ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:২৩ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৯ বার
ভাষা কোনো আকাশ থেকে পড়া দৈববাণী নয়, বরং মানুষের যূথবদ্ধ জীবনের এক অবিরাম বিনির্মাণ। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ‘আজাদী’ কিংবা ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর মতো শব্দগুলো যখন আমাদের প্রাত্যহিক এবং রাজনৈতিক আলাপে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, তখন একদল মানুষ এর শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আবার একদল একে মুক্তির নতুন ব্যাকরণ হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে ভাষার ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, ভাষা কোনো দলীয় সিদ্ধান্তের স্থবির ফসল নয়; বরং তা মানুষের অভিজ্ঞতা, বেদনা ও সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার এক গভীর সামাজিক স্রোত। সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভাষাকে সৃষ্টি করতে পারে না—কারণ ভাষার প্রকৃতি প্রসারিত হওয়া, সংযোগ স্থাপন করা এবং মানুষের ভেতরের অপ্রকাশিত সত্যকে প্রকাশের পথ দেওয়া।
ঘৃণা থেকে জন্ম নেওয়া শব্দ হয়তো ক্ষণিকের গালি হয়ে ওঠে, কিন্তু তা কখনো মানুষের অন্তর্জগতের স্থায়ী ভাষা হতে পারে না।
ভাষার জৈবিক বিবর্তন ও সামাজিক স্বত্ব
ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ দ্য সসুর (Ferdinand de Saussure) ভাষাকে একটি সামাজিক চুক্তি (Social Fact) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ভাষা কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, বরং তা সমাজের সবার সম্মতিতে গড়ে ওঠা এক চিহ্ন-ব্যবস্থা। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এই সত্যটি সমানভাবে প্রযোজ্য।
চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের ব্লগ কিংবা স্লোগান পর্যন্ত বাংলা ভাষা কখনোই স্থির থাকেনি। চর্যাপদকে আমরা বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করি, কিন্তু বাংলা ভাষার মৌখিক ঐতিহ্য তারও বহু পূর্বে বিস্তৃত ছিল। গ্রামবাংলার পুথি, গাজীর গান, কারবালার করুণ কাহিনী এবং লোকজ আখ্যান—সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন শব্দ, নতুন অনুভূতি এবং নতুন প্রকাশভঙ্গি অর্জন করেছে।
ফরাসি দার্শনিক জিল দ্যলোজ (Gilles Deleuze) এবং ফেলিক্স গুয়াত্তারি (Félix Guattari) ভাষার এই পরিবর্তনশীলতাকে ‘রাইজোম্যাটিক’ (Rhizomatic) বা বহুমাত্রিক শিকড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তাদের মতে, ভাষা কোনো একটি কেন্দ্র থেকে জন্মায় না, বরং তা মাটির নিচ দিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া শিকড়ের মতো সমাজের নানা স্তর থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। বাংলার লোকজ ঐতিহ্যে গাজীর গান কিংবা কারবালার জারি—সবখানেই আমরা শব্দের এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখি। এই ভূখণ্ডে যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের আগমন ঘটেছে—ব্যবসা, দখল, রাজনীতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগের সূত্রে। এই বহুমাত্রিক সংস্পর্শ বাংলা ভাষাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু, এমনকি ইউরোপীয় ভাষার শব্দও বাংলার শরীরে মিশে গিয়ে আজ আমাদের নিজস্ব ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল: দুই প্রান্তের সংহতি
