ঢাকা, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ১৬ অগাস্ট, ২০২৬ ১১:০৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার


অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

২৩ বছর আগে যে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ও ১৩২ রানে বিধ্বস্ত হয়েছিল বাংলাদেশ, সেই মাঠেই এবার লেখা হলো একেবারে উল্টো গল্প। টেস্ট শুরুর আগে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে প্যাট কামিন্সের কাছে প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটা আদৌ কত দিন গড়াবে? চার দিন পর সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বাংলাদেশই।

৯ উইকেটের দাপুটে জয়ে সেই ডারউইনেই এবার অস্ট্রেলিয়াকে নাকানি-চুবানি খাওয়াল টাইগাররা। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্যাঙ্গারুরাই এবার বাঘের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত।

 

২৩ বছর আগে যে দল অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের সামনে এক ইনিংসও টিকিয়ে রাখতে পারেনি, সেই বাংলাদেশ এবার শুরু থেকেই স্বাগতিকদের ওপর চড়াও হয়েছে।

টেস্টের চার দিনে প্রতিটি সেশনেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখেছে বাংলাদেশ।

প্রথম দিন হাসান মাহমুদের আগুনে বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় তারা। ছয় উইকেট নিয়ে একাই স্বাগতিক ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন হাসান।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরির পর নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের দায়িত্বশীল ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে। আর চতুর্থ দিনে মিরাজের ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধও গুঁড়িয়ে যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতেই।

 

বাংলাদেশের শুরুটাও ছিল দুর্দান্ত। টস জিতে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। একাই ছয় উইকেট নিয়ে স্বাগতিক ব্যাটিংয়ে বড় ধস নামান হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বোলাররা শুধু প্রতিরোধ গড়তেই আসেনি, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সামর্থ্যও রাখে, প্রথম ইনিংসেই তার পরিষ্কার ইঙ্গিত মিলেছিল।

অস্ট্রেলিয়াকে অল্প রানে বেঁধে ফেলার পর ব্যাটিংয়েও ঝলক দেখায় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তানজিদ হাসান তামিম। ১৯৭ বলে ১০১ রানের ইনিংসের সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, মুমিনুল হকের ৪৯ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের অবদানে বাংলাদেশ তুলে নেয় ৪২৬ রান। প্রথম ইনিংসেই ২২৮ রানের লিড নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বড় ধাক্কা দেয় সফরকারীরা।

বাংলাদেশের সেই দাপট যে ম্যাচের বাইরেও প্রভাব ফেলেছিল, তার একটি ছবি দেখা যায় মারারা স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জে। টেস্ট তৃতীয় দিনেই শেষ হয়ে যাবে; এমন ধারণা থেকে চতুর্থ দিনের জন্য সেখানে কেউ টিকিট কাটেননি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ চতুর্থ দিনে গড়ালেও নতুন করে আর টিকিট বিক্রি করেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে ম্যাচের শেষ দিনে লাউঞ্জটি ছিল পুরোপুরি ফাঁকা।

অন্যদিন যেখানে সাবেক ক্রিকেটার, কর্মকর্তা ও স্থানীয় অতিথিদের ভিড় থাকে, সেখানে এদিন সারি সারি চেয়ার পড়ে ছিল খালি। বুফে খাবার বা পানীয়ের আয়োজনও ছিল না। লাউঞ্জের এক কর্মীর কাছ থেকে জানা যায়, আগেই ধরে নেওয়া হয়েছিল, তৃতীয় দিনেই ম্যাচের ফল হয়ে যাবে! 

মাঠের পরিস্থিতির সঙ্গে গ্যালারির এই ছবিটা যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছিল। একদিকে বাংলাদেশের একের পর এক আঘাতে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছিল, অন্যদিকে ম্যাচ দেখতে আসা দর্শকদের উপস্থিতিও কমে আসছিল। চতুর্থ দিনের শুরুতেই তাই বোঝা যাচ্ছিল, এই ম্যাচের পাল্লা কোন দিকে ভারী।

এদিকে প্রথম ইনিংসে দারুণ বোলিংয়ের পর অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামতেই আবার টপ অর্ডারে আঘাত করেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসের মতো এবারও জেইক ওয়েদারল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে স্বাগতিকদের চাপে রাখেন এই পেসার।

পরে সেই চাপ আরও বাড়ান স্পিনাররা। তাইজুল ইসলাম ও মিরাজের ঘূর্ণিতে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে অস্ট্রেলিয়া। স্টিভেন স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারি, বউ ওয়েবস্টার ও প্যাট কামিন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে দেন মিরাজ। শেষ পর্যন্ত নাথান লায়নকে ফিরিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৫তম ফাইফার পূর্ণ করেন তিনি।

তবে চতুর্থ দিনে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াই অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা আশা দেখিয়েছিল। মিচেল স্টার্কের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশের লিডও পেরিয়ে যায় তারা। কিন্তু তাসকিন আহমেদ স্টার্ককে ফিরিয়ে সেই প্রতিরোধ ভাঙেন। এরপর গ্রিনকেও হাসান মাহমুদ ফিরিয়ে দিলে অস্ট্রেলিয়ার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গুটিয়ে যায় ২৮৪ রানে।

বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে শুরুতেই তানজিদ হাসানকে শূন্য রানে হারিয়ে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও সেটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এরপর আর কোনো উইকেট না হারিয়ে দ্রুত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেট হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। মুমিনুল ৩০ ও সাদমান ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন।

টেস্ট শুরুর আগে ডারউইনে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল, কতক্ষণ টিকবে তারা? এবার সেই প্রশ্নটাই যেন ফিরে গেল অস্ট্রেলিয়ার দিকে। উত্তরটাও দিয়েছে বাংলাদেশ, ব্যাটে-বলে, চার দিনের প্রতিটি সেশনে।

শুধু তাই নয়, ডারউইনের এই জয় যেন ২৩ বছর আগের সেই ছবিটাই উল্টে দিল। ২০০৩ সালে যে মাঠে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ, এবার সেই মাঠেই ৯ উইকেটে জিতেছে তারা। সেদিন ম্যাচজুড়ে দাপট ছিল অস্ট্রেলিয়ার, এবার চার দিন ধরে সেই দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় পুরো ম্যাচজুড়েই বাঘের গর্জনে কাঁপতে হয়েছে ক্যাঙ্গারুদের।


   আরও সংবাদ