ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

গ্রেপ্তার হতে পারেন নেতানিয়াহু?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার


গ্রেপ্তার হতে পারেন নেতানিয়াহু?

ইসরায়েলের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জোট গঠনের আলোচনা শেষে তিনি ক্ষমতা হারালে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি কার্যক্রম বন্ধ হবে না।

বহাল থাকবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলা।

 

বরং প্রধানমন্ত্রীর পদ হারালে নেতানিয়াহুর জন্য নতুন আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কারণ, ক্ষমতায় থাকার সুবাদে বিদেশি আদালতে গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তিগত দায়মুক্তির যুক্তি তোলা হয়, পদ ছাড়লে সেই সুরক্ষা আর থাকবে না। ফলে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা এবং বিদেশের জাতীয় আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা কমতে পারে।

 

তবে ক্ষমতা হারালেই নেতানিয়াহু গ্রেপ্তার হবেন, এমনও নিশ্চয়তা নেই।

আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কি বহাল থাকবে?
হ্যাঁ।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সংঘটিত কর্মকাণ্ডে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি পদে থাকবেন কি না, তার ওপর পরোয়ানার বৈধতা নির্ভর করে না।

 

২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার, হত্যা ও নিপীড়ন।

আদালত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত রোম সংবিধির ৫৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকে। গত সেপ্টেম্বরে আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামিম খান বলেন, পরোয়ানা প্রত্যাহারে আদালত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

তবে আইসিসির এখতিয়ার নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি রয়েছে। দেশটি আদালতের প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তি রোম সংবিধির সদস্য নয়—এ যুক্তিতে মূলত আদালতের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে আইসিসির আপিল চেম্বার প্রি-ট্রায়াল চেম্বারকে ইসরায়েলের এই আপত্তি পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়। তবে বিচারকেরা সেই প্রক্রিয়া চলাকালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা স্থগিত করেননি। ইসরায়েলের করা দুটি আপিল এখনো বিচারাধীন।

তবে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার ও আদালতে সোপর্দ করা না হলে তার বিচার শুরু করা সম্ভব নয়।

ক্ষমতা ছাড়লে কি দায়মুক্তি হারাবেন?
আইসিসি ও বিদেশি জাতীয় আদালতে দায়মুক্তির নিয়ম এক নয়। আইসিসিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন নেতানিয়াহুকে বিচারের বাইরে রাখে না। রোম সংবিধির ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকারি পদমর্যাদা কাউকে বিচারের বাইরে রাখার ভিত্তি হতে পারে না। আইসিসির অবস্থান হলো, পদসংশ্লিষ্ট দায়মুক্তি কোনো সন্দেহভাজনকে আদালতের এখতিয়ার থেকে রক্ষা করে না। একইভাবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোও আদালতের গ্রেপ্তারি অনুরোধ কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পায় না।

আইসিসি সদস্য নয়—এমন দেশের নেতাদের ক্ষেত্রেও আদালত এই অবস্থান প্রয়োগ করেছে।

২০১৯ সালে আইসিসির আপিল চেম্বার রায় দেয়, সুদানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রের বাইরে থাকা দেশের নেতা হলেও জর্ডানের তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল। ২০২৪ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে গ্রেপ্তার না করায় মঙ্গোলিয়াকে সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে আদালত।

তবে আইসিসির কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত দায়মুক্তির কারণে সদস্য নয়—এমন দেশের ক্ষমতাসীন নেতাকে গ্রেপ্তার করার বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।

আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের দুই ধরনের দায়মুক্তি স্বীকৃত।

রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো সীমিতসংখ্যক পদধারীকে দায়িত্বে থাকাকালে বিদেশি জাতীয় আদালতে গ্রেপ্তার ও বিচার থেকে সুরক্ষা দেয়। অভিযোগের ধরন যা-ই হোক, এই সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এটি সাময়িক এবং পদ ছাড়ার সঙ্গে শেষ হয়।

সরকারি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে করা কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পদ ছাড়ার পরও এই দায়মুক্তি বহাল থাকতে পারে। তবে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ক্রমেই সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বলে আইনি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

অর্থাৎ, নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লে ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন। তবে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কর্মকাণ্ডের জন্য কার্যগত দায়মুক্তির যুক্তি তিনি তুলতে পারেন।

