ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২ মে, ২০২৬ ১২:১৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
বৈশাখ মাস এলেই সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে থাকার কথা থাকে সোনালি ধান কাটার উৎসব, কৃষক পরিবারের হাসি আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা দিন। কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্যের বদলে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা, হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস।
বৈরী আবহাওয়া, টানা বৃষ্টি এবং ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে, ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ও ধান পচে জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। এতে করে পুরো হাওরজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হাহাকার দেখা দিয়েছে।
এদিকে পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় এখনো যে সামান্য ফসল হাওরে টিকে আছে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কৃষকদের। কষ্ট করে ফলানো সেই ফসল রক্ষায় হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারগুলোর চোখেমুখে এখন শুধু উৎকণ্ঠা আর হতাশার ছাপ।
ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিতে জেলার ছোট-বড় ৯৭টি নদীই পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের কারণে এগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। হাওরপাড়ের কৃষক ও বাঁধসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হাওর নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা জানান, নদী খননের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নিয়ে প্রতি বছর ফসলরক্ষার নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। গত আট বছরে ৮৭৩ কোটিরও বেশি টাকা বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের নামে খরচ হয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নির্মাণ ও অনিয়মের কারণে এসব বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে ভেঙেও গেছে।
হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা এখন হতাশায় ভেঙে পড়েছেন। যে সময় খলায় খলায় ধান কাটার আনন্দে মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন শোনা যাচ্ছে কান্নার সুর। পানিতে তলিয়ে থাকা ধান চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া উপায় নেই অনেকের। কেউ কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে শ্রমিক দিয়ে বা নিজেরাই ধান কাটার চেষ্টা করছেন, আবার কাটা ধান নৌকায় করে খলায় তুলছেন। কিন্তু টানা চার দিন সূর্যের দেখা না পাওয়ায় খলায় রাখা ধানে চারা গজিয়েছে, অনেক ধান পচে গেছে। বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পারায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা না পেলে এই বিপুল ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতায় প্রায় ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জমি থেকে ৫০ হাজার টনের বেশি ধান উৎপাদনের আশা ছিল। প্রায় সব ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
আরও জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল থেকে মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট ঢল এবং সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টিতে জেলার নদীগুলোর পানি বেড়ে গেছে। সুরমা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি ক্রমাগত বাড়ছে।
শনির হাওরের কৃষক রুবেল মিয়াসহ অনেকেই জানান, কোমরসমান পানিতে নেমে নিজেরাই ধান কাটছেন। শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে; বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। হারভেস্টার মেশিন জমিতে বেশি পানির কারণে কাজ করতে পারছে না, আর কম পানিতে কাজ করতে গেলেও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। একদিকে ধান না কাটলে পানিতে পচে নষ্ট হবে, অন্যদিকে কেটে আনলেও শুকানোর উপায় নেই। কৃষকদের ভাষায়, তাদের অবস্থা এখন ‘সাঁড়াশির চাপে’ দুই দিকেই ক্ষতি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টির কারণে সীমান্ত নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে জেলার নদীগুলোর পানি বেড়েছে। ফলে হাওরের জলাবদ্ধ পানি নদীতে নামানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। নদীর পানি ধনু হয়ে মেঘনায় নামতে শুরু করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তবে এতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। এরপর হাওরের পানি নামা শুরু করবে। এদিকে আবহাওয়া পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং চেরাপুঞ্জি ও সুনামগঞ্জে আগামী আরও সাত দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।