ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

পিছিয়ে যাচ্ছে জামায়াত

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫৬ বার


পিছিয়ে যাচ্ছে জামায়াত

ঢাকা: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। এই সুযোগে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কোণঠাসা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হঠাৎ করেই রাজনীতির মূল মঞ্চে আবির্ভূত হয়। দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, নিবন্ধন বাতিল এবং সর্বশেষ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো অক্ষত থাকায় বিস্মিত হন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

তবে রাজনীতির মাঠে জামায়াতের এই আচমকা উত্থান এবং প্রাথমিক জনসমর্থন যতটা দ্রুত অর্জিত হয়েছিল, তা আর থাকছে না।

সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্কিত মন্তব্য এবং আক্রমণাত্মক প্রচারণার কারণে দলটি সেই অবস্থান থেকে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

 

বিশেষ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগে শিবিরের প্ররোচনা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি, এক সময়ের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বাগযুদ্ধ এবং নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে দলের আমিরের বক্তব্য সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার যখন জামায়াতে ইসলামীর ওপর একের পর এক খড়গ নামিয়ে আনছিল, সে সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন দলটি হয়তো সাংগঠনিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দেখা গেল মুদ্রার উল্টো পিঠ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এই দীর্ঘ সময় ধরে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স’-এ নিজেদের অত্যন্ত দক্ষভাবে টিকিয়ে রেখেছিল।

 

জামায়াতের সবচেয়ে বড় চমকটি আসে ছাত্র রাজনীতির মাঠে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের মধ্যেও জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল অত্যন্ত সুকৌশলে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে, হল কমিটিগুলোতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মিশে গিয়ে তারা নিজেদের সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে গেছে, যা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

৫ আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রশিবিরের নেতারা যখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন, তখন তাদের ছদ্মবেশের দক্ষতা দেখে অনেকেই হতবাক হন।

 

সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনগুলোতে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় প্রমাণ করে, তারা কেবল টিকেই ছিল না, বরং ভেতরে ভেতরে নিজেদের শিকড় অনেক গভীরে গেঁথে রেখেছিল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত থাকায় এবং বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে ছাত্রশিবির এখন নিজেদের ক্যাম্পাসের প্রধান শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতির মাঠে পুনরায় সক্রিয় হয়ে জামায়াতে ইসলামী নতুন রাজনৈতিক বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তাদের প্রচারণার মূল সুর হলো- স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে এবং দুই দলই দুর্নীতি, লুটপাট ও দুঃশাসনে নিমজ্জিত ছিল।

জামায়াত এখন নিজেদের ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে, যারা এই দ্বিদলীয় বৃত্তের বাইরে দেশ পরিচালনার একটি নৈতিক বিকল্প হতে পারে।

 

এই প্রচারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে জামায়াত তাদের অতীত ইতিহাস, বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ সালের চারদলীয় জোট সরকারের আমলকে সামনে নিয়ে আসছে। ওই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষ নেতা এবং পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মন্ত্রিত্বকালকে ‘দুর্নীতির ঊর্ধ্বে’ চিত্রিত করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। তবে সুকৌশলে তারা ১৯৭১ সালের ইতিহাসও এড়িয়ে চলছেন বলে মনে করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমান এক বক্তৃতায় বলেন, ‘২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল আমাদের দুইজন শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল পর্যায়ক্রমে তিনটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আল্লাহ সাক্ষী, আল্লাহর আসমান-জমিন সাক্ষী- এই দুইজনের চার হাত-পায়ের বিশটা আঙুল সমস্ত দুর্নীতিমুক্ত ছিল, পরিচ্ছন্ন ছিল, কোনো ময়লা লাগে নাই। দুশমনেরা হাজার চেষ্টা করেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আনতে পারে নাই।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘তাদেরই গড়ে যাওয়া মানুষগুলো এখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে আছে। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনারা যদি এই রকম দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পণ করেন, আমরা চেষ্টা করবো আপনাদের ঋণ পরিশোধ করার জন্য।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এই ‘সততার বয়ান’ মূলত একটি রাজনৈতিক কৌশল। এর মাধ্যমে তারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত নেতাদের ‘শহিদ’ হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ না থাকার কথা ঠিক নয়। জামায়াতের মন্ত্রী এমপিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মামলা করেছিল দুদক। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে দণ্ডিত এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত নেতাদের মহিমান্বিত করে দেখানোর বিষয়টি সমাজের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ এবং সুশীল সমাজ সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রধান দাবি ছিল নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার। দলটির পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লাগাতার চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন না হলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছিল। জামায়াতের যুক্তি ছিল, প্রচলিত ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে একটি দল কম ভোট পেয়েও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তবে ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রচলিত পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

