তৈরি করা হয়।
বৃক্ষনিধনের এই দুঃসময়ে আমাদের মনে রাখতে হবে- একটি গাছ কেবল কাঠ বা ছায়ার উৎস নয়; এটি প্রকৃতির অসংখ্য জীবের সঙ্গে দারুণভাবে সম্পর্কযুক্ত। ছাতিমের ফুলে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহী পতঙ্গ আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এসব পতঙ্গ পরাগায়ণসহ পরিবেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ভূমিকা রাখে।
ছাতিমসহ দেশীয় বৃক্ষের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে তাই শুধু দ্রুতবর্ধনশীল গাছ নয়, বরং স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির গাছকে গুরুত্ব দেওয়া আজ সময়ের দাবি।