ঢাকা, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

গণভবন থেকে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘর

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৬ অগাস্ট, ২০২৬ ১২:১৪ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩২ বার


গণভবন থেকে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘর

logo

শীর্ষ সংবাদ

বসুন্ধরায় যাত্রা শুরু করল থাই কফি চেইন ‘ক্যাফে আমাজন’

আবারও বাড়ল সোনার দাম

নতুন হামলা হলে মার্কিন বন্ধু দেশগুলোতে বড় আঘাত হানবে ইরান

আজ থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত জুলাই জাদুঘর, যেভাবে পাবেন টিকিট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ

হরমুজ প্রণালীর নৌপথের রুট নিয়ে সমঝোতায় ইরান-ওমান

বসুন্ধরায় যাত্রা শুরু করল থাই কফি চেইন ‘ক্যাফে আমাজন’

আবারও বাড়ল সোনার দাম

নতুন হামলা হলে মার্কিন বন্ধু দেশগুলোতে বড় আঘাত হানবে ইরান

আজ থেকে সবার জন্য 

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাইয়ের এক নীরব সাক্ষী রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের গণভবন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় এটি ক্ষমতার পালাবদল, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সামরিক আদালত, ১ টাকায় ইজারা, রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক এবং সবশেষে গণরোষ, রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের নিরব সাক্ষী।

 

এক সময় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত এই ঐতিহাসিক স্থানটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে জনতার স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়েছে।

 

 

 

গণভবন নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রথম অধ্যায় (১৯৭৪–১৯৮৯)

১৯৭৪ সালে গণভবনের নির্মাণকাজ চূড়ান্তভাবে শেষ হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে তার দাপ্তরিক কাজকর্ম পরিচালনা শুরু করেন। তবে তিনি নিজ পছন্দ অনুযায়ী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ব্যক্তিগত বাসভবনেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন।

 

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে সামরিক শাসন জারি করা হলে গণভবনের ব্যবহারিক রূপ দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তৎকালীন সময়ে এটিকে সামরিক আদালতে রূপান্তর করা হয়েছিল।

 

 

পরবর্তী সময়ে প্রায় এক দশক এটি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় হিসেবে সাময়িকভাবে ব্যবহৃত হয়।

১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ভবনটির নিরাপত্তা জোরদার ও ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেন। ১৯৮৬ সালে প্রথম দফার সংস্কার শেষ হলে এটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে পরিণত করা হয় এবং এর নামকরণ করা হয় ‘করতোয়া ভবন’।

 

১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন এবং পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীসহ বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধান যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, তখন এই ‘করতোয়া’ ভবনকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

 

১ টাকায় ইজারা, আইনি বিতর্ক ও গণভবন ত্যাগ (১৯৯৬–২০০৯)

গণভবনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার রাজনৈতিক সমীকরণ ও আইনি বিতর্ক সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় ২০০১ সাল ও পরবর্তী সময়ে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার শেষ দিকে ২০০১ সালের জুনে জাতীয় সংসদে ‘জাতির পিতার পরিবার সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন, ২০০১’ পাস করা হয়। ওই আইনের আওতায় মাত্র ১ টাকা প্রতীকী মূল্যে গণভবন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ইজারা বা স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষে এটিকে বঙ্গবন্ধু পরিবারের নিরাপত্তার যৌক্তিক অধিকার বলে দাবি করা হয়েছিল।

 

পরে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর এই বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তিত বাস্তবতায় ২০০১ সালের ১৬ আগস্ট শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ওই বছরের ডিসেম্বরে তৎকালীন বিএনপি সরকার ‘জাতির পিতার পরিবার সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন, ২০০১’ বাতিল ঘোষণা করে।

 

পুনর্বরাদ্দ ও দীর্ঘ অবস্থান (২০০৯–২০২৪): ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করার পর আইন সংশোধন করে গণভবনকে আবারও শেখ হাসিনার অবস্থান ও ব্যবহারের জন্য সরকারি বাসভবন হিসেবে চূড়ান্ত নির্ধারণ করা হয়। এরপর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় এটি শাসনক্ষমতার মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

 

শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি বনাম সমালোচকদের অবস্থান

শেখ হাসিনা গণভবনকে কেবল একটি সরকারি আবাসন মনে করতেন না; ব্যক্তিগত অনুরাগের জায়গা হিসেবে দেখতেন। তিনি এর সুবিশাল প্রাঙ্গণে সবজি চাষ, মৎস্যচাষ ও হাঁস-মুরগি পালন করতেন। প্রায়ই তিনি বলতেন- গণভবন ‘জনগণের জায়গা’। রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এখান থেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

 

অন্যদিকে বিরোধী দল ও সমালোচকদের মতে, গণভবন ছিল একদলীয় শাসন ও একচ্ছত্র ক্ষমতার দুর্ভেদ্য দুর্গ। সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকারের বাইরে থাকা এই সুউচ্চ প্রাচীরের আড়াল থেকেই ১৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হতো। এই গণভবন থেকে শেখ হাসিনা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, তার দল আওয়ামী লীগকেও এই ভবন থেকে পরিচালনা করতেন। দীর্ঘ ওই সময়টাতে শেখ হাসিনা যা বলতেন তাই হতো।

 

২০২৪-এর অভ্যুত্থান ও গণভবনের পতন

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত বিক্ষোভ সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাজার হাজার উৎসুক ও ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সুউচ্চ নিরাপত্তা প্রাচীর ভেদ করে গণভবন চত্বরে প্রবেশ করে। ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই স্থানটিকে সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দৃশ্যটি তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনের পতনের এক বৈশ্বিক সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বানানোর অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

 

‘জুলাই ৩৬ স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও বৈশিষ্ট্য

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত বীর যোদ্ধারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

 

যা তুলে ধরা হয়েছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে

জাদুঘরের ভেতরের গ্যালারিগুলোতে গুম-খুনের বিবরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ২০২৪-এর আন্দোলনে শহীদদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র- রক্তভেজা জামা, চশমা, হেলমেট, ব্যানার, পোস্টার এবং ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণদখলের বিরল ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন করা হয়েছে। আর গণভবনের মাঠে আন্দোলনের স্মৃতি হিসেবে আবু সাঈদ ও মুগ্ধসহ বিভিন্ন ঘটনার স্মরণে বিশেষ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।

 

একসময় যে ভবনের দরজা কেবল শাসক ও আমলাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, আজ তা ‘জুলাই ৩৬ স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে, বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার চিরন্তন স্মারক হয়ে উঠেছে। জনগণের প্রবেশাধিকারে বাধার সুউচ্চ প্রাচীর এখন নিজেই দর্শনীয় বস্তু হয়ে গেছে শক্ত স্বচ্ছ গ্রিলের উদারতায়।


   আরও সংবাদ