তবে ঢাকায় বসে পিআর পদ্ধতির জন্য সোচ্চার থাকলেও, তৃণমূল পর্যায়ে দলটি নির্বাচনের জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করে তফসিল ঘোষণার অনেক আগেই। গ্রাম-গঞ্জে জামায়াতের আগাম নির্বাচনী প্রচারণা প্রমাণ করে যে, তাদের সংস্কারের দাবিটি ছিল অনেকটা রাজনৈতিক দরকষাকষির অংশ। বিশ্লেষকরা একে জামায়াতের ‘দ্বিমুখী নীতি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। একদিকে তারা রাষ্ট্র ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলছে, অন্যদিকে পুরনো কাঠামোর সুযোগ নিয়েই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

জামায়াতের পিআর আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রতারণা বলে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ১৯ অক্টোবর তিনি ফেসবুক পোস্টে বলেন, জামায়াতের তথাকথিত পিআর আন্দোলন ছিল একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা, যা সত্যিকারের সংবিধান সংস্কার বা গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা তৈরি করতে নয়, বরং কেন্দ্রীয় জাতীয় সংলাপ ও সংবিধান সংস্কারের মূল প্রক্রিয়া থেকে আলোচনা/দাবিগুলোকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছে।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে সাধারণ ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের আবেগকে পুঁজি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। সরেজমিনে জানা গেছে, গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের কোরআন ছুঁয়ে অথবা নিজের সন্তানদের মাথায় হাত রেখে শপথ করানো হচ্ছে, তারা যেন আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেন।

ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী ইউসুফ হাকিম সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে- তিনি ভোটারদের ওমরাহ করানোর প্রলোভন দেখাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি এক ভোটারকে বলছেন, তাকে নির্বাচিত করলে তিনি ওমরাহ পালন করতে নিয়ে যাবেন। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে দলটির কর্মীদের কেউ কেউ এমন কথাও ছড়াচ্ছেন যে, জামায়াতকে ভোট দিলে ‘জান্নাতের টিকেট কনফার্ম’।

এমন কী জামায়াতপন্থী আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির তার এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘যদি মনে করেন ক্ষমতা যাবে জামায়াতে ইসলামীর হাতে, তাহলে অবশ্যই ক্ষমতায় যাবে জামায়াত। পৃথিবী কেন, আসমান-জমিনে কারো শক্তি নেই আমাদের এই ‘মিজান’ আটকিয়ে রাখতে। হাশরের ময়দানে এই মিজান (দাঁড়িপাল্লা) থাকবে। ধানের শীষ থাকবে না, নৌকাও থাকবে না, লাঙ্গলও থাকবে না, আমরা এমন একটা প্রতীক নিয়ে কাজ করি যেটা দুনিয়াতেও থাকবে, আখেরাতেও থাকবে।  

তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলাম করাটা আমার আপনার নৈতিক দায়িত্ব, যদি আপনি জান্নাতে যেতে চান। আর জান্নাতে যেতে না চাইলে কোনো সমস্যা নাই। ৭২ কাতারের মধ্যে প্রথম কাতারে থাকতে চাইলে, জান্নাত পেতে চাইলে জামায়াতে ইসলাম করতে হবে। এর মধ্যে আর দ্বিতীয় কোনো অপশন নাই।
 
এসব কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যকে বিশিষ্ট আলেমরা ‘শিরক’-এর শামিল বলে মনে করছেন, আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন ধর্মের অপব্যবহার হিসেবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুজাহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলে মতাদর্শ থাকবে, ইশতেহার থাকবে। কিন্তু পরকালের মুক্তির কথা বলে ইহকালের ভোট চাওয়ার সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এসব ঘটনা ভোটারদের স্বাধীন মতামতের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করবে।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

অন্যদিকে, দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করবেন বলে জানিয়ে দেন। 

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীর ক্ষমতায়ন যখন উন্নয়নের চাবিকাঠি, তখন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি ঘোষণা সচেতন মহলে এবং নারী সমাজের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিনি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে পেশাজীবী মায়েদের সুবিধার্থে তাদের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করা হবে। আপাতদৃষ্টিতে প্রস্তাবটি নারীবান্ধব মনে হলেও, অর্থনীতিবিদ এবং নারী অধিকার কর্মীরা এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, পুঁজিবাদী ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান একই বেতনে পুরুষদের দিয়ে ৮ ঘণ্টা কাজ করানোর সুযোগ থাকলে, নারীদের দিয়ে ৫ ঘণ্টা কাজ করাতে চাইবে না। ফলে নারীদের জন্য চাকরির দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।

