আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মার্চ, ২০২৬ ১৬:৩৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৭ বার
প্রথমবারের মতো ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের যৌথ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এই ঘাঁটি ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন এবং উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব ইউরোপজুড়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দিয়েগো গার্সিয়ায় কী ঘটেছে
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২১ মার্চ দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। একটি মাঝপথেই বিকল হয়ে যায়, আর অন্যটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়।
পরে ব্রিটিশ সরকারের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, এটি একটি ব্যর্থ হামলা ছিল।
ইসরায়েলও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশটির সেনাপ্রধান এয়াল জামির জানান, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঘাঁটির কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দিয়েগো গার্সিয়া কোথায়
দিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় প্রবালদ্বীপ (অ্যাটল)।
এটি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরির অংশ, যেখানে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে।
মালদ্বীপের দক্ষিণে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে এবং অস্ট্রেলিয়ার অনেক পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন।
ঘাঁটির গুরুত্ব
দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে প্রায় ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়ে রয়েছে, যা ভারী কৌশলগত বোমারু বিমান ওঠানামার উপযোগী। এখানকার বন্দরে বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরী নোঙর করতে পারে।
ফলে যেকোনো যুদ্ধ বা সংকটের সময় এখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারী সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে সক্ষম।
এছাড়া এখানে বৈশ্বিক জিপিএস ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং যোগাযোগ সুবিধাও রয়েছে। বিচ্ছিন্ন অবস্থান সত্ত্বেও দীর্ঘ পাল্লার সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ থাকায় এটি ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তাৎপর্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ন্যাটোকে সক্রিয় করার এবং ইউরোপকে ইরানবিরোধী যুদ্ধে যুক্ত করার আহ্বান জানালেও ইউরোপীয় নেতারা এখনো সরাসরি যুদ্ধের বাইরে থাকার অবস্থান নিয়েছেন। ইতালি, স্পেন ও জার্মানি সংঘাত সমাধানে আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে দিয়েগো গার্সিয়ার মতো কার্যত অপ্রবেশযোগ্য এলাকায় ইরানের হামলার চেষ্টা ইউরোপের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কারণ, এই দ্বীপটি ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। অথচ এতদিন ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার বলে দাবি করে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এই সক্ষমতা ব্যবহার করে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলেও হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা ছিল, ইরান প্রযুক্তিগতভাবে এই পাল্লা দ্বিগুণ করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক এই ঘটনায় সেই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলেও পৌঁছতে পারে।
ইসরায়েলের সেনাপ্রধান এয়াল জামির জার্মান গণমাধ্যমে দেওয়া এক মন্তব্যে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র শুধু ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে তৈরি নয়। তার মতে, ইউরোপের রাজধানী বার্লিন, প্যারিস ও রোমও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ইউরোপে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের যৌক্তিকতা নতুন করে সামনে এসেছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই হামলাকে তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, ইরান ইউরোপ পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি অটুট রয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে শক্তির ভাষাতেই কথা বলতে হয় এবং হরমুজ প্রণালীতেও সেই শক্তির প্রদর্শন করা হয়েছে। তারা আরও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব হারাচ্ছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বক্তব্য মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিপ্লবী গার্ডের অবস্থান শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা। চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের আকাশসীমায় প্রভাব বিস্তার করেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জার্মান গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক নাওয়াফ আল-থানি বলেন, এখানে মূল প্রশ্ন ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত হয়েছে কি না, তা নয়। বরং ইরান এমন একটি পাল্লা প্রদর্শন করেছে, যা অনেকের ধারণার বাইরে ছিল। তার মতে, ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লা যুদ্ধের সমীকরণই বদলে দিতে পারে।
একই প্রতিবেদনে ইসরায়েলি বিশ্লেষক রাজ জিম্ট বলেন, ইরান এই সংঘাতকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তেহরানের লক্ষ্য শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং নতুন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি করা। তার মতে, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমাতে চায়।