ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ০৯:১২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার
ঢাকা: নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। ধীরে ধীরে এসব চ্যালেঞ্জ সরকারকে মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার যাত্রা শুরু করেছে। তবে এই সরকারের সামনে বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক চ্যালঞ্জ রয়েছে বলে মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শক্তির ভারসাম্য রক্ষা, মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধ শ্রম বাজার চালু করা, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনা, ভিসা সমস্যার সমাধান করা, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান, শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা ইত্যাদি।
শক্তির ভারসাম্য রক্ষা
বাংলাদেশের অতীত সরকারগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে আসছে। সে কারণে এখানে কোনো একটি দেশ বা জোট সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। বাংলাদেশ সব সময়েই ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।
বর্তমান সরকারের সামনেও এই বড় বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাটা কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। অতীতে অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের প্রতি অনেক বেশি ঝুঁকে পড়লেও চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে সমান তালে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার
দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের জন্য মন্দা চলছে। অনেক দেশেই বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহারাইন ও ওমানে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে ১১ লাখ ১৭ হাজার শ্রমিক বিদেশে গেছেন। তবে এর মধ্যে শীর্ষে ছিলো সৌদি আরব। গত বছর সৌদি আরবে যান ৭ লাখ ৫২ হাজার শ্রমিক। আর দ্বিতীয় স্থানে ছিল কাতার।
গত বছর কাতারে ১ লাখ ৭ হাজার কর্মী যান। তবে বেশিরভাগ দেশেই শ্রমিক পাঠানোতে কোনো গতি নেই। মালয়েশিয়াতেও দীর্ঘদিন শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। নতুন সরকারের সামনে বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার খোলা একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে তেমন কোনো বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। তবে এটা ছিলো গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে শেয়ারবাজারে ২৭০ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।
রাজনৈতিক সরকার না থাকায় সে সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থাও পায়নি। তবে এখন সে অবস্থা বদলেছে। দেশে এখন নির্বাচিত একটি সরকার এসেছে। তাই এখন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশে বিনিয়োগে নিয়ে আসাটা চ্যালেঞ্জ।
ভিসা সহজীকরণ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিভিন্ন দেশের ভিসা পাওয়া নিয়ে অনেক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সেই জটিলতা এখনো কাটেনি। বিশেষ করে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ নানা দেশের ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের জন্য সমস্যা হচ্ছে। এদিকে ভারতের ভিসা সীমিত থাকার কারণে দিল্লিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের ভিসা নেওয়াটাও অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লির বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া বিকল্প উপায় থাকলেও এসব দেশের ভিসা নিয়ে সেখান থেকে তৃতীয় দেশের ভিসা নেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে। সে কারণে ভিসা সহজীকরণ একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে অন্য যেসব দেশের ভিসা বন্ধ আছে তা নিয়ে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা যেন সহজেই হয়, সেই চেষ্টা থাকবে আমাদের।
রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও রোহিঙ্গা সঙ্কটের কোনো সমাধানই হয়নি। বিভিন্ন সময় আশ্বাস দিলেও বিগত ৮ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। সে কারণে নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের বিষয়ে পদক্ষেপ জানতে চাইলে নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন বলেছেন, রোহিঙ্গা নিয়ে আমাদের যে নজর ছিলো, সেটা কোনোভাবেই কমবে না, বাড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছি। সর্বপ্রথম আমরা আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ করেছি। সেই যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। আমরা এই সঙ্কটের একটি আশু সমাধান চেষ্টা করবো। আমি এই ব্যাপারে আশাবাদী।
শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারকে ফেরত আনতে আগ্রহী বর্তমান সরকার। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা সরকারের একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
শেখ হাসিনাকে ফেরত নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল ভোটের জয়ের পর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা সবসময় শেখ হাসিনাকে আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছি। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমরা ভারত সরকারের কাছে দাবি জানাই, তাকে যেন বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়ার বিষয়টি চলমান আছে। এই প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
নতুন সরকারের সামনে কী কী কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, একটি সরকার যখন নতুন দায়িত্ব নেয়, তখন সেই সরকারের সামনে বেশ কিছু কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকে। বর্তমান বিএনপি সরকারের সামনেও তেমন রয়েছে। আমি মনে করি, বিদেশি বিনিয়োগ টানা এই সরকারের সামনে প্রধান একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বড় শক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান করা, বন্ধ শ্রমবাজার চালু করা সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ থাকবে। এসব ইস্যু সরকারকে দক্ষভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
নতুন সরকারের পররাষ্ট্র নীতি কেমন হবে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফরেন পলিসি ও এর অভিমুখ নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তা ভাবনা করেছি। কিছু কিছু কাজও করেছি। প্রধানমন্ত্রী একটি কথা বারে বারে বলেছেন, সেটা হলো- সবার আগে বাংলাদেশ। আমাদের ফরেন পলিসিই হবে বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমাদের স্বার্থ সম্পূর্ণ রক্ষা করে পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড চালাবো। এর পেছনে যে নীতি থাকবে সেগুলো আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, সার্বভৌমত্ব সমতা, পরস্পরের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, কারো অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা, জাতীয় মর্যাদা, পারস্পরিক সুবিধা-এক তরফা কিছু নয়। পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডে জাতীয় স্বার্থ পাই পাই করে বুঝে নেব। এটা আমাদের রেড লাইন। এক হিসেবে আমরা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ফরেন পলিসিতে ফিরে যাচ্ছি। অন্তর্বর্তী সরকারেও আমরা সেটাই চেষ্টা করেছি।
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, এখন থেকে বাংলাদেশকে সবার ভিন্ন নজরে দেখতে হবে। সব দেশের সঙ্গে যেসব চ্যালেঞ্জ ও ইস্যু আছে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।