ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বানের জলে পরীক্ষার হলে, শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ‘ট্রল’

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:২৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৫ বার


বানের জলে পরীক্ষার হলে, শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ‘ট্রল’

টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ব্যাপক জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশেষ করে সোমবার বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে হাঁটু পানি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের ভিডিও ভাইরাল হলে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্রতর হয়।

সেইসঙ্গে বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক ছবি তৈরি করে ‘ট্রল’ করা হচ্ছে।

 

দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলনেরও ডাক দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা না নেওয়ার দাবি তুলেছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

 

তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে আগামী ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষার বিষয়টি আগেই জানানো হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বর্ষণ, সড়কে পানি জমে যাতায়াতে দুর্ভোগ এবং শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি সামনে এনে অভিভাবক, শিক্ষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ এইচএসসি পরীক্ষা পেছানোর দাবি জানালেও সরকার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

 

গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। অনেক জায়গায় রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কেউ হাঁটু সমান পানি পেরিয়ে, আবার কেউ নৌকা বা বিকল্প যানবাহনের সাহায্যে কেন্দ্রে পৌঁছান। কয়েকটি এলাকায় যানজট ও জলাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়।

সোমবার পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষার দিন ভোর থেকেই ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে সরকার। জলজটের কবলে পড়ে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের নৌকায় চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা গেছে। কোমর সমান পানি পেরিয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্র ও কুমিল্লা সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে সময়মতো গাড়ি না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেক দূর পর্যন্ত পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে দেখা যায়।

ভারী বৃষ্টির মধ্যে গত ৮ জুলাইয়ের পরীক্ষা নিয়ে আগের রাতে তিন দফা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে স্থগিতের কথা জানানো হয়। প্রথমে চট্টগ্রাম, রাঙামাটির এইচএসসি ও শেষ দফায় ওই এলাকার এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষাই স্থগিতের কথা জানানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সব শেষ রাত ১টা ১৭ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পরীক্ষা স্থগিতের তথ্য জানানো হয়। সেটি নিয়ে শিক্ষা বিটের সাংবাদিকদের ও বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে মন্ত্রণালয়।

টানা বৃষ্টির মধ্যে সোমবারের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া যেত না। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক চাপের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বানও জানান অনেকে।

পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভাষ্য, এইচএসসি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সন্তানদের কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে গিয়ে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ভেজা কাপড় নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছে, যা তাদের মনোযোগ ও মানসিক প্রস্তুতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, দেশের অধিকাংশ এলাকায় পরীক্ষা গ্রহণের উপযোগী পরিবেশ ছিল এবং বোর্ডগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেসব এলাকায় বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও জানানো হয়।

তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে আরও নমনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রাখা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে চরম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বিকল্প পরিকল্পনা এবং দুর্যোগকালীন নীতিমালা আরও কার্যকর করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ সরকারের সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘসময় পরীক্ষা পিছিয়ে দিলে পুরো শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ছিল।

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা এখন শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ অন্যথায় পরীক্ষা বর্জন করবেন তারা। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক এসেছে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সায়েন্সল্যাব মোড়ে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বেলা ১১টায় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন একদল শিক্ষার্থী। তারা বলছেন, ‘দফা এক দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’।

কী বলছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি
সোমবার রাতে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, আমরা প্রতিদিন সারা দেশের তথ্য নিয়ে পর্যালোচনা করছি। আজ উল্লেখযোগ্য কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। তবে কুমিল্লার একটি কেন্দ্র নিয়ে লেখালেখি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের যথাসময়ে কেন্দ্রে ঢোকাতে সহায়তা করেছে। আমাদের আন্তরিকতার বিষয়ে সবাই জানেন।

আবহাওয়ার তথ্য নিয়ে পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন কি না– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আজ আমরা দেখি, যদি কোনো খারাপ পরিস্থিতি হয় তাহলে ১৫ তারিখের পরীক্ষার বিষয়ে আগেভাগেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দেব।

এর আগে গত ৭ জুলাই মধ্যরাতে চট্টগ্রামের পরীক্ষা স্থগিত এবং এ নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, জ্বি। আমরা আগেই সিদ্ধান্ত জানাব।

ব্যাখ্যা দিল আন্তঃশিক্ষা বোর্ড
বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও কেন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের অধিকাংশ পরীক্ষা কেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরীক্ষা গ্রহণের পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে মর্মে স্থানীয় প্রশাসন প্রতিবেদন দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অপ্রত্যাশিতভাবে আজ সকালে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কিছু কেন্দ্রে বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। তবে স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতি উপলব্ধি করে এবং পরীক্ষা বারবার স্থগিত করা হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, ফলাফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম এবং সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইসঙ্গে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থায় একটি বোর্ডের কারণে সব বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখাও বাস্তবসম্মত নয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বা পরীক্ষা গ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আমাদের কাছে শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

পরীক্ষা স্থগিত চায় ছাত্রদল
বন্যা ও দেশজুড়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাসহ অন্যান্য বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাগুলো সাময়িক স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সোমবার ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির এ দাবি জানান।

বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেন, আকস্মিক বন্যা, দেশব্যাপী অতিবর্ষণ ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাসহ অন্যান্য বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলো সাময়িক স্থগিতের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মানবিক বিবেচনা কামনা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।


   আরও সংবাদ