ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:২২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে একটি শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। সেখানে নরেন্দ্র মোদি আশা প্রকাশ করেছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ বাস্তবায়িত হবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আগামীর পথচলায় খালেদা জিয়ার আদর্শ ভারত-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব বিকাশে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। নরেন্দ্র মোদির এই চিঠির মাধ্যমেই খুব স্পষ্টভাবে বার্তা দিচ্ছে ভারত, আগামী দিনে বিএনপির ওপরই আস্থা রাখতে তারা আগ্রহী।
ভারতের কাছে বিএনপির বিকল্প নেই
বাংলাদেশে বিগত ১৬ বছরে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে এই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন। দুই দেশের এই দুই শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের গভীর সমর্থন ছিল।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নেওয়ায় এসব নির্বাচন সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। তবে প্রতিটি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনা করে গেছে এবং আওয়ামী লীগকে গভীরভাবে সমর্থন দিয়েছে ভারত।
তবে আগামী ১২ জানুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। সে কারণেই আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে ভারত।
ভারত বিএনপির প্রতি ঝুঁকছে কি না, জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি হয়তো ক্ষমতায় আসতে পারে, এই ধারণা থেকেই হয়তো দলটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাইছে ভারত। এখন তাদের হাতে অন্য কোনো অপশনও নেই। বিএনপিই এই মুহূর্তে ভারতের নম্বর ওয়ান অপশন। আগামী দিনে বাংলাদেশে যে নেতৃত্ব আসবে বলে তারা আশা করছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়তে চায় ভারত।
তিনি আরও বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে সেই সম্পর্ক গড়ার বার্তাও দিয়ে গেছেন।
তারেক রহমানের জনপ্রিয়তায় নজর
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে রাজধানীতে আয়োজিত গণসংর্বধনায় অংশ নেন তিনি। ওই সমাবেশে লাখো মানুষ অংশ নেয়। তারেক রহমান দেশে ফেরার পর তিনি কতটা জনপ্রিয় কিংবা তার সমাবেশে দলীয় কর্মীদের অংশগ্রহণ কেমন, সে বিষয়ে ভারতেরও নজর ছিল।
এদিন ভারতের সাবেক কূটনীতিকরাও তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। তাদের প্রত্যাশা, বিএনপির এই শীর্ষ নেতার হাত ধরেই বাংলাদেশে আবার গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হতে পারে।
তারেক রহমান যেদিন ঢাকা ফিরে আসেন, সেদিনই বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশ বলেন, শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের পরপরই আমরা দেখেছি, তারেক রহমান দলের রাজনৈতিক সমর্থনকে সুসংহত করেছেন। যদিও তিনি অনলাইনে ও বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি করছিলেন, তবুও তিনি দলকে নিজে পরিচালিত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই এই পর্যায়ে, যখন বাংলাদেশে এত সহিংসতা চলছে এবং দেশটি আদর্শিকভাবে বিভক্ত, তখন তার প্রত্যাবর্তন কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্ভবত তিনি বাংলাদেশে থাকা মধ্যপন্থী শক্তিগুলোকে সুসংহত করতে সক্ষম হবেন।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমান এখন সব সঠিক কথাই বলছেন। লন্ডন থেকে ফেরার পর ঢাকার রাস্তায় যেভাবে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, তা প্রমাণ করে তার আপাত জনপ্রিয়তা। এতে বোঝা যায়, তিনি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনতে পারেন।
বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একই সময়ে বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে যোগাযোগ একেবারেই ছিল না এমনটি নয়; সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেটিই ছিল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। ওই বৈঠকে ভারত ও বিএনপির মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলানো এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
দুই ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠক সম্পর্কে তখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কীভাবে আরও গভীর ও দৃঢ় করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো আমরা তুলে ধরেছি।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশ বলেন, বিএনপির সঙ্গে ভারতের বিগত ১৬ বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না—এই বক্তব্য মোটেও সঠিক নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় ছিল, ফলে সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে আমাদের যোগাযোগ ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গেই। তবে হাইকমিশনার হিসেবে আমি বহুবার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এবং তাদের ভারতের প্রতি নীতি স্পষ্ট করতে বলেছি। পাশাপাশি সেই সময়ে ভারতে যেসব রাজনৈতিক তরুণ নেতাদের প্রতিনিধিদল যেত, সেখানে বিএনপির নেতারাও থাকতেন।
সম্পর্ক গভীর করতে ভারতের তৎপরতা
বিএনপির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়তে ভারতের তৎপরতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকবার্তা পাঠান। সেই শোকবার্তা ঢাকায় পৌঁছে দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর। ওই সময় তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকও করেন। এ ছাড়া ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জানান। সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তারেক রহমানকে পাঠানো চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লেখেন, “২০১৫ সালের জুন মাসে ঢাকায় বেগম সাহিবার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ও আলোচনার কথা আমি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে স্মরণ করি। তিনি ছিলেন সংকল্প ও আদর্শনিষ্ঠায় বিরল এক নেত্রী, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
তাঁর প্রয়াণ এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করলেও তাঁর আদর্শ ও উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আপনার যোগ্য নেতৃত্বে তাঁর সেই আদর্শগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তা একটি নতুন পথচলা নিশ্চিত করতে এবং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।”
ভারত সম্পর্কে বিএনপির মনোভাব
বিএনপির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ার বার্তা দিলেও ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোতে চায় বিএনপি। দলটির ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির মূলনীতি একটাই—সবার আগে বাংলাদেশ। কূটনীতির ক্ষেত্রেও বিএনপির নীতি সবার আগে বাংলাদেশ, আমার জনগণ, আমার দেশ ও আমার সার্বভৌমত্ব। এই স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই অন্য সব বিষয় বিবেচনা করা হবে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, অবশ্যই আমি আমার পানির হিস্যা চাই। অবশ্যই আমি দেখতে চাই না, আরেকজন ফেলানী ঝুলে থাকুক। আমরা এটা মেনে নেব না। আর ভারত যদি স্বৈরাচারকে (শেখ হাসিনা) আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, সেখানে আমাদের কিছু করার নেই। আমাকে আমার দেশের মানুষের সঙ্গেই থাকতে হবে।