ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

সংসদে মুখোমুখি সরকার ও বিরোধীদল

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:২০ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৯ বার


সংসদে মুখোমুখি সরকার ও বিরোধীদল

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা। এই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে আলাদা কোনো সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করেন।

অপরদিকে বিরোধীদল সনদ বাস্তবায়নে সংস্কার পরিষদের পক্ষে মত দিয়ে বলেছে, ‘আমরা জুলাই সনদ মানি, গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা মানি, গণভোট মানি এবং গণভোটের মাধ্যমে যে সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা তাও মানি। এখানে অমান্যের কোনো জায়গা নেই।

 

রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের অষ্টম দিনে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের আনা ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ ভবিষ্যতের পথরেখা—একটি রাজনৈতিক সমঝতার দলিল’ শীর্ষক প্রস্তাবের ওপর মুলতবি আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহাল এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংবিধানের কোনো সংস্কার হয় না, বরং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সংযোজন সংশোধনীর মাধ্যমেই করতে হবে এবং এই সংসদই হচ্ছে তার জন্য সর্বোচ্চ সার্বভৌম স্থান।

 

সংবিধানের সংস্কার বা পুনর্লিখন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয় বা সংশোধিত হয়—কিন্তু সংস্কার হয় না। যারা বিদেশ থেকে সংস্কার প্রস্তাব আমদানি করেছেন, তাদের বলতে চাই, যা কিছুই পরিবর্তন হবে তা এই সংসদেই হবে। সংসদই সর্বোচ্চ সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত এই সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একাত্তর এবং ৭২-এর সংবিধান কেন ভালো লাগে না আমরা বুঝি তো। একাত্তর এই দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় অর্জন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া—সবই এক কাতারে গাঁথা। এদেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, বিজয় গাথা। কারো কারো জন্য হতে পারে এটা পরাজয়ের গ্লানি।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার পদ্ধতি নির্ধারণে আমরা সরকারি ও বিরোধী দল মিলে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করতে পারি। যেখানে স্বতন্ত্র সদস্যরাও থাকবেন। আলোচনার মাধ্যমেই আমরা জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায়কে সংবিধানে ধারণ করব।’

 

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি পরতে পরতে, শিরা-উপশিরায় এই সংবিধানকে গ্রহণ করা হয়েছে। সনদের ১ থেকে ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রতিটিতেই বলা হয়েছে—সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা এই সনদ রচনা করেছেন, সেই ৩৩টি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল যে, বিদ্যমান সংবিধানকে সামনে রেখেই সংযোজন-পরিমার্জন করা হবে। সুতরাং আলাদা কোনো সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন নেই।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এভরি অ্যামেন্ডমেন্ট অব দ্য কনস্টিটিউশন ইজ এ রিফর্ম, বাট এভরি রিফর্ম ইজ নট অ্যান অ্যামেন্ডমেন্ট। জনআকাঙ্ক্ষা থেকে সংস্কার আসতে পারে, কিন্তু যখন ৩০০ সংসদ সদস্য বসে তাকে চূড়ান্ত রূপ দেবেন, তখনই তা সংশোধনী হবে এবং সেটা হতে হবে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী।’

জুলাই জাতীয় সনদ নিজেই স্ব-ব্যাখ্যায়িত ও স্বচ্ছ একটি দলিল এবং এর বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংবিধানের সংশোধন। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে তিনি গণভোটের কিছু প্রক্রিয়াকে ‘ফ্রড অন দ্য কনস্টিটিউশন’ বা সংবিধানের ওপর প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এদিকে, গত ৫৪ বছরে সংবিধানের যে সব ধারা ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে, সেগুলোর আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলিনি। আমরা সংবিধানের ওই জায়গাগুলোর সংস্কার চাই, যা গত ৫৪ বছর ধরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। আমরা ফ্যাসিবাদের দাফন করতে চাই।’

জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো সংঘাত নেই উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা জুলাই সনদ মানি, গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা মানি, গণভোট মানি এবং গণভোটের মাধ্যমে যে সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা তাও মানি। এখানে অমান্যের কোনো জায়গা নেই। আমরা তো সবাই গণভোটের হ্যাঁ-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করে এই সংসদে এসেছি। তাহলে এখন কেন মুখামুখি দাঁড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে?’

জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য ছাড়াই একটি বিশেষ ‘নোট’ বা ‘ডট’ অন্তর্ভুক্ত করে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আকতার হোসেন। তিনি এই জালিয়াতির নেপথ্যে কারা ছিল, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরেখা নিয়ে সরকারি দলের (বিএনপি) বর্তমান অবস্থানকে ‘শঠতা’ ও ‘স্মৃতিবিস্মৃতি’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।

বিরোধী দলীয় এই এমপি বলেন, ‘৩১ জুলাই ঐকমত্য কমিটিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সব ধাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষ হয়েছে। সেদিন বিএনপিও সেখানে ছিল। অথচ আজকে তারা ব্যাকস্পেসে গিয়ে পেছনের দিকে ফিরে যেতে চায়। সংস্কারের ঘোড়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে, এখন সরকারি দল তাকে লাগাম পরানোর চেষ্টা করছে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই সংসদ। তাই জুলাই যোদ্ধাদের দাবির বিষয়ে সরকারকে আরও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। একই সঙ্গে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ নয়, বরং সংবিধানের রীতিনীতি মেনেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ।


   আরও সংবাদ