ঢাকা, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

মাদক চক্র নিয়ন্ত্রণে নারীরাও

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার


মাদক চক্র নিয়ন্ত্রণে নারীরাও

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কৌশলে চলছে মাদক কারবার। কারবার নিয়ন্ত্রণে বেশি কৌশলী নারী কারবারিরা।

ঢাকার কাছে গাজীপুরেই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন শীর্ষ আট নারী। এই কারবার করেই তাঁরা বনে গেছেন কোটিপতি।

বরিশাল বিভাগে নারী কারবারি বেড়েছে তিন গুণের বেশি। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জেও আছে নারী কারবারিদের চক্র।

 

গাজীপুরের মাদক কারবার নিয়ে কথা উঠলে শুরুতেই আসে টঙ্গীর নাম। যোগাযোগব্যবস্থা ও ভৌগোলিক কারণে রাজধানীসংলগ্ন টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ সেখানকার বস্তিগুলো দেশের অন্যতম মাদকের হাট হয়ে উঠেছে।

 

বস্তির খুপরি ও ঘিঞ্জি ঘরগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, প্রতিদিন এসব স্থানে কোটি কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। আর মাদকের এই বিশাল সাম্রাজের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন মোমেনা বেগম, আফরিনা আক্তার, ময়না খাতুন, কুলসুম ও কারিমা বেগম-এই পাঁচ নারী মাদক মাদক কারবারি। মাদক সেবন করে অনেকের অকালমৃত্যু হয়েছে। আবার অনেকে ধন-সম্পদ খুইয়ে নিঃস্ব হলেও এই নারী মাদক কারবারিরা হয়ে উঠেছেন কোটিপতি।

টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরীর লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশা এবং কাশিমপুরের ডালিয়া বেগমও মাদক কারবার করে হয়ে উঠেছেন কোটিপতি। এই নারী মাদক কারবারিদের সহায়তায় কাজ করেন আরো শতাধিক নারী।

মোমেলা বেগম : টঙ্গীর কোটিপতি মাদক কারবারির একজন মোমেলা বেগম (৪৬)। তিনি টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী। টঙ্গীর বড় পাইকারি মাদক কারবারিদের একজন তিনি। গাঁজা দিয়ে কারবার শুরু করলেও পরে দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে মোমেলা বেগম ফেনসিডিলের বড় চালান আনতে শুরু করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হেরোইনের কারবার। আর সর্বশেষ তাঁর কারবার গড়ায় ইয়াবায়। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সরাসরি ইয়াবা আনেন এমন ১৯টি মাদক মামলার আসামি তিনি।

মাদক কারবারিদের পুলিশের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে মোমেলা বেগমের নাম। দেড় যুগের মাদক কারবারে মোমেলা গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। টঙ্গীর ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরকুনের কুদ্দুস খলিফা সড়কে ‘জাহিদ হাসান ভিলা’ নামে রয়েছে তাঁর বহুতল বিলাসবহুল বাড়ি। একই ওয়ার্ডের শিলমুন পূর্বপাড়া যোগীবাড়ি সড়কে অর্ধকোটি টাকায় কিনেছেন আরো একটি বাড়ি। পুবাইলের করমতলা পূর্বপাড়া আবাসিক এলাকায় পৌনে চার কাঠা জমিতে রয়েছে তাঁর আধাপাকা আরেকটি বাড়ি। ব্যাংক মাঠ বস্তিতে রয়েছে একাধিক আধাপাকা ঘর। স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে কিনে দিয়েছেন চারটি মিনিট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশা। মেয়েজামাই পুলিশের সোর্স হৃদয়কে কিনে দিয়েছেন ২০ লাখ টাকা দামের প্রাইভেটকার। এ ছাড়া টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মোমেলার নামে-বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। একাধিক বাড়ি-গাড়ি থাকার পরও বস্তি ছাড়েননি মোমেলা। হয়েছেন বহুবার গ্রেপ্তার। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ৪০০ ইয়াবা ও ৪০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন মোমেলা।