বাংলা ভাষার উদারতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের ভাব ও লোকজ বাউল সুরকে মিলিয়ে বাংলাকে দিয়েছেন এক দার্শনিক ও নান্দনিক উচ্চতা। তার ‘গীতাঞ্জলি’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং বহুসূত্রে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষার আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক পরিণতির এক অনন্য নিদর্শন। একইভাবে নজরুল তার কবিতায় আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। নজরুলের ‘আজাদী’, ‘খুন’, ‘ইনকিলাব’—এই শব্দগুলো কি আজ আর বিদেশি? উত্তর হলো—না। তিনি ভাষাকে সংকীর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক খাঁচায় বন্দি না করে তাকে সাধারণ মানুষের সংগ্রামের হাতিয়ার করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “ভাষার নদী চলিয়াছে বলিয়াই তাহার কূল পাওয়া যায় না; যে ভাষা স্থির হইয়া গিয়াছে তাহার তীরের বাঁধন আলগা করিয়া দেওয়া অসম্ভব।” নজরুলের বিদ্রোহ ছিল মূলত ভাষার এই তীরের বাঁধন আলগা করার বিদ্রোহ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া শব্দই হয় ভাষার স্থায়ী সম্পদ। তার ব্যবহৃত শব্দগুলো আজ আর বিদেশি নয়, বরং বাংলা ভাষার অন্তর্গত শক্তির অংশ।
চব্বিশের গণবিপ্লব ও আজাদীর রাজনৈতিক ভাষাতত্ত্ব
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের শিরোনামে যখন ‘আজাদী’ শব্দটি ফিরে আসে, তখন একে কৃত্রিম বা চাপিয়ে দেওয়া মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক মিসেল ফুকো (Michel Foucault) যেভাবে ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন, তা এখানে প্রাসঙ্গিক। ফুকোর মতে, ভাষা কেবল ভাব প্রকাশ করে না, বরং তা ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে (Discourse is a space of power struggle)। যখন একটি জনপদ গুম, জুলুম এবং দীর্ঘ শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, তখন তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এমন সব শব্দ খোঁজে যা তাদের আবেগকে তীব্রভাবে প্রকাশ করতে পারে।
সংগ্রামের মিছিলে, প্রতিবাদের স্লোগানে, মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশে ‘আজাদী’র মতো শব্দগুলো নতুন কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন। যখন কোনো জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় একত্রিত হয়, তখন তাদের অভিজ্ঞতা নতুন শব্দের জন্ম দেয়। এই শব্দগুলো কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এগুলো একটি কওমের বা জাতির আশা, প্রতিরোধ এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ সমালোচনা ভাষার এই স্বাভাবিক বিকাশকে থামাতে পারে না। কারণ ভাষা কোনো একক মালিকানার বিষয় নয়; ভাষা জনগণের।
দেশি-বিদেশি পণ্ডিতদের ভাষাবৈচিত্র্য ভাবনা
এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said) তার ‘অরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কীভাবে শক্তিশালী পক্ষ ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে অন্যের পরিচয় মুছে দিতে চায়। বাংলা ভাষার ওপর বিভিন্ন সময় এমন ভাষিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষা সবসময়ই তার সহজাত প্রাণশক্তি দিয়ে সেই আধিপত্যকে প্রতিহত করেছে। আজ ‘আজাদী’, ‘মুক্তি’, ‘হক’ কিংবা ‘সংগ্রাম’—এসব শব্দ কেবল অভিধানের শব্দ নয়; এগুলো মানুষের জীবনের অংশ।
ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ তার ‘শব্দার্থবিজ্ঞান’ গ্রন্থে বলেছিলেন, “ভাষা কোনো স্থির দীঘি নয়, ভাষা হলো একটি প্রবহমান নদী।” এই নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা কেবল মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের আছে। যখন জনতা রাজপথে নেমে আসে, তখন ভাষাও তার পুরনো খোলস ত্যাগ করে নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। আজ ‘ইনসাফ’ বা ‘বন্দোবস্ত’ শব্দগুলো যখন রাজনৈতিক আলাপচারিতার কেন্দ্রীয় শব্দ হয়ে উঠছে, তখন বুঝতে হবে সমাজ তার ন্যায়বিচারের ভাষাকে নতুন করে নির্মাণ করছে।
নয়া বন্দোবস্তের কাটাছেঁড়া
