ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

দেশের আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে অর্থনীতি

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৪৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৩ বার


দেশের আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে অর্থনীতি

একটি ফ্ল্যাট বিক্রি কমে গেলে তার প্রভাব শুধু আবাসন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না, ধাক্কা লাগে রড-সিমেন্ট থেকে শুরু করে সিরামিক, কাচ, আসবাবপত্র ও পরিবহনশিল্পেও। কমে নির্মাণশ্রমিকের কাজ, চাপে পড়ে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম।

অর্থাৎ, আবাসন খাতের স্থবিরতা একে একে থামিয়ে দিতে পারে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বহু শিল্পের চাকা। তাই আবাসন খাতকে সচল রাখা মানে শুধু ফ্ল্যাটের বাজার চাঙা করা নয়, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখা।

 

বাংলাদেশের আবাসন বাজারে বর্তমানে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। চাহিদা থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রকল্প থাকলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়ছে। ফ্ল্যাট প্রস্তুত থাকলেও অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা অপেক্ষা করছেন।

 

উচ্চ সুদের হার, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে আবাসন ব্যবসার হিসাব কঠিন হয়ে উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার আবাসিক ফ্ল্যাট বিক্রির গতি আগের তুলনায় কমেছে। এ পরিস্থিতিতে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে-মানুষ কি ফ্ল্যাট কিনতে চাইছেন না, নাকি আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে কিনতে পারছেন না?

একটি ভবন, বহু শিল্পের সংযোগ
একটি ভবন নির্মাণে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় টাইলস, স্যানিটারি পণ্য, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং, বৈদ্যুতিক তার, সুইচ ও লিফটের মতো নানা উপকরণ। এসব পণ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী ও পরিবহন ব্যবসা।

অর্থাৎ, একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে বহু শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রকল্পে বিনিয়োগ হলে এসব খাতে অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়। বিপরীতে, নির্মাণকাজ বন্ধ বা কমে গেলে সংকুচিত হয় সেই প্রবাহও।

নির্মাণসামগ্রীর বাজারে প্রভাব
আবাসন খাতে মন্দা দেখা দিলে প্রথমেই এর প্রভাব পড়তে পারে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। নতুন ভবন নির্মাণ কমে গেলে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ও পাথরের চাহিদাও কমতে পারে।

চাহিদা কমে গেলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কারখানার পক্ষে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে চাপে পড়েন ছোট সরবরাহকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এর প্রভাব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে যুক্ত ট্রাকমালিক ও চালকদের আয়ও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কর্মসংস্থানেও চাপ
আবাসন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ। একটি ভবন নির্মাণে প্রকৌশলী ও স্থপতির পাশাপাশি কাজ করেন রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, টাইলস মিস্ত্রি ও রংমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্মাণশ্রমিক।

নির্মাণকাজ কমে গেলে তাদের কর্মসংস্থান ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আয় কমলে কমতে পারে দৈনন্দিন ব্যয়ও। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় দোকানপাট, বাজার, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবসায়।

একজন শ্রমিকের আয় কমে যাওয়া শুধু তার পরিবারের জন্যই সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে তার ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল অন্য ব্যবসায়ীদের আয়েও। এভাবেই আবাসন খাতের সংকট অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব তৈরি করতে পারে।

গৃহঋণের সুদ বাড়লে বাড়ে ক্রেতার অপেক্ষা
আবাসন খাতের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই গৃহঋণের সহায়তায় ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু ঋণের সুদের হার বাড়লে মাসিক কিস্তির পরিমাণও বেড়ে যায়। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের অনেকেই ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন।

একজন ক্রেতা গৃহঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনলে সেই অর্থ যায় ডেভেলপারের কাছে। ডেভেলপার নির্মাণকাজে অর্থ ব্যয় করেন। সেখান থেকে অর্থ পৌঁছায় শ্রমিক, ঠিকাদার ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীদের কাছে। তারাও নিজেদের ব্যবসা ও পারিবারিক প্রয়োজনে সেই অর্থ ব্যয় করেন।

ফলে গৃহঋণ ও আবাসন বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়। এই প্রবাহ কমে গেলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোও চাপে পড়তে পারে।

ফ্ল্যাট বিক্রির সঙ্গে বাড়ে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা
একটি পরিবার নতুন ফ্ল্যাটে উঠলে প্রয়োজন হয় খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, পর্দা, ফ্রিজ, টেলিভিশন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, আলোকসজ্জার সরঞ্জাম ও ইন্টারনেট সংযোগ।

এতে উপকৃত হতে পারে আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, গৃহসজ্জা ও প্রযুক্তিসেবার মতো খাত। ফ্ল্যাট কেনার পর বাসা সাজানো ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার ব্যয়ও এসব বাজারে চাহিদা তৈরি করে।

তাই আবাসন খাতের প্রভাব শুধু ভবন নির্মাণ বা ফ্ল্যাট বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভোগ্যপণ্যের বাজার ও বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবসাও।

সংকটের কারণ কী?
আবাসন খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ, গৃহঋণের ব্যয়, আমদানিনির্ভর উপকরণের দামে ডলারের বিনিময় হারের প্রভাব এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে খাতটির ব্যবসায়িক পরিবেশ।

এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছেন। ডেভেলপাররা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক হচ্ছেন। বিনিয়োগকারীরাও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ফলে নতুন প্রকল্প শুরু, নির্মাণকাজের গতি ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে বাজারের স্থবিরতার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে ফ্ল্যাট বিক্রি, নতুন প্রকল্প, নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা, গৃহঋণ বিতরণ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

আবাসন খাত সচল করতে করণীয়
আবাসন খাতের গতি ফেরাতে শুধু ফ্ল্যাটের দাম কমানোর আলোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ক্রেতার সক্ষমতা, নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ।

এ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী গৃহঋণের সুযোগ বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি আবাসন অর্থায়নব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কর ও নিবন্ধন ব্যয়ের কাঠামো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

জমি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সহজ ও সময়সাশ্রয়ী করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

আবাসন ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর-সুবিধার পাশাপাশি প্রয়োজন স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ।

অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নে অর্থের উৎস, করব্যবস্থার ন্যায্যতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

আবাসন শুধু ইট-পাথরের গল্প নয়
একটি অর্থনীতির শক্তি শুধু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাও অর্থনৈতিক গতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আবাসন খাত তাই শুধু ইট-পাথরের গল্প নয়। এটি রড ও সিমেন্টশিল্পের গল্প, নির্মাণশ্রমিকের মজুরির গল্প, ব্যাংকের ঋণের গল্প। একই সঙ্গে এটি আসবাবপত্র, সিরামিক, কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও পরিবহনশিল্পের গল্প।

আবাসন খাতের গতি কমে গেলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বহু শিল্পে। আবার খাতটি ঘুরে দাঁড়ালে সংশ্লিষ্ট শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।


   আরও সংবাদ