ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

হামের ঝুঁকিতে গর্ভবতী নারীরাও

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৬ ১০:১৫ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৩ বার


হামের ঝুঁকিতে গর্ভবতী নারীরাও

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা রুমানা আক্তারের (ছদ্মনাম) পাঁচ বছরের ছেলে কয়েকদিন আগে হামে আক্রান্ত হয়। প্রথমে জ্বর, পরে শরীরে লালচে দানা ওঠে।

শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন এটি হাম। ছেলেকে দেখাশোনা করতে গিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই জ্বর ও দুর্বলতায় ভুগতে শুরু করেন রুমানা নিজেও।

পরে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করিয়ে জানা যায়, তিনিও হামের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন।

 

রুমানা বলেন, ‘শিশুর পাশে তো থাকতেই হয়।

কিন্তু পরে ডাক্তার বললেন, গর্ভাবস্থায় হাম হলে বাচ্চার জন্যও ঝুঁকি থাকতে পারে। তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম।

 

দেশে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এ সংক্রমণ বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

তারা বলছেন, সময়মতো টিকাদান না হওয়া এবং ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১২ মে) পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৮১ শিশু। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ২৪ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩২ হাজার ৮৭৭ শিশু। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪২৪ জনের। প্রতিদিন গড়ে সাত শিশুর মৃত্যু এবং সহস্রাধিক শিশু আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে অধিদপ্তর।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হামের ভাইরাস অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসে পরিবারের অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে এখন অনেক প্রাপ্তবয়স্ক এবং গর্ভবতী নারীও হামের ঝুঁকিতে পড়ছেন।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রিয়াজ মোবারক বলেন, ‘বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে শুধু শিশুরাই নয়, প্রতিদিনই প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও পাওয়া যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে অনেক বড় মানুষ জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও দুর্বলতা নিয়ে আসছেন। তবে সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু গর্ভবতী নারী আক্রান্ত হলে বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় হামের সংক্রমণ হলে মা ও গর্ভের শিশুর উভয়ের জন্যই জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভের শিশুর জন্মগত ত্রুটি, হৃদরোগ, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া, শারীরিক বিকলাঙ্গতা কিংবা গর্ভপাতের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। তাই পরিবারে কোনো শিশু বা সদস্য হামে আক্রান্ত হলে গর্ভবতী নারীকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।’

ডা. রিয়াজ মোবারেক আরও বলেন, ‘হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, ব্যবহার্য জিনিস বা কাছাকাছি অবস্থানের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য গর্ভবতী নারীদের আক্রান্ত শিশুদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। প্রয়োজনে আলাদা কক্ষে থাকতে হবে।’

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, বারবার সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে দানা ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ও ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা সুমি বলেন, ‘গর্ভবতী নারীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক সময় কম থাকে। তাই হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে তাদের শারীরিক জটিলতা বাড়তে পারে। এজন্য গর্ভবতী নারীদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে লালচে দানা ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো শিশুদের টিকা দেওয়া না হওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। নিয়ম অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে টিকাদান বাদ পড়েছে বা সময়মতো হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এর ফলে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে আরও অন্তত এক মাস পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখতে হবে এবং শিশু ও গর্ভবতী নারীদের বিশেষভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিকিৎসা নয়, সচেতনতা এবং সময়মতো টিকাদানই পারে হামের বিস্তার রোধ করতে। আর পরিবারের একজন সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যদের সুরক্ষায়ও বাড়তি সতর্কতা জরুরি।


   আরও সংবাদ