আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৬ বার
উত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের দখল করতে সেনা পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে করে দ্বীপটি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
খার্গ দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গভীর জলসীমায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে অতি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজ (ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার) সহজেই ভিড়তে পারে, যেগুলো প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনে সক্ষম।
ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
ঐতিহাসিকভাবেও দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরাকি বাহিনী একাধিকবার এখানে বোমাবর্ষণ করেছিল। চলতি বছরের ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেও তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি খার্গ দ্বীপ দখলের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেটি সম্ভবত অস্থায়ী হবে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে এবং ওয়াশিংটনের দাবিগুলো মেনে নেয়।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিরোধের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো মার্কিন আক্রমণের জবাবে ইরানি বাহিনী ‘আগুনের বৃষ্টি’ ঝরাবে।
ধারণা করা হচ্ছে, দ্বীপটিতে ইতোমধ্যে সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলসহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযানে প্রায় ৫ হাজার মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার অংশ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে, প্যারাট্রুপাররা রাতের অন্ধকারে আকাশপথে নেমে দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো দখল করতে পারে। অন্যদিকে, মেরিন বাহিনী অসপ্রি টিল্ট-রোটর বিমান এবং ল্যান্ডিং ক্রাফট এয়ার কুশনড ব্যবহার করে সমুদ্রপথে উভচর হামলা চালাতে পারে।
তবে এই অভিযান বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীকে প্রথমে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হবে এবং এরপর উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হুমকির মুখে পড়তে হবে। আকাশ বা সমুদ্র—যে পথেই অভিযান চালানো হোক, সেনাদের ল্যান্ডমাইন ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এ ছাড়া দ্বীপ দখলের পর সেটি ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মূল ভূখণ্ড ইরান থেকে অব্যাহত হামলার মুখে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করা চ্যালেঞ্জিং হবে। এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনের স্নেক আইল্যান্ড (Snake Island) দখলের পরও ক্রমাগত হামলার কারণে রাশিয়াকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইরানের ভূখণ্ডে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অজনপ্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনেক সমর্থকই নতুন করে সংঘাতে জড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।
এ ছাড়া খার্গ দ্বীপ নিয়ে আলোচনার আড়ালে এটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশলও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ—যেমন আবু মুসা, গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব, হেঙ্গাম, কেশম, লারাক এবং হরমুজ দ্বীপের যুক্তরাষ্ট্রের নজরে থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই দ্বীপগুলো ইরানের জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতে ভৌগোলিক সুবিধা দেয়।
তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনও অনিশ্চিত। ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে, যা চলমান সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটাতে পারে। তবে সম্ভাব্য কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বিদ্যমান বড় ব্যবধান কমাতে হবে।
সূত্র: বিবিসি