বর্তমানে ‘নয়া বন্দোবস্ত’ বা এই জাতীয় পরিভাষা নিয়ে যে বিতর্ক, তা মূলত ভাষার ওপর কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফল। ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) তার ‘ইউনিভার্সাল গ্রামার’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, মানুষের মস্তিস্ক প্রাকৃতিকভাবেই ভাষা সৃষ্টি ও গ্রহণের জন্য তৈরি। কোনো রাষ্ট্র বা পণ্ডিত যদি ওপর থেকে কোনো নির্দিষ্ট ভাষিক কাঠামো চাপিয়ে দিতে চায়, তবে তা ধোপে টেকে না। ভাষা নিজেই তার পথ নির্মাণ করে—মানুষের কণ্ঠে, মানুষের সংগ্রামে, মানুষের স্বপ্নে।
আজকের ‘আজাদী’, ‘মুক্তি’, ‘হক’ বা ‘ইনসাফ’—এই শব্দগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ফিরে আসা মানে হলো বাংলা ভাষার এক নতুন জাগরণ। এগুলো মিছিলে উচ্চারিত হয়েছে, কবিতায় রূপ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে উঠেছে। এটাই ভাষার প্রকৃত শক্তি—সে মানুষের জীবন থেকে জন্ম নেয় এবং আবার মানুষের জীবনেই ফিরে আসে। ওয়াল্টার বেনিয়ামিন (Walter Benjamin) তার 'The Task of the Translator' প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, ভাষার এক ধরনের 'Afterlife' বা পুনর্জন্ম থাকে। ‘আজাদী’ শব্দটির এই যে নতুন করে ফিরে আসা, তা মূলত ভাষার সেই পুনর্জন্মেরই নামান্তর।
ভাষার লড়াই ও সাংস্কৃতিক মুক্তি
ভাষার ওপর কোনো কৃত্রিম কাটাছেঁড়া বা নয়া বন্দোবস্ত চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ভাষা নিজেই তার পথ নির্মাণ করে। আজ যখন আমরা ‘শহীদ’, ‘গুম’, ‘আয়নাঘর’ বা ‘বিপ্লব’ শব্দগুলো উচ্চারণ করি, তখন প্রতিটি শব্দের পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস ও যন্ত্রণার স্মৃতি ভেসে ওঠে। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—ভাষা এখানে মুক্তিরই আরেক নাম। কেনিয়ার লেখক নগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো (Ngũgĩ wa Thiong'o) তার 'Decolonising the Mind' গ্রন্থে বলেছিলেন, ভাষা কেবল পৃথিবীর ছবি আঁকার মাধ্যম নয়, বরং তা হলো সংস্কৃতির বাহন। আমরা যখন আমাদের সংগ্রামের ভাষা ফিরে পাই, তখন আমরা মূলত আমাদের হারানো সংস্কৃতিকেই ফিরে পাই।
আজাদীর লড়াইয়ে ব্যবহৃত শব্দগুলো তাই নতুন নয়; এগুলো আমাদেরই ভাষার নতুন জাগরণ, আমাদের সম্মিলিত চেতনার নতুন প্রকাশ। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থে ভাষাকে বন্দি করার চেষ্টা সবসময়ই ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান আমলে যখন বাংলা ভাষার ওপর উর্দু বা আরবি হরফ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন মানুষ তার নিজের ভাষাকে রক্ষা করেছিল প্রাণ দিয়ে। আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু লড়াইয়ের সারমর্ম একই—ভাষার স্বকীয়তা ও জনমানুষের অধিকার রক্ষা।
সবশেষে আমরা বলব, ভাষার ওপর কোনো কৃত্রিম কাটাছেঁড়া বা পরিকল্পিত বন্দোবস্ত শেষ পর্যন্ত সফল হয় না। ভাষা কোনো জাদুঘরে সংরক্ষিত মমি নয়, বরং একটি জীবন্ত সত্তা। চব্বিশের গণ-সংগ্রামে ব্যবহৃত শব্দগুলো নতুন কোনো বিভাজন তৈরি করছে না, বরং আমাদের পুরনো শিকড়ের সঙ্গে নতুন দিনের সংযোগ ঘটাচ্ছে। আজাদীর লড়াইয়ে শব্দগুলো তাই কেবল শব্দ নয়; এগুলো আমাদের সম্মিলিত চেতনার নবতর স্ফুরণ।
আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) বলেছিলেন, "Time is the substance I am made of." ভাষার ক্ষেত্রেও তাই—সময়ই হলো ভাষার মূল উপাদান। সময় বদলায়, সংগ্রামের রূপ বদলায় এবং সেই সঙ্গে ভাষাও তার নতুন পোশাক পরে মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাষা জনগণের ছিল, জনগণের আছে এবং জনগণের স্বপ্নগুলোই আগামীর ভাষাকে নির্মাণ করবে। আজাদীর এই নতুন ভাষিক রূপান্তর আসলে আমাদের সামগ্রিক মুক্তিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা এখানে কেবল শব্দসমষ্টি নয়, ভাষা এখানে সত্যের প্রতিচ্ছবি এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে এক অবিনাশী স্লোগান।