কোন কোন দেশ দায়মুক্তির যুক্তি দেখিয়েছে?
২০২৪ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স বলেছিল, আইসিসির সদস্য নয়—এমন দেশের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দায়মুক্তি নেতানিয়াহুর জন্যও বিবেচনা করতে হবে। গ্রেপ্তারের অনুরোধের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিবেচ্য হবে বলে জানায় দেশটি। তবে দায়মুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহুকে সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, দায়মুক্তির বিষয়টি সম্মান করতে হবে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহুর হাঙ্গেরি সফরের সময় তাকে গ্রেপ্তার না করার ঘটনায় আইসিসির কার্যক্রমে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে দায়মুক্তিসংক্রান্ত রোম সংবিধির ৯৮ অনুচ্ছেদের যুক্তি তোলা হয়। পরে আইসিসি হাঙ্গেরিকে আদালতের সঙ্গে সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে।

তবে পদ ছাড়লেই নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে আদালতকে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়।

ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার চাইলে আইসিসির সঙ্গে সহযোগিতা করে নেতানিয়াহুকে আদালতে সোপর্দ করতে পারে।

বিদেশি আদালতে কি বিচার হতে পারে?
প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লে বিদেশি জাতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তিগত দায়মুক্তি তাকে সুরক্ষা দেয়, তা আর থাকবে না।

অনেক দেশে সর্বজনীন এখতিয়ারের আওতায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার বিধান রয়েছে। এ ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট অপরাধ অন্য দেশে সংঘটিত হলেও এবং ওই দেশের সঙ্গে অপরাধের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও আদালত মামলা গ্রহণ করতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালে গাজামুখী ত্রাণবহর আটকে দেওয়ার ঘটনায় নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তুরস্কে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ও ইতামার বেন-গভির।

ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারালে এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা দূর হবে। তবে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কর্মকাণ্ডের জন্য কার্যগত দায়মুক্তির দাবি তিনি করতে পারবেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করবে।

সাবেক নেতাদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের আইনি কার্যক্রমের নজির রয়েছে। ১৯৯৮ সালে স্পেনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে চিলির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশেকে লন্ডনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরের বছর যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডস রায় দেয়, প্রযোজ্য আইনি কাঠামোর আওতায় থাকা নির্দিষ্ট কিছু নির্যাতনের অভিযোগে তিনি দায়মুক্তি দাবি করতে পারবেন না।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে জারি করা একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল করে। তবে আদালত জানায়, তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর নতুন পরোয়ানা জারি করা যেতে পারে। আদালত আরও বলে, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে সাবেক নেতাদের কার্যগত দায়মুক্তি সুরক্ষা দেয় না।

নেতানিয়াহুর বিদেশ সফর গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তাকে উপস্থিত না পেয়েও কিছু দেশ তদন্ত করতে ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে।

তার হেফাজত নিশ্চিত করাই বড় বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তিনি আন্তর্জাতিক সফর এড়িয়ে চলতে পারেন। পাশাপাশি ইসরায়েল সরকার তাকে আদালতে সোপর্দ করতে রাজি না-ও হতে পারে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলার কী হবে?
গাজায় গণহত্যার অভিযোগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করে। এই মামলায় কোনো ব্যক্তির নয়, বরং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলেও মামলাটির ওপর তার প্রভাব পড়বে না।

তবে গণহত্যার অভিপ্রায় প্রমাণের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি ক্ষমতা ছাড়লেও সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা শেষ হবে না।

২০২৬ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগের জবাবে নিজেদের পাল্টা যুক্তি জমা দেয় ইসরায়েল। এর মধ্যে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তিও রয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকাকে জবাব দেওয়ার জন্য ২০২৭ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে আদালত। এরপর ইসরায়েলকে জবাব দেওয়ার জন্য ২০২৯ সালের ২২ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক বছর লাগবে।

দুর্নীতির মামলার কী হবে?
ক্ষমতা হারালেও ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচার বন্ধ হবে না।

ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তিনটি মামলায় ২০২০ সাল থেকে তার বিচার চলছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে অপরাধ স্বীকার না করেই প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমার আবেদন করেন নেতানিয়াহু। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানায়, আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই পক্ষের আদালতের বাইরে সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত।

বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, নেতানিয়াহু অপরাধ স্বীকার করে রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে না দাঁড়ালে প্রেসিডেন্ট তাকে ক্ষমা করতে পারেন না।

সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে তার বিরুদ্ধে থাকা আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল থাকবে এবং বিদেশি জাতীয় আদালতে বিচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়মুক্তির সুরক্ষা হারাবেন। কিন্তু গ্রেপ্তার বা বিচার নিশ্চিত নয়। তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা, আইনি প্রক্রিয়া এবং তাকে আদালতের হেফাজতে আনার সক্ষমতার ওপর।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই


   আরও সংবাদ