ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

অগ্রণী ব্যাংক: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে নতুন সম্ভাবনার পথে

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশ: ৭ মে, ২০২৬ ১৫:৫৪ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার


অগ্রণী ব্যাংক: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে নতুন সম্ভাবনার পথে

✍️ আগা আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
সভাপতি, ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ব্যাব)
বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায়  দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংকের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, জনগণের আস্থা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে অগ্রণী ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ভিত্তিক সাময়িক আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করলে ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থার একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। উপাত্ত অনুযায়ী ব্যাংকটির মোট আমানত ১,১৩,০২৯.২৯ কোটি টাকা। এটি প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ এখনো ব্যাংকটির ওপর আস্থা রাখছে। একইসঙ্গে মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৮০,৫৭৩.৩৫ কোটি টাকা, যা দেশের বিভিন্ন খাতে অগ্রণী ব্যাংকের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের বড় প্রমাণ।
বর্তমানে ব্যাংকটির মোট শাখা সংখ্যা ৯৭৯টি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১০,৫৯৫ জন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে এই বিশাল নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই মানবসম্পদ আরও কার্যকর শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ব্যাংকটি ১,১২৯.৭৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে, যা এর ব্যবসায়িক সক্ষমতার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে। তবে একইসঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্তমানে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ২৮,৬১৫.৬৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৫২ শতাংশ। এর মধ্যে ১৬,৯৯১.৩৮ কোটি টাকা মামলাকৃত ঋণ। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই অর্থ পুনরুদ্ধার করা গেলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ১৫,৯১৯.৮৩ কোটি টাকা হলেও বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে ৬,৯৪৫.৭৭ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮,৯৭৪ কোটি টাকা। ধাপে ধাপে এই ঘাটতি পূরণ করা গেলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। একইভাবে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CRAR) বর্তমানে ২.২৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এটিকে ধীরে ধীরে আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।
নিয়মিত ঋণের বিপরীতে যোগ্য জামানত কভারেজ বর্তমানে ৫০.৩৬ শতাংশ। আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী তদারকি, তথ্যভিত্তিক ঋণ অনুমোদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং চালু করা গেলে এই অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব। বিশেষ করে বড় ঋণগুলোর নিয়মিত মূল্যায়ন, দ্রুত পুনরুদ্ধার উদ্যোগ এবং Early Warning System চালু করা সময়ের দাবি।
অগ্রণী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ঐতিহ্য, জনগণের আস্থা, বিস্তৃত গ্রাহকভিত্তি এবং অভিজ্ঞ মানবসম্পদ। তাই এটিকে সংকট নয়, বরং নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
বর্তমান বাস্তবতায় অগ্রণী ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানত সংগ্রহে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। কারণ একটি ব্যাংকের মূল শক্তি তার আমানত। গ্রাহকবান্ধব সেবা, নতুন ডিপোজিট স্কিম, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং প্রবাসী গ্রাহকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আমানতের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
একইসঙ্গে ঋণ বিতরণে আরও বেশি সতর্কতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। প্রতিটি ঋণ যেন উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাপ্রেইজাল, নিয়মিত মনিটরিং এবং পর্যাপ্ত জামানত নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি অনেক কমে আসবে।
রেমিট্যান্স, অফশোর ব্যাংকিং এবং বৈদেশিক বাণিজ্যেও অগ্রণী ব্যাংকের সামনে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দ্রুত ও আধুনিক সেবা, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই খাতে ব্যাংকটি আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ফিনটেক এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে অগ্রণী ব্যাংককে আরও জোর দিতে হবে। AI-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ডিজিটাল কাস্টমার সার্ভিস, স্মার্ট মনিটরিং এবং সাইবার নিরাপত্তা উন্নয়ন ব্যাংকের কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ঋণ আদায়, গ্রাহকসেবা, আমানত সংগ্রহ এবং শাখাভিত্তিক ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে সবাই যদি আন্তরিকভাবে কাজ করেন, তাহলে ব্যাংকের সামগ্রিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, আমানতকে “লাইফ লাইন” হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে আমানত সংগ্রহে মনোযোগ, ঋণ প্রদানে বিচক্ষণতা, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে উদ্ভাবনী উদ্যোগ, AI ও ফিনটেকভিত্তিক আধুনিকায়ন এবং ঋণ আদায়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা—এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে পারলে অগ্রণী ব্যাংক খুব দ্রুতই নতুন শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
সকল অগ্রণীয়ান যদি নিজ নিজ ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়সংকল্প হয়ে সততা, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে শত বাধা পেরিয়ে অচিরেই অগ্রণী ব্যাংক আবারও তার স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবে—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
একটি শক্তিশালী অগ্রণী ব্যাংক মানেই একটি আরও শক্তিশালী বাংলাদেশ।


   আরও সংবাদ