বিশিষ্ট নারী নেত্রীরা বলছেন, এমন ঘোষণা নারীকে কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে পুনরায় অন্দরমহলে বন্দি করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল। নারীদের কর্মঘণ্টা পুরুষদের চেয়ে কম নির্ধারণ করা হলে তারা কখনোই উচ্চপদে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবেন না। তারা সবসময় ‘পার্ট-টাইম’ কর্মী হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং একসময় হতাশা থেকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের উচিত ছিল কর্মঘণ্টা কমানোর অবাস্তব প্রস্তাব না দিয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা, ডে-কেয়ার সেন্টার সুবিধা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করার ঘোষণা দেওয়া। এই প্রস্তাবনার ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং কর্মজীবী নারীদের মধ্যে জামায়াত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।

ডিজিটাল যুগে যুদ্ধের ময়দান যেমন রাজপথ, তেমনই সাইবার স্পেসও। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির অনলাইনে একটি বিশাল ও সুসংগঠিত ‘বট বাহিনী’ বা সাইবার উইং গড়ে তুলেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তাদের কামানের মুখ এখন তাদের এক সময়ের মিত্র বিএনপির দিকে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রায় ২৫ বছরের কৌশলগত মিত্রতা ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। আগামী নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বিএনপি। ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াতের সাইবার প্রচারণা ততই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিএনপিপন্থীরা। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ট্রল করা, তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিষোদগার এবং দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে গেছে বলেও মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

এই বিরোধের আগুনে ঘি ঢেলেছে গত ১২ ডিসেম্বরের একটি ঘটনা। ওইদিন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র জুলাই বিপ্লবী শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘ওসমান হাদিকে গুলি করা হল। চাঁদাবাজ ও গ্যাংস্টারদের কবল থেকে ঢাকা সিটিকে মুক্ত করতে অচিরেই আমাদের অভ্যুত্থান শুরু হবে। রাজধানীর ছাত্র-জনতাকে প্রস্তুত থাকার আহবান জানাচ্ছি।’

সাদিক কায়েম কারো নাম উল্লেখ না করলেও, ‘চাঁদাবাজ ও গ্যাংস্টার’ শব্দগুলো এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারেন তার ইঙ্গিত ছিল বিএনপির দিকে। হামলার শিকার ওসমান হাদির স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে ওইদিন বিকেলেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ঢাকা-৮ আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস। সেখানে তাকে পড়তে হয় চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে।

হাসপাতালে উপস্থিত হাদির ‘সমর্থক’ পরিচয়দানকারী একদল তরুণ-তরুণী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রীকে দেখে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। এমন কী তিনি কেন সেখানে গিয়েছেন জানতে চেয়ে তাকে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতেও বলা হয়। মির্জা আব্বাস এ সময় অত্যন্ত সংযম ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিচয় দেন। তিনি নিজের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। বিএনপি অভিযোগ করেছে, এটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত উস্কানি। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের সঙ্গে এমন আচরণকে ‘রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত’ এবং ‘অশোভন’ বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, সাদিক কায়েম নিজেও এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন।

১৮ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জামায়াতে ইসলামী বা তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহের তীরও ছুঁড়ে দিচ্ছেন, বিশেষত কিছু সামাজিক মাধ্যমে এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য উঠে আসছে। এ বিষয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে লিখেছেন- ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঠিক আগের দিন তার পকেটে পেছন থেকে এসে একটি টাকার বান্ডিল গুঁজে দেন বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মেজবাহ উদ্দিন সাঈদ। পরদিন ১২ ডিসেম্বর বক্স কালভার্ট রোডের যে স্থানটিতে হাদি গুলিবিদ্ধ হন, সে স্থান থেকে প‍্যারামাউন্ট হাইটস ভবনের দূরত্ব ১০০-১৫০ ফুট। আবার এই ভবনেই রয়েছে মেজবাহ উদ্দিন সাঈদের ব‍্যবসা প্রতিষ্ঠান। যতদূর জানা যায়, সেদিন নামাজের পর এই বিল্ডিংয়ের সামনের একটি দোকান থেকে চা-পান করে হাদি ও তার ভাই রিকশায় চড়েন।

