ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

‘জ্বালানি কূটনীতিতে’ নেমেছে সরকার

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৮ বার


‘জ্বালানি কূটনীতিতে’ নেমেছে সরকার

 

৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

 

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। যার রেশ পড়ছে বাংলাদেশেও।

 

তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি কূটনীতিতে নেমেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়। এই যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে।

 

 

জ্বালানি তেলের সংকট ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। তবে যেভাবেই হোক সরকার এখনো পরিস্থিতি সামাল দিয়ে চলেছে।

 

এ লক্ষ্যে বিকল্প উৎস হতে জ্বালানি আমদানির তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানিতে সংকট দেখা দেওয়ার পর বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে জোর দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যে ভারত, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে তিন দফায় ১৭ হাজার টন ডিজেল আমদানিও হয়েছে। চলতি এপ্রিল মাসে দেশটি থেকে আরও ২৫ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হবে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর থেকে ইতোমধ্যে ১১ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হয়েছে। দেশটি থেকে ডিজেলও আমদানি হচ্ছে।

 

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় ইরান। তবে বাংলাদেশের জাহাজগুলো যেন হরমুজ প্রণালী পার হতে পারে, সে লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় সরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেয়। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি জানান, বাংলাদেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে বাধা নেই। বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজকে চলাচলের জন্য ইতোমধ্যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। তাছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ইরানের সহায়তা চেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

 

রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সেই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সে কারণে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে রাশিয়ার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় জটিলতা দেখা দেয়। তাই রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির চায় বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও দেয়। রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে দেশটির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন গত ১৫ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রাশিয়ার জ্বালানি তেল সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়।

 

ভারতের সঙ্গে আলোচনা

বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন রয়েছে। ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত বিস্তৃত মৈত্রী পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩১ কিলোমিটার। এই আন্তঃদেশীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশে ডিজেল পরিবহন করা হয়। এই পাইপলাইন দিয়ে অন্য দেশের চেয়ে তেল আমদানি তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী। ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দেশটির জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদ্বীপ সিং পুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে জ্বালানি সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে জ্বালানি তেল সহায়তা চেয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও দেয় বাংলাদেশ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। বৈঠকে এই সংকটকালে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ৩১ মার্চ ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বৈঠক করেন। বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রীকে জানান, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি খাতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা করেন। বৈঠকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল তৃতীয় দেশে পরিশোধিত হওয়ার পর জ্বালানি হিসেবে আমদানির বিকল্প সুযোগের বিষয়েও আলোচনা হয়।

 

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কেমন হওয়া উচিত– জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরকারকে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল আমদানিতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একমুখী উৎস থেকে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। তবে আমার মনে হয়, এটা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া দরকার যে, আমাদেরও জ্বালানির সংকট আছে।

 

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যেহেতু জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, সে কারণে আমাদের দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। সরকার নিশ্চয়ই এটা করবে।

 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি তেল আমদানিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে– জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, আমাদের জ্বালানির উৎসগুলো বহুমুখী করার জন্য যা যা করার দরকার, মন্ত্রণালয় থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

 

তিনি বলেন, যেই উৎসগুলা থেকে আমরা এখন যুদ্ধের কারণে তেল আনতে পারছি না, সেই কারণে অন্য উৎসগুলো থেকে যাতে আমরা তেল আনতে পারি, জ্বালানি আনতে পারি, সেক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে করার সেটা আমরা শতভাগ করছি।

 

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ফলপ্রসূ আলাপ হয়েছে। ভারত ও সৌদি আরব থেকেও আমরা জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছি।


   আরও সংবাদ