ঢাকা, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে?

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ২১:১৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৮ বার


সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার ইতোমধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসেবে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যেই হতে হবে সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।

তবে সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকারের কারান্তরীণ থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন?

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কে প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করবেন, তার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। তবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন। অথবা সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছে রাষ্ট্রপতি পরামর্শ চাইতে পারেন। এভাবে আগামী ১৫ মার্চের আগে আহুত অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সংসদ অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সভাপতিত্বে প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে। নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সংসদের পূর্ণাঙ্গ যাত্রা শুরু হবে।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি ২৯৭টি আসনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কারণে গেজেটের তিনদিন পর সংবিধানের ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদের বিধান মতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ বাক্য পাঠ করান। সে অনুযায়ী গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথগ্রহণ করেন। একই দিন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথগ্রহণের মাধ্যমে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি সরকার গঠন করে।

 

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবসান হয়।

বাংলাদেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করে।

 

তবে নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনের তারিখ এখনো ঘোষিত হয়নি। সংবিধানের ৭২(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের যে কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করা হইবে।’

এই অনুচ্ছেদের (১) উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সরকারি বিজ্ঞপ্তি দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভঙ্গ করিবেন এবং সংসদ আহ্বানকালে রাষ্ট্রপতি প্রথম বৈঠকের সময় ও স্থান নির্ধারণ করিবেন।’

এতে আরও বলা হয়েছে, ‘এই দফার অধীন তাহার দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক লিখিতভাবে প্রদত্ত পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’

তাই সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের বিধানমতে আগামী ১৩ মার্চের আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আহ্বান জানাবেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি প্রথম অধিবেশনের সময় ও স্থান নির্ধারণ করবেন।

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। ৭৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন।’

সংবিধানের ৭২(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার তাহার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের আলোকে যে কোনো সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হলে পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি একজন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করেন। এরপর নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান হয়।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কারণ বিলুপ্ত দ্বাদশ সংসদের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা দেশে আছেন তারাও কারান্তরীণ। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আত্মগোপনে থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। আর ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু ছাত্র হত্যার একাধিক মামলায় কারান্তরীণ আছেন। এ অবস্থায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তবে জাতীয় সংসদের ১৯৭৪ সালে গৃহীত কার্যপ্রণালী বিধি (সংশোধিত ২০০৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য একজনকে মনোনীত করতে পারেন।

কার্যপ্রণালী বিধির ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফায় বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে, সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনের পূর্বে সংসদে নির্বাচিত প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে প্রদত্ত সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ফরমে বিদায়ী স্পিকারের এবং তাহার অনুপস্থিতিতে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকারের এবং উভয়ের অনুপস্থিতিতে বিদায়ী স্পিকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তির সম্মুখে এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকিলে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনা ও সংসদে সভাপতিত্ব করিবার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তির সম্মুখে শপথ গ্রহণ করিবেন বা ঘোষণা করিবেন এবং উহাতে স্বাক্ষর করিবেন।’

মূলত কার্যপ্রণালী বিধির এই ধারা অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি একজনকে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব দিতে পারেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অথবা সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে করণীয় বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে রাষ্ট্রপতি পরামর্শ চাইতে পারেন।

সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন। সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার নিয়ে একাধিক গবেষণামূলক বইও লিখেছেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে শূন্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, সংসদ বিলুপ্ত হলেও সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দায়িত্বে থাকেন। পরবর্তী সংসদে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দায়িত্বগ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের কার্যকাল থাকে। যেহেতু স্পিকারের বিকল্প হিসেবে ডেপুটি স্পিকার রয়েছেন, তাই এ নিয়ে হয়ত আলাদা করে ভাবতে হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সব প্রতিষ্ঠান প্রায় ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়ের অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, এটা নিয়ে সাংবিধানিক শূন্যতা রয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সে শূন্যতা পূরণ করতে রাষ্ট্রপতি একজনকে প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে সবচেয়ে ভালো হবে যদি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেন। তখন ভবিষ্যতে আর এ নিয়ে বিতর্ক তৈরির কোনো অবকাশ থাকবে না।


   আরও সংবাদ