সায়ের দাবি করেন, মেজবাহ উদ্দিন সাঈদ ৫ আগস্টের পর বেশ আলোচিত ও রহস্যময় চরিত্র নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া ছোটনের বেশ ঘনিষ্ঠ লোক। এছাড়া মেজবাহ উদ্দিন সাঈদ এক সময় ছাত্র শিবিরের সাথে যুক্ত ছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর সাথেও জড়িত ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছাত্রলীগের সেলিম-ইসমাইলের সঙ্গে মিলে অস্ত্রের মুখে তিনি দখলে নিয়েছিলেন নভো ফার্মাসিউটিক্যাল। 

সায়ের জানান, কথিত আছে বেশ ছোট পরিসরের একটি রাজনৈতিক দলের অফিসের ভাড়াও বহন করে থাকেন সাঈদ। যুবলীগ উত্তরের সেক্রেটারি ও সভাপতি ইসমাইলের বনানীর অফিসে ওসমান হাদির হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহকারী ফয়সাল করিম ওরফে দাউদ খানের যাতায়াত ছিল বলেও জানান সায়ের। সায়ের ওই পোস্টে লেখেন, ‘হয়তো অনেক কিছুই কাকতালীয়, কিন্তু কিছু বিষয় অধিকতরভাবে খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।’

এদিকে হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) ও শিবির নেতা মোস্তাকুর রহমান। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল–পরবর্তী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। মোস্তাকুর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির সভাপতি পদেও আছেন।

বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা আজকের এই প্রোগ্রাম থেকে ঘোষণা দিচ্ছি, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ এসব সুশীল সংবাদ পত্রিকাকে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরা মনে করি, এই প্রোগ্রামে যদি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পত্রিকার কোনো সাংবাদিক আসেন, তাহলে এখনই এখান থেকে চলে যাবেন।’

শিবির নেতা মোস্তাকুর এই বক্তব্য দেওয়ার কিছু সময় আগে ঢাকায় প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একপর্যায়ে এই দুর্বৃত্তদের একটি অংশ ঢাকার কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা করে ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে ডেইলি স্টারের বহু কর্মী আটকা পড়েন। কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন।

একই রাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখার সেক্রেটারি মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে এক সমাবেশে বলেন, ‘রাজনৈতিক লড়াই করে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের লড়াই শুরু হবে শহিদ ওসমান হাদির ইনকিলাব মঞ্চের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। আগামীকাল (শুক্রবার) বাম, শাহবাগী, ছায়ানট, উদীচীকে তছনছ করে দিতে হবে, তাহলেই বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে।’ ওই দুই নেতার বক্তব্যের ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব দ্রুত ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান এবং জাবি শিবিরের সেক্রেটারি মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। এ দুজনের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এসব হামলার দায় শিবিরের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে দাবি করে তারা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। 

প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট এবং উদীচীর মতো জাতীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীল পদে থাকা নেতাদের এমন উগ্র বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ যারা গত ১৬-১৭ বছর আওয়ামী লীগ আমলে জামায়াতে ইসলামীর ওপর চলা ধারাবাহিক নিগৃহ ও দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করে দলটির প্রতি কিছুটা নমনীয় বা সহানুভূতিশীল ছিল, ১৮ ডিসেম্বরের পরবর্তী ঘটনাবলির পর তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের রোষানল থেকে মুক্ত হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আচরণেও আরেকটি ফ্যাসিবাদের চারিত্রিক বহিঃপ্রকাশ ক্রমশ ফুটে উঠছে, যা সাধারণ জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় চরমপন্থার উত্থান ও এর ভয়াবহ পরিণতির ইতিহাস অত্যন্ত স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান কিংবা পাকিস্তানে আশির দশকে শুরু হওয়া উগ্রবাদী রাজনীতির বিস্তার শেষ পর্যন্ত দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস কিংবা পাকিস্তানে গণমাধ্যম ও মুক্তচিন্তার ওপর ধারাবাহিক হামলা- এসবই শুরু হয়েছিল সাংস্কৃতিক ও সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করার মধ্য দিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ কিংবা ছায়ানট ও উদীচীর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘তছনছ’ করার যে হুঙ্কার ছাত্রশিবির নেতাদের পক্ষ থেকে এসেছে, তা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় চরমপন্থীদের অনুসৃত সেই পুরনো ও বিপজ্জনক কৌশলেরই প্রতিচ্ছবি। তারা মনে করেন, উগ্রবাদের এই বৈশ্বিক মডেল যখনই কোনো সমাজে শিকড় গেড়েছে, তখনই সেখানে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং নাগরিক স্বাধীনতা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত-শিবিরের এই আচরণ বাংলাদেশকে সেই একই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অস্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা অবশ্য জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে দেখছে- মুক্তিযুদ্ধ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তাদের এবং তাদের মতাদর্শী ব্যক্তিদের সাম্প্রতিক বিতর্কিত বক্তব্য। ৫ আগস্টের পর অর্জিত বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে একটি মহল সুকৌশলে একাত্তরের মীমাংসিত ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এবং যুদ্ধাপরাধীদের দায়মুক্তির অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।