ময়না খাতুন : ব্যাংক মাঠ বস্তির আরেক নারী মাদক কারবারি ময়না খাতুন (৫৫)। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ মহিলা আওয়ামী লীগের স্থানীয় ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক। এক ডজন মামলার আসামি ময়না খাতুনের পুরো পরিবার মাদক কারবারে জড়িত। মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর নামও রয়েছে শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায়। বিপুল মাদকসহ একাধিকবার র‌্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন নার্গিস। ময়না খাতুনের ভাই শফিকুল ইসলাম টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান আনতে গিয়ে কক্সবাজার পুলিশের হাতে ছয় হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর দুই বছর জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে এসে ফের রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুল ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। ময়না খাতুনের কাছ থেকে পাইকারি কিনে খুচরা বিক্রি করেন রানী (৪০) ও তাঁর ছেলে রাব্বানি (২৫)।

ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুও মাদকের ডিলার। তাঁর বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। ময়না ও তাজুল মাদকের টাকায় গাজীপুর ও মাদারীপুরে গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। টঙ্গীর শিলমুন জাম্বুরেরটেক এলাকায় তাজুল ইসলাম শ্বশুর সোলেমান ফরাজির নামে কিনেছেন ৮.৫৯ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি টিনশেড বাড়ি। মাদারীপুরের শিবচরের হিন্দুপাড়ায় রয়েছে কয়েক বিঘা জমি। বেশির ভাগ সম্পত্তিই তাজুল তাঁর স্ত্রী রোজীর নামে কিনেছেন বলে জানা গেছে।

আফরিনা আক্তার : টঙ্গীর আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি আফরিনা আক্তার (৪০)। থাকেন টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে। তিনি ওই বস্তির জামাল হোসেনের স্ত্রী। এলাকায় তিনি পরিচিত ‘বড় আপা’ নামে। মাদক কারবারে তাঁকে সহযোগিতা করেন স্বামী জামাল ও ভাই শ্রাবণ। একসময় টঙ্গীর বড় পাইকারি ফেনসিডিল কারবারি ছিলেন তিনি। বর্তমানে বিক্রি করেন ইয়াবা। মাদকের টাকায় তিনিও কোটিপতি।

কুলসুম : টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তির শীর্ষ মাদক কারবারি কুলসুম (৩৫)। মাদক কারবারে তাঁর রয়েছে বিশাল বাহিনী। মাদক কারবার করে একসময়কার অতি দরিদ্র কুলসুমের ভাগ্য বদলে যায়। রেলওয়ের সরকারি জায়গা দখল করে কুলসুম এবং তাঁর বাহিনী গড়ে তুলেছে মাদক স্পট। কিনেছেন জমি, বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি। করছেন বিলাসী জীবন যাপন। গত জুলাই মাসে আট কেজি গাঁজাসহ তাঁর বোন নার্গিসকে আটক করে টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ। কুলসুমের মাদক কারবারের অন্যতম সহযোগী তাঁর বোনের ছেলে রাকিব।

কারিমা বেগম : টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তির আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি কারিমা বেগম (৩৫)। গত ১৮ জুলাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। মাদকের ডিলার কারিমার বিরুদ্ধে রয়েছে এক ডজন মাদক মামলা। দীর্ঘদিন মাদক কারবার করে গড়ে তুলেছেন একাধিক বহুতল ভবনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

ডালিয়া : ছয়-সাত বছর আগেও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর নয়াপাড়ার কাঁঠালতলা মহল্লার ডালিয়া (৩৮)। তাঁর স্বামী ওয়াশিম চালাতেন রিকশাভ্যান। এখন ওই এলাকায় তাঁদের রয়েছে পাঁচটি বাড়ি। এর মধ্যে দুটি ছয়তলা, বাকিগুলো টিনশেড ভবন।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, ‘গাজীপুর মহানগরীতে ছোটবড় অনেকগুলো বস্তি রয়েছে, যেগুলোতে মাদক কারবার চলে। এই কারবার বন্ধে গত আট মাসে অসংখ্য অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে বিপুল মাদকসহ ছোটবড় অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন এবং গত সোমবার বস্তির মাদকের আস্তানাগুলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহায়তায় উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে সব বস্তিতে পর্যায়ক্রমে অভিযান চালানো হবে।’

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ


   আরও সংবাদ