গত ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনায় বলেন, ‘যে সময় আমি (পাকিস্তানি বাহিনী) দেশ থেকে পালানোর জন্য চেষ্টা করছি, আমি জীবিত থাকবো না মৃত থাকবো, সে বিষয়ে কোনো ফয়সালা হয়নি, সে সময় পাকিস্তানি যোদ্ধারা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে, এটি আমি মনে করি রীতিমতো অবান্তর।’ তার এই বক্তব্য কার্যত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর বাহিনীকে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় থেকে মুক্তি দেওয়ার নামান্তর বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদরা।

তিনি আরও বলেন, ‘রেটরিক বক্তব্য আমরা জাতির সামনে শুনতে চাই না। আমরা রিয়েলিটি চাই। ১৯৭১ সালে কারা কারা শহীদ হয়েছেন, কারা হত্যা করেছে, সেই তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের জানা হয়নি।’ 

একজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষাবিদের মুখে শহীদের সংখ্যা এবং হত্যাকারীদের পরিচয় নিয়ে এমন সংশয় প্রকাশ করায় বিস্মিত হয়েছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে ইতিহাসবিদরাও।

একই দিনে পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে এক আলোচনা সভায় কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হাসান আল মামুন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীকে ‘দেশপ্রেমিক বীর সূর্যসন্তান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৭১ সালে মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রধান। এই ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়েই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী মিলিশিয়া হিসেবে গঠিত হয়েছিল আল-বদর বাহিনী। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ এর যে দিনে আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই দিনই তাকে ‘সূর্যসন্তান’ বলাটা ইতিহাসের প্রতি চরম উপহাস বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদরা।

ইতিহাস বিকৃতির এই মিছিলে শামিল হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও। তিনি ১৪ ডিসেম্বর দাবি করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ’। তার মতে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রাক্কালে জামায়াতের ওপর দায় চাপাতেই ভারতীয় বাহিনী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অথচ ইতিহাসের দলিলে আলবদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের ডায়েরি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণীতে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট বলে মত দিচ্ছেন ইতিহাসবিদরা। 

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের রাস্তায় আঁকা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম, নিজামী ও কাদের মোল্লার ব্যঙ্গাত্মক গ্রাফিতি বা ছবিগুলো ১৪ ডিসেম্বর মুছে ফেলে হল প্রশাসন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব বাড়ার কারণেই প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ইতিহাসের এই স্মারকগুলো মুছে ফেলা হয়েছে।

৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী যে রাজনৈতিক সুযোগ পেয়েছিল, তা ছিল দলটির জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। দীর্ঘদিনের নিপীড়নের শিকার হিসেবে তারা জনগণের সহানুভূতি পেতে পারতো এবং একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারতো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে তারা শুরুতে সেই ইঙ্গিতও দিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে তাদের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, উগ্র সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, নারীর ক্ষমতায়নবিরোধী অবস্থান এবং প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির সঙ্গে সংঘাতময় আচরণ- দলটিকে ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে বলে মনে করছেন তারা। 

কেউ কেউ বলছেন, জামায়াত হয়তো ভেবেছিল আওয়ামী লীগ বিরোধী সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে তারা দ্রুত দেশের প্রধান নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র, সহনশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে আপসহীন। ‘দুর্নীতিমুক্ত’ স্লোগান দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ‘কলঙ্ক’ মোচন করা এত সহজ নয় বলেও মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাই বলছেন, শুরুতে প্রচারণায় এগিয়ে থাকলেও নিজেদের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, উগ্র মতাদর্শের বহিঃপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার বর্জিত আচরণের কারণে জামায়াতে ইসলামী এখন রাজনীতির মূল স্রোত থেকে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনে এই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ব্যালট পেপারে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।


   আরও